ধর্ষণের শিকার নারীর করণীয় কী?

0

গোলাম কিবরিয়া:

একজন নারী যখন ধর্ষকের কবলে পড়েন, তখন তার করণীয় কী? প্রশ্নটা হাস্যকর, কারণ এর উত্তর আমরা সবাই জানি। যেকোনো উপায়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করবেন; সুযোগ থাকলে পাল্টা আক্রমণ চালাবেন। মনে রাখতে হবে, ধর্ষক পরিকল্পনা করেই আক্রমণ করে, ভিকটিম হোন ঘটনার শিকার, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই। এ অবস্থায় তার পক্ষে ভেবে-চিন্তে আক্রমণ করা কি সম্ভব?

সম্প্রতি বেশ কয়েকটি ঘটনায় পুরুষাঙ্গ হারিয়েছে ধর্ষক। যৌন হয়রানির শিকার সব নারীর যদি পুরুষ নামের এই পশুগুলোকে শাস্তি দেয়ার এমন সুযোগ থাকতো, তাহলে হয়তো এ ধরনের অপরাধ অনেক কমে যেতো। রাষ্ট্র যেখানে সুরক্ষা দিতে অক্ষম, সেখানে নিজেকে রক্ষার ভার নিজেদেরই নিতে হয়।

ধান ভানতে শিবের গীত অনেক হলো। এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। সম্প্রতি একটি পোস্টে আবেদন জানানো হয়েছে, যেন ধর্ষকের পুরুষাঙ্গ কেটে না নেয়া হয়। যুক্তি হিসেবে দেখানো হয়েছে, এতে ওই পুরুষটিকে নানাবিধ শারীরিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পোস্টদাতা মুহাম্মদ গোলাম সারওয়ার এর কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই, আপনি ধর্ষকের কষ্টটা বুঝলেন, ধর্ষণের শিকার মেয়েটির বেদনা কে বুঝবে?

মুহাম্মদ গোলাম সারোয়ার বলেছেন, “ধর্ষণ একটি ভয়াবহ অপরাধ। এর আইনী বিচার করতে হবে। এর বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু ধর্ষককে এভাবে শাস্তি দেয়া যাবে না।”

ধর্ষণের বিচার! সেতো আরেক কাহিনী। সম্প্রতি প্রকাশিত বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “ধর্ষণের শিকার মেয়েদের সারাদেশে ৮টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের মাধ্যমে কাউন্সেলিং, পুলিশি ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়। ২০০১ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে প্রতিষ্ঠিত এসব কেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৩শ ৪১টি যৌন নির্যাতনের মামলা হয়েছে, যার মধ্যে ৫শ ৭৮টি বিচার হয়েছে এবং সাজা হয়েছে মাত্র ৬৪টি ঘটনার।”

এই সরকারি হিসাবেই দেখা যাচ্ছে, মোট ধর্ষণ মামলার মাত্র ১৩ ভাগ বিচার হয়েছে। মনে রাখতে হবে, বিচার মানেই কিন্তু ধর্ষকের সাজা হওয়া নয়। জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির তথ্য অনুযায়ী, ধর্ষণ মামলায় সাজা হয় ৩-৪ শতাংশের। আর বাংলাদেশ পুলিশের তথ্যে জানা যায়, ২০১৬ সাল এবং ২০১৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ৪ হাজার ৮শর বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে।

জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, “বিচারহীনতার কারণেই কিন্তু ধর্ষণের বিষয়গুলা আরো বেশি হচ্ছে। বার বার প্রমাণ করতে গিয়ে ভিকটিম দ্বিতীয় বার ধর্ষণের শিকার হয়। থানায় মামলা নিতে বা আসামী পক্ষের আইনজীবী যেভাবে প্রশ্ন করে, তখন কিন্তু সে আরেকবার ধর্ষণের শিকার হয়। আইনে আছে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করতে হবে, বিশেষ ক্ষেত্রে কারণ দেখিয়ে কিছুটা সময় নিতে পারে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে মামলা শেষ হতে দশ বছর, বিশ বছরও লেগে যাচ্ছে।”

এটাই হচ্ছে মুহাম্মদ গোলাম সারোয়ারের “ধর্ষণের আইনী বিচারের” বাস্তব চিত্র। এবং তিনি চান ধর্ষককে ‘অমানবিক’ শাস্তি না দিয়ে আইনের মাধ্যমে বিচার করতে। শুভবুদ্ধি সম্পন্ন সব মানুষই সেটা চান; যদি বিচার এবং সাজা নিশ্চিত হয়। মনে রাখতে হবে, ভিক্টিমের হাতে ধর্ষকের আক্রান্ত হওয়াকে কোনোভাবেই “আইন নিজর হাতে তুলে নেয়ার” তকমা লাগানোর সুযোগ নেই। বরং এটি আত্মরক্ষা। নিজেকে বাঁচানোর প্রাণান্ত চেষ্টা।

মানুষ আক্রান্ত হলে সবার আগে তার ভেতর দুটি রিফ্লেক্স কাজ করে, এক-নিজেকে রক্ষা করা, দুই-পাল্টা আক্রমণ চালানো। দ্বিতীয়টাও মূলত প্রথমটিকে নিশ্চিত করার জন্যই। যেমন কেউ যদি আমাদের উপর ছুরি নিয়ে হামলা চালায়, তাহলে আমরা দৌড়ে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করবো। সেই সুযোগ না থাকলে হামলাকারীর ছুরিসহ হাতটি ধরে ফেলার চেষ্টা করবো, বা ঝুঁকি নিয়ে হলেও ছুরিটি কেড়ে নেয়ার চেষ্টা করবো। সুযোগ থাকলে হামলাকারীকে পাল্টা আঘাত করবো, তাই না! ধর্ষকের অস্ত্র হচ্ছে তার পুরুষাঙ্গ, এবং আক্রান্তের হাতের নাগালে থাকে সেটি। সুতরাং স্বাভাবিক রিফ্লেক্সেই তার উপর হামলা করে ভিক্টিম।

আমার প্রশ্ন: ধর্ষণের শিকার একজন মেয়ের বা নারীর পক্ষে কি সম্ভব ভাবনা-চিন্তা করে তার উপর আক্রমণকারীকে ঠেকানোর কৌশল বের করা? একজন ধর্ষক ভিকটিমকে কতোক্ষণ সময় দেবেন এ জন্য? পুরুষাঙ্গে আঘাত করা যাবে না, তাহলে কষ্ট পাবে ধর্ষক। চোখে আঁচড় দেয়া যাবে না, তাহলে অন্ধ হয়ে যেতে পারে ধর্ষক। দা-ছুরি দিয়ে আঘাত করা যাবে না, তাহলে মারাত্মক জখম হতে পারে। আঁচড়ানো-খামচানোও বোধ হয় ঠিক হবে না, তাতে ত্বকে স্থায়ী দাগ পড়ে যেতে পারে……বরং ধর্ষণ হতে দিন। তারপর না হয় থানায় গিয়ে মামলা করে অনন্তকাল অপেক্ষা করুন বিচারের। ধন্যবাদ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 581
  •  
  •  
  • 7
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    588
    Shares

লেখাটি ২,৮৬৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.