পুরুষতন্ত্রের টোপ গেলা থেকে বিরত থাকুন

0

প্রমা ইসরাত:

আপনি যখন দাবি করেন যে আপনি মানবতাবাদী, তখন আমার ভেবে খুব ভালো লাগে যে মানুষের জন্য আপনি ভাবেন, সবার আগে আপনি মানুষ হিসেবে নিজেকে জানেন, এবং আপনার আদর্শ হচ্ছে, সবার আগে মানুষ সত্য।
‘আসুন, আমরা মানবতাবাদী হই’ এই স্লোগান নিয়ে আপনি যখন স্ট্যাটাস দেন, এবং বন্ধু মহলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন, তখন আমার এটা ভেবে খুব ভালো লাগে যে, মানবতার পক্ষে, মানুষের মুক্তির সংগ্রামের পক্ষের একজন মানুষকে আমি দেখছি, মানুষের মুক্তির পথে একটু একটু করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।

কিন্তু আপনাকে যখন কেউ বলে, আপনি তো নারীবাদী, এবং আপনি এইটার প্রতিবাদ করে বলেন, জ্বী না, আমি নারীবাদী না, আমি মানবতাবাদী, তখন আমার অবাক লাগে, কারণ আপনি ধরেই নিয়েছেন, নারীবাদ মানবতাবাদের বাইরের কিছু। আপনি ধরেই নিয়েছেন, নারীবাদী হওয়া কিংবা নারীবাদ মানে নারীর পক্ষে এবং পুরুষের বিপক্ষে কথা বলা। আপনার ধারণা, পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া মানে, পুরুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া।
এখন একজন বউ তার জামাই পেটায়, কারণ জামাই তাকে তার শাড়ি-গয়না কিংবা নানান আবদার, যেগুলো পাশের ফ্ল্যাটের ভাবীদের দেখে তার খায়েশ জাগে কিনতে, সেইগুলো দেয় না। এই জন্য তার নানান অকথ্য, অশ্রাব্য, গালি এবং হাঁড়ি-পাতিল, খুন্তি ছুঁড়ে মারাকে সেই বউ জায়েজ মনে করে।

আপনার ধারণা কী? এই নারী কীসের প্রতিনিধিত্ব করছে? হুম অবশ্যই সেই নারী প্রতিনিধিত্ব করছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার, কারণ পুরুষতন্ত্র বলে দেয় যে, একজন স্ত্রীর ভরণপোষণ এর দায়িত্ব তার সকল চাহিদা, তার ইহজাগতিক যত কিছু আছে, সকল চাহিদা, আবদার মেটাবে তার স্বজামাই। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার কাহিনীটাই এইটা যে, একজন নারীর পাশাপাশি একজন পুরুষও ভিক্টিম হবে।

এখন “ছিঃ তুই নারীবাদী”, এই কথার প্রতিবাদে আপনি যদি বলেন যে, নাহ, আমি নারীবাদী না, আমি মানবতাবাদী, কারণ সমাজে পুরুষরাও নির্যাতিত, পুরুষেরও আছে অধিকার, তখন আমার পুরা মুডটাই খারাপ হয়ে যায়, কারণ আপনি আসলে জানেনই না নারীবাদী, মানবতাবাদী কিংবা আর যতসব ‘বাদ’ আছে এই সমাজে, সেই সব বিষয় প্রসঙ্গে। তখন মনে হয়, আপনি নারীবাদী না, আপনি মানবতাবাদীও না, আপনি একটা টুট টুট, স্রেফ একটা টুট টুট।

নিজেকে মানবতাবাদী বানাতে গিয়ে আপনি যখন, নারীবান্ধব পরিবেশের জন্য যে আন্দোলন হচ্ছে, নারী-পুরুষের সমতার জন্য যে আন্দোলন হচ্ছে, সেটার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, এবং বলেন যে, ‘খালি নারী নারী করো কেন তোমরা, পুরুষেরও আছে অধিকার” তখন আমার মুড আবার নষ্ট হয়ে যায়, এবং মনে হয়, আপনি নারীবাদী না, আপনি মানবতাবাদীও না, আপনি একটা টুট টুট।

