আমি বিবাহিতা

0

পায়েল চক্রবর্ত্তী:

কাল লাঞ্চ করতে বেরিয়ে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হলাম। ঘটনাটা আপনাদের সাথে একটু শেয়ার করি,

আমি আর আমার কলিগ একসাথে একটা দোকানে দাঁড়িয়ে খাচ্ছিলাম। দোকান চালাচ্ছেন একজন মহিলা, মধ্যবয়স্কা। আমার কলিগটি মিশুকে মানুষ, আমি একেবারেই কথা বলি কম, অপরিচিত লোকজনের সাথে হুট করে কথা বলার অভ্যাস নেই কোনোকালেই, নেহাৎ দরকার না পড়লে মাপা হাসির বাইরে খুব বেশি বাক্যস্ফূর্তি কখনোই হয়ে ওঠে না আমার।

তা, আমার কলিগ আর আমি পূজোর শপিং নিয়ে কথা বলছিলাম, কথা প্রসংগে দোকানি ভদ্রমহিলা হঠাৎ বলে উঠলেন,
-” এর বিয়ে হলে শাশুড়ির সাথে খুব লাগবে।”
আমি ওনার কথার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলাম না, আলটপকা একথা কেন? আর আমি তো বিবাহিত!

আমি ওনার দিকে ঘুরে তাকাতে উনি বললেন – ” ওহ! তুমি তো বিবাহিত!”
আমি মুখে এক চিলতে হাসি মাখিয়ে ওনাকে জানিয়ে এলাম, হ্যাঁ, আমি বিবাহিত এবং আমার সাথে আমার শাশুড়ি মায়ের একটুও ‘লাগে’ না।

ওনার এই আলটপকা মন্তব্যের কারণটা আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, উনি এড়িয়ে গেলেন, বললেন,
-” এখনকার শাশুড়িরা তো ভালো, আমাদের যে কী গেছে…. “
ইত্যাদি ইত্যাদি।
উনি এড়িয়ে গেলেও আমি খুব ভালো মতো বুঝলাম আমার মাপা হাসি, কম কথা