গল্পটি পুরুষের, সুতরাং পুরুষকেই বুঝতে হবে

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

‘না, আপনি বুঝবেন না। আপনাকে আমি যতই বিশদে বিস্তারিত করে বলি না কেন, আপনি বুঝবেন না এই গল্পের কষ্ট।’ নারীকণ্ঠটি বলে ওঠে আগের চেয়ে আরও দৃঢ়ভাবে।

‘অবশ্যই আমি বুঝব। আমি সাহিত্যের ছাত্র। বিশ্বের প্রখ্যাত গল্পকারদের গল্প আমি পড়ি এবং কখনো কখনো বিশ্লেষণও করি।’ বিরক্তিটা এবার রাগ হয়ে প্রকাশ পায়।

‘একজন নারীর ধর্ষিত হওয়ার কষ্ট একজন পুরুষ কেমন করে বুঝবে? আপনি যত পণ্ডিতই হোন না কেন, আপনি কী বুঝবেন ধর্ষণের শিকার একজন নারীর কষ্ট?’

কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বলি, ‘ঠিক আছে, কোনো নারী লেখককে আপনার গল্পটা শোনান তবে। আমার ট্রেনও চলে আসবে এখন।’

‘কিন্তু এই তীব্র কষ্টের যন্ত্রণা পুরুষ যত দিন না অনুভব করছে—যেমন করে একজন নারী অনুভব করে—তত দিন ধর্ষণের শিকার হব আমরা। আপনাকে শুনতেই হবে এবং আপনাকে ধর্ষণের শিকার নারীর কষ্ট সমানভাবে অনুভব করতে হবে। পৃথিবীর কোথাও কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে যেন আপনিও ব্যথায় কুঁকড়ে যান। শঙ্কায় রাতের পর রাত কেটে যায় নির্ঘুম। আতঙ্কে প্রতিটা স্বপ্ন রূপান্তরিত হয় দুঃস্বপ্নে। আপনি প্রস্তুত তো? যতক্ষণ আমার গল্প শেষ না হচ্ছে, আপনি এখান থেকে উঠতে পারবেন না। যেখানে ধর্ষক মানেই পুরুষ, সেখানে ধর্ষণমুক্ত পৃথিবীর জন্য একজন পুরুষকে এটুকু করতে বলা নিশ্চয় বেশি বলা হলো না?’

উপরের কথোপকথনটি আমার সাথে কারোর নয়| এটি একটি গল্প থেকে নেয়া| গল্পের নাম “গল্পটি পুরুষের কিন্তু কোনো পুরুষ বুঝবে না”| লিখেছেন তরুণ গদ্যসাহিত্যিক মোজাফ্ফর হোসেন| …অল্প-বিস্তর গল্পের আলোচনা আমি লিখি বটে কিন্তু আজ সেই চিরাচরিত রিভিউ লিখতে বসিনি| শুধু এই গল্পের নিদারুণ একটি সত্য সবাইকে জানাতে চাই|

গল্প থেকে নেয়া উপরের কথোপকথনে বোঝা যাচ্ছে গল্পলেখক একজন পুরুষ| স্টেশনে অপরিচিত এক নারী তাঁকে ধর্ষণের একটি গল্প শোনাতে চাইছেন| এবং গল্পে দেখাও যায়, শেষে তা শুনিয়েছেন| কদিন আগে বাসের ভেতরে রূপার ধর্ষিত হবার গল্পটি| মুহূর্ত থেকে মুহূর্তে, আশা-নিরাশা এবং আকুল এক অলৌকিক প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে, অবধারিতভাবে যেই ধর্ষণের গল্পটির জন্ম হয় সচরাচর~ সেই গল্পটিই পুঙ্খানুপুঙ্খ তিনি লেখককে শুনিয়েছেন|

গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেন এর লেখা এই গল্পটি আমার ভালো লেগেছে| ভালো লেগেছে দুটো কারণে| প্রথম কারণ- তীব্র এক ‘সত্য মেসেজ’ আছে গল্পটায়| …যতদিন দেশে ন্যায় বিচারের প্রতিষ্ঠা নেই দেশে, যতদিন ধর্ষকের শাস্তি ৬-১২ মাসের জেল; ততদিন আমাদেরকেই ‘ধর্ষণ-মনস্ক পুরুষ বা সমাজ’কে রুখতে হবে! কিভাবে? আমরা নারীরা তো চিল্লিয়ে গলা ফাটিয়ে ফেলছি, লাভ হচ্ছে কি?

নাহ! পরিবার ও সমাজের শিক্ষাই আমাদের এমন যে, আমাদের পুরুষেরা নারীর কষ্ট তো দূরের কথা; নারীর কোনো বাদ-প্রতিবাদ-বক্তব্যই সেভাবে বুঝতে পারে না! অথচ সেই একই প্রসঙ্গ ‘পুরুষ’ অবতারণা করলে, ঠিকই বোঝে! এখন কথা হচ্ছে যেভাবেই হোক, সকল পুরুষকে ধর্ষণের ভয়াবহতা বুঝতে হবে|

‘আমি তো ধর্ষক নই’ কিংবা ‘আমি তো আর ধর্ষণের শিকার হচ্ছি না’ এই ভেবে সাধারণ পুরুষ এর নির্বিকার বসে থাকার দিন আর নেই! পুরুষকেও নারীর মতো করেই আন্তরিকভাবে প্রতিবাদী হতে হবে| কারণ ‘ধর্ষক’ একজন ‘ভয়ঙ্কর বিকৃতকামী’ মানুষ| শুধু নারী-ধর্ষণে তারা আর আজ থেমে নেই| ‘মেয়ে শিশু’, ‘ছেলে শিশু’ সবাই ওদের শিকার হচ্ছে| সেদিন একজন প্রফেশনাল সাইকোলজিস্ট এর সাথে আলাপ চলাকালে জানলাম, “ধর্ষকের মতো বিপদজনক অপরাধীরা, একপর্যায়ে শুধু ধর্ষণেই আর তৃপ্ত থাকে না| তারা বিকৃত আনন্দ লাভের জন্য খুন সহ আরো অনেক ধরণের সামাজিক অপরাধ একাধারে করতে থাকে|” সুতরাং সমাজের সামগ্রিক বিপদ রুখতে পুরুষকে বুঝতে হবে| এগিয়ে আসতে হবে|

গল্পটি ভালো লাগার দ্বিতীয় কারণ গল্পকার মোজাফ্ফর হোসেন একজন পুরুষ| নারী লেখকের গল্পে ‘একজন ধর্ষিতা’ কিংবা ‘সম্ভাব্য ধর্ষিতা’র গল্প অনেক পড়েছি| কিন্তু পুরুষ লেখকের লেখায় ধর্ষণের পূর্ববর্তী কিংবা পরবর্তী অনুভূতির এমন সুতীব্র প্রকাশ, এর আগে তেমন আর পাইনি| পুরুষ লেখকদেরই উচিত এখন এ নিয়ে লেখা! ফেইসবুক এ দুই/একটা স্টেটাস দিয়েই পুরুষের সামাজিক দায় শেষ হয়ে যায় না!

এই গল্পটির সাহিত্যমূল্য কোথায়, কতখানি, কেমন ছিল তা নিয়েও আলোচনা করা যেত| একটু সমালোচনাও হয়তো করা যেত ছোটোখাটো; যেমন আমার দৃষ্টিতে ~ খুব তাড়াহুড়া ছিল লেখকের, গল্পটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত! কিন্তু আগেই বলেছি সেগুলো আজ আমার বিষয় নয়| তাই সব কিছু ছাপিয়ে গল্পকারকে জানাই আমার সাধুবাদ এবং আন্তরিক অভিনন্দন! অন্যান্য পুরুষেরাও এগিয়ে আসুন! আপনার পাশের পুরুষটিকে ‘সাধারণ-স্বাভাবিক এক মানুষ’ রূপে তার মনোজগৎটিকে গড়ে দিতে সাহায্য করুন!

সবাইকে যে লিখেই এ কাজ করতে হবে তা নয়| পুরুষ, আপনিই ভেবে বের করুন, এক্ষেত্রে কিভাবে আপনার ইতিবাচক ভূমিকাটি রাখবেন!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 795
  •  
  •  
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    800
    Shares

লেখাটি ৩,০৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.