নিজেকে মানবতাবাদী বানাতে গিয়ে, আপনি যখন বলেন যে শুধু পুরুষের না, নারীরও দোষ আছে, এবং সেটা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আপনি ফড় ফড় করে আপনার আসল চেহারা দেখিয়ে বলেন যে, নারীদের দোষ আছে, তাই তারা মাইর খায়, এই যে নারীরা পোশাক পরে, তাতে পুরুষ উত্তেজিত হয়, কিংবা রাতের বেলা বাপ-ভাই-জামাই ছাড়া মেয়েরা একলা বের হয় কেন? এই জন্য ধর্ষণ হয়। যেন মেয়েদের কাজ হচ্ছে ওড়না বা শাড়ির আঁচলে বাপ-ভাই-জামাইকে গিট্টু মেরে চলা। এবং বলেন, মেয়েদের বাইরে কামাই রোজগারের জন্য বের হওয়ার কী দরকার, মেয়েদের টাকার এতো লোভ কেন? এবং বলেন যে, একটা মেয়ে উত্তেজিত করে বলেই একটা পুরুষ এসে তাকে ধর্ষণ করে যায়, তখন আমার মুড চরম খারাপ হয়, তখন মনে হয়ে আপনি নারীবাদী না, আর মানবতাবাদী হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না, আপনি একটা টুট টুট, স্রেফ একটা টুট টুট।

নিজের অধিকারবোধ সম্পর্কে ধারণা পেতে, মানুষ হিসেবে আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি করতেই আমরা লেখাপড়া শিখি। জীবন সম্পর্কে, পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের ধ্যান-ধারণা যেন অগ্রসর হয় সেটাই জ্ঞান অর্জনের মূল লক্ষ্য। শুধু কিছু সার্টিফিকেট এর জন্য পড়ালেখা না করে, একজন মানুষ হিসেবে নিজেকে যেন আমরা সমৃদ্ধ করতে পারি, এটাই শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু খুব আফসোস হয় যখন দেখি নানান বড় বড় পাশ দেয়া লোকজনও কতটা প্রতিক্রিয়াশীল এবং একটা বিষয় সম্পর্কে পড়াশোনা না করেই, না বুঝেই কিছু বুলি ঝেড়ে দেয়। আর ভ্যাড় ভ্যাড় করে বলতে থাকে, আমি নারীবাদী না, আমি মানবতাবাদী। যেন নারীবাদ একটা গালির নাম। আর মানবতাবাদের কথা বলতে গিয়ে, আমি পুরুষের পক্ষেও কথা বলি, নারীর পক্ষেও কথা বলি, নারীরও দোষ আছে, পুরুষেরও দোষ আছে, নারীও খারাপ, পুরুষও খারাপ, নারীও ভালো, পুরুষও ভালো, এইসব পোলাপাইন্না, আমিও খেলুম না, তুইও খেলিস না তর্কে লিপ্ত হয়।

নারীবাদ বলুন, মানবতাবাদ বলুন, মানুষের মুক্তির লক্ষ্যেই এই সকল আন্দোলন। আর মানুষে মানুষে সমতা না আসলে তো সেই মুক্তি সম্ভব না। নারীবাদকে গালি দিয়ে মানবতাবাদী সাজতে গিয়ে, আপনি আবার সেই পুরুষতন্ত্রের টোপ গিলছেন কিনা, সেটা খেয়াল রাখতেই হবে। নইলে ব্যাপারটা বানরের তেল মাখা বাঁশের অংকের মতোই হবে। দুই হাত উপরে উঠলে আবার তিন হাত নিচে নেমে যায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 706
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    707
    Shares

লেখাটি ২,১৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.