রুদ্ধশ্বাস…

0

নাহিদ খান:

এক
তারেক অফিসে চলে গেলে খুব ভালো করে দরজা আটকায় শিমু। লিভিং রুমে উঁকি মেরে দেখে দেড় বছরের বাবুই নিমগ্ন কার্টুনে। শিমু ভাবে চট করে বাথরুম থেকে ঘুরে আসবে, আজ মা-বেটি বাসায় একা, বুয়া আসবে না, বাথরুম সেরে বাবুইকে নাশতা খাওয়াতে হবে।
মিনিট দুয়েকের মধ্যে বাবুই মা’কে খুঁজতে শুরু করে, মামণ, মামণ…
শিমু বলে-বাবুই এইতো মা বাথরুমে…
বাবুই বাথরুমের সামনে এসে হাজির হয়, ছিটকিনিতে হাত দেয়।
মা তুমি দরজায় হাত দিয়ো না, মাকে আটকে ফেলবে…
বাবুই ঠিক এই কাজটাই করে, সে বাইরে থেকে ছিটকিনি আটকে ডাকতে থাকে- মামণ, আসো, আসো…

দুই
ব্যাপারটা বুঝে উঠতে শিমুর কয়েক সেকেন্ড লাগে। সে আচ্ছা বকা লাগায় উচ্চস্বরে- তুমি কেনো দরজা ধরলে, বললাম না ধরবে না। খুব ভালো, এখন মামণ আটকা পড়েছি, তুমি পারবে দরজা খুলতে…
বকা খেয়ে বাবুই কাঁদতে শুরু করে- উ উ উ…

শিমু নিজেকে ধাতস্থ করে।
এখন বাথরুম থেকে বেরুতে হবে, কিন্তু কীভাবে?
দেড় বছরের বাচ্চা ভুল করে ছিটকিনি আটকাতে পারলেও সেটা খুলতে পারবে না কিছুতেই।
শিমুর ইচ্ছে করে নিজেকে থাপ্পর লাগাতে, কেনো সে দরজা আটকাতে গেলো…
বাবুই সিঙ্ক নাগাল পাবার জন্য যে টুলটা রাখা সেটায় দাঁড়িয়ে শিমু বাথরুমের ছোট্ট জানালাটার বাইরে দেখার চেষ্টা করে। নাহ, ওপাশে লাগোয়া একটা দেয়াল। চিৎকার করলে কেউ শুনবে বলে মনে হয় না।

শিমু শান্ত গলায় বলে- বাবুই সোনা, তুমি খুলতে পারো দরজাটা? ঐযে ছিটকিনি আছে না, ঐযে খেলনার মতো সেটা ধরে একটা টান মারতে পারো লক্ষীসোনা?
বাবুই কি ছিটকিনিতে হাত দিলো! কেমন একটা শব্দ হচ্ছে… আল্লা, বাবুই যেনো দরজাটা খুলতে পারে…
বাবুই ছিটকিনি আরো ভালো করে খাপের মধ্যে বসিয়ে দিয়ে কাঁদে- মামণ, দুধু খাবো। মামণ আসো…
শিমু একদিকে ভাবার চেষ্টা করে বের হবার উপায়, আরেকদিকে অভয় দেয়- বাবুই কাঁদে না, তুমি আবার দরজা ধরে খুলে দাও তো মাকে…

তিন
আচ্ছা কতোক্ষণ কাটলো? শিমু পাগলের মতো ছটফট করে, আবার টুলের উপর দাঁড়িয়ে জানালার কাছে মাথা নিয়ে চিৎকার করে- হেল্প, কেউ আছেন, হেল্প…
আচ্ছা বাবুই’র কান্না শোনা যাচ্ছে না কেনো? বাচ্চাটা কি ঘুমিয়ে পড়লো- ক্ষুধায়, কান্নার ক্লান্তিতে?
বাবুই আসলেই বাথরুমের সামনের পাপোশে ঘুমিয়ে পড়ে…
শিমু জানালা দিয়ে একে একে শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, সাবান ইত্যাদি ছুঁড়ে ফেলতে থাকে, যদি কেউ দেখে, যদি কেউ শব্দ শোনে… জানালার বাইরের আলো দেখে বোঝার চেষ্টা করে কটা বাজে…
তারেক ফিরবে সেই সন্ধ্যা সাতটায়। ততক্ষণ বাবুই না খেয়ে সুস্থ্য থাকবে? বাবুই যদি রান্নাঘরে চলে যায়? চুলা আছে, বটি আছে, ছুরি আছে…
হাউমাউ করে কান্না আসে শিমুর। ফুপিয়ে কাঁদে কিছুক্ষণ, বাবুই কান্না শুনলে ভয় পাবে। আচ্ছা বাবুই কি আসলেই ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি বারান্দায় গেলো… ও আল্লা, এটা কেমন বিপদ হলো…

চার
কতোক্ষণ যে কাটে। বাবুই এর শব্দ পাওয়া যায়- মামণ, মামণ।
বাবুই, যাদু, সোনা, এইতো মামণ। মামণ তো ভেতরে আটকে গেছি। তুমি ছোটপাখি, একটু ছিটকিনিটা খোলো তো পুতুল। ঐযে লাগানো যায়, খোলা যায়, ঐটা আছে না, ঐটা ধরে উপরে তুলো।
উম… উম… মামণ আসো…
বাবু তুমি ঐটা ওপরে তুলে টান দাও তো। তুমি পারবে তো…

বাবুই ছোট্ট হাতে ছিটকিনিটা ধরে।
সোনাপাখি, ওপরে তুলো। তুলেছো?
উম…
টান দাও, দাও বাবা, আমার জান্টু বাচ্চা…
খট করে একটা শব্দ হয়, বাবুই সত্যি সত্যি ছিটকিনি খুলতে পেরেছে!
শিমু ছোঁ মেরে বাবুইকে কোলে নেয়। ওমা তোমার গা ভেজা কেনো, তুমি হিসু করে সেখানেই ঘুমিয়ে গেছো…
মামণ দুধু…
হ্যাঁ মা দুধু… শিমু অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে… একবার শুধু ঘড়ির দিকে তাকায়, তারেক অফিস গিয়েছিলো ন’টায়, এখন বাজে সাড়ে দশ। মাত্র দেড়ঘন্টা! শিমুর মনে হয়েছিলো সে অনন্তকাল ধরে আটকে আছে দরজার ওপাশে আর এপাশে বাবুই ডেকে গেছে অবিরাম মামণ, মামণ…

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

লেখাটি ৫,৯৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.