আলোচনায় রনি: বাতাস কোনদিকে?

golam mawola roniসুপ্রীতি ধর (৩১ জুলাই ২০১৩): সরকারি দলের সংসদ সদস্য গোলাম মাওলা রনি আবারও আলোচনায়। এবার আর টকশোবাজ হিসেবে নয়, এবার ডাণ্ডাবাজ হিসেবে। খবরে প্রকাশ, উনি পিটিয়েছেন ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন চ্যানেলের একজন রিপোর্টার ও একজন ক্যামেরা পারসনকে। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি মামলাও হয়ে গেছে। দুজনের মামলার ভাষাও এক – ‘হত্যা চেষ্টা’।

রনির অভিযোগ, গত বেশ কিছুদিন ধরেই তিনি শেয়ার বাজার কেলেংকারি তথা সালমান এফ রহমানের সমালোচনায় মুখর বলে তার পিছনে লোক লাগানো হয়েছিল। তারা তাকে নিয়মিত অনুসরণ করে আসছিল। শেষতক দুই কোটি টাকার টোপ ফেলে তাকে শায়েস্তা করতে চেয়েছিল। তারই জের ধরে শনিবার দুজন সাংবাদিক তার অফিসে গেলে ‘অপ্রীতিকর’ ঘটনা ঘটে। এজন্য তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। সাংবাদিক নেতারাও তড়িঘড়ি ঘটনাস্থলে এসে ‘সম্মানজনক মীমাংসা’ করে ফেলেছেন। অবশ্য পরবর্তীতে তারা রনিকে সব ধরনের টকশো থেকে বাদ দেয়ার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন। খুবই ভাল উদ্যোগ। এমন পদক্ষেপ আরও চাই। কষ্ট হয় ভেবে যে, সাগর-রুনি হত্যার পর আমরা এমন জোরালো কোন পদক্ষেপ নিতে দেখিনি সাংবাদিক নেতাদের। সেক্ষেত্রেও আঁতাতের দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে সর্বত্রই।

রনি-সালমানের এই দ্বৈরথ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকে ঝড় বইছে। ফেসবুক এমনই একটা স্থান যেখানে পান থেকে চুন খসার জো নেই। কিছুই নজর এড়ায় না কারও। ভাল হোক, মন্দ হোক, সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সবাই বাকযুদ্ধে। এবারের লড়াইয়ে রনির পাল্লা ভারী, নাকি সালমান এফ রহমানের পাল্লা ভারী, সেই সীমারেখা টানা খুব শক্ত। তবে রাজনৈতিক শক্তিই বলেন, আর অর্থশক্তিই বলেন, কেউই কম নন।
সুব্রত ঘোষ নামের একজন লিখেছেন, ‘গতকাল রাতে চ্যানেল আইয়ের তৃতীয় মাত্রায় এমপি গোলাম মাওলা রনি ও ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির নিউজ হেড মুহিউদ্দিন খালেদ এর টক শো দেখে একটা বিষয় পরিষ্কার যে, দুই পক্ষের মধ্যেই অবশ্যই কিছু ঘাপলা আছে। এমপি রনি সাহেবকে কেমন জানি চিন্তিত বা শংকিত মনে হল, আর মুহিউদ্দিন খালেদ সাহেব তো যেভাবে বা সুরে কথা বলেছেন তাতে মনে হয়েছে বাংলাদেশে এমপিরা সব চোর-বাটপার আর উনারা সাংবাদিকরা সব বেহেশতের খুরমা-খেজুর’। তিনি এই ঘটনার রহস্য উন্মোচন করে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নিউইয়র্ক থেকে সাংবাদিক আশরাফুল আলম খোকন লিখেছেন, ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন কর্তৃপক্ষের দাবি, ওনারা “গোপন” সূত্রে খবর পেয়েছেন, এক সরকারী কর্মকর্তা ২ কোটি টাকা ঘুষ নিয়ে এমপি রনি’র কাছে আসবেন ! এটার সংবাদ সংগ্রহের জন্যই এমপি মহোদয়ের অফিসের দরজা ও বাসা পর্যন্ত ক্যামেরাসহ সাংবাদিক বহরের অবস্থান ! অবশ্যই এটার সংবাদ মূল্য অনেক ! কিন্তু এটা আমার মাথায় ঢুকছে না, যেই সংবাদ ওনারা গোপনে পেলেন ঐটার ভিডিও ধারণ করার জন্য অফিসের আর বাসার দরজায় অবস্থান কেন ? ওনাদের কি ধারণা ছিল সরকারী কর্মকর্তা আর এমপি রনি ফাটাকেষ্ট মন্ত্রীর মত “ঘুষ” নাটকের শুটিং করবেন’?
ওপরের দুটি মন্তব্য ধরেও যদি আলোচনা হয়, তারপরও বলবো যে, এক হাতে কখনও তালি বাজে না। হয়তো দুপক্ষের যুক্তিই এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ। আবার দুপক্ষের বিরুদ্ধেই যে অভিযোগ উঠেছে, তাও হয়তো সত্য।
রনির বিরুদ্ধে এর আগেও সাংবাদিক পেটানোর অভিযোগ আছে। মূলত তাকে আমরা অনেকে প্রথমে চিনেই ছিলাম সাংবাদিক পিটিয়ে হিসেবে। পরে তিনি টকশো এবং তারই ‘সারথী সাংবাদিক’দের কল্যাণে তিনি উঠে আসেন রীতিমতোন ‘বুদ্ধিজীবীদের’ কাতারে। নিজ দলের বিরোধিতা করে বক্তব্য দেয়ায় তিনি খুব কম সময়ের মধ্যেই অনেকের কাছে ‘হিরো’তে রূপান্তরিত হন। মানুষ ভুলে গেছিল তার অতীত। কথায় বলে না, ল্যাঞ্জা ইজ এ ডিফিকাল্ট থিঙ্ক টু হাইড, তারও সেই লেজটা আবার বেরিয়ে এসেছে। যে সাংবাদিকরা এতোদিন তাকে মাথায় করে নেচেছে, তারা এখন কিছুটা নড়েচড়ে বসতে বাধ্য হচ্ছেন।
তবে লেজটা কিভাবে বের হলো? সালমান এফ রহমানের ‘বদান্যতায়’। রনি কিছুদিন ধরেই যেভাবে দরবেশ চাচার পিছনে লেগেছিলেন তার শেয়ার বাজার কেলেংকারি নিয়ে, তাতে করে শিগগিরই যে এমন একটা কিছু ঘটবে, তার আভাস কিছুটা হলেও পাওয়া যাচ্ছিল। এতো সহজে যে উনি ছাড়া পাবেন না, সেটা শিশুরাও বুঝবে।
সাংবাদিক শরীফুল হাসান তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেছেন, ‘রনি আর দরবেশ দুজনেই কিন্তু আওয়ামী লীগের লোক। জাতি দেখছে আওয়ামী লীগের এক এমপি সাংবাদিক পেটান, আরেকজন শেয়ারবাজার লুটপাট করলেও বিচার হয় না। সরকারবিরোধিরা কিন্তু হেভি মজা লুটছে। এই খেলায় দুদিক থেকেই তাদের লাভ’।
আবার একদল রনির সমালোচনার বদলে সাংবাদিকতার নীতিমালা নিয়ে সোচ্চার। তারা রনির পক্ষ নিয়ে বলছেন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভি সাংবাদিকতার নীতি মানেনি। চারদিন ধরে ক্যামেরা পিছু লাগিয়ে অপসাংবাদিকতা করেছে।
এখানে একটি বিষয় না বললেই নয়, ঘটনা যাই হোক না কেন একজন সাংসদ এভাবে কাউকে লাথি মারতে পারেন না, পেটাতে পারেন না। যদি তার পিছনে লোকই লাগিয়ে থাকবে, আর তিনি যদি তা টেরই পেয়ে থাকেন, তাহলে তো আইন-আদালত আছে। উনি তার দ্বারস্থ না হয়ে একজন সাংসদের ক্ষমতা দেখালেন, এটা কতটা শোভনীয়? তাছাড়া রনির একটা অনলাইন পত্রিকা আছে, ডি নিউজ নামে, সেটাতে তিনি সম্পাদক হিসেবে যা লিখেন, সেটাকে কতটা নৈতিকতাসম্পন্ন বলা চলে?
হাসান আরও লিখেছেন, ‘এবার আসি একটু দরবেশ প্রসঙ্গে। রনি গত চার বছরে এই দরবেশ বাবার নাম বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলেছেন। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির জন্য দরবেশের বিচার হয় নাই সেটা তো সবাই জানে। কিন্তু যেই দরবেশ বাবাকে গালি দিচ্ছেন তিনি সেই দরবেশ বাবা তো তারই দলের লোক। তাইলে কেন দলীয় ফোরামে বা প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার চাইছেন না? আর প্রধানমন্ত্রীও কেন শেয়ার কেলেঙ্কারির বিচারটা করছেন না’!
খুবই যৌক্তিক। এই সরকারের বিরোধিতা যারা করেন, বা শুভাকাঙ্খীরাও যে কয়টা বিষয় তুলে ধরেন সমালোচনা করতে গিয়ে, সেখানে শেয়ারবাজার কেলেংকারির কথাও আছে। সরকারের খুব ভঙ্গুর জায়গা এটি। কিন্তু কেন তা শক্ত হাতে এর মোকাবিলা করতে পারলো না, তা ভেবে দেখার অবকাশ আছে। যেমন আছে পদ্মা সেতুর ক্ষেত্রে আবুল হোসেনের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ না নেয়ায়, বিশ্বজিত হত্যা, সাগর-রুনির খুনের ঘটনার কোন সুরাহা আজতক না হওয়া।
এখন নিজ দলের মধ্যে এই মারামারি, কামড়াকামড়িতে লাভবান হবে বিরোধীরাই। এটা সরকারকে বুঝতে হবে এবং তা এখনই। শরীরের কোন অংশে গ্যাংগ্রিন হলে তা কেটে ফেলে দেয়াই কর্তব্য। সরকারের এখন উচিত এই গ্যাংগ্রিনগুলোকে অপসারণ করা, নইলে বিস্তৃত ক্যান্সার কাউকে রেহাই দেবে না, মারা পড়বো আমাদের মতো আম-জনতাও।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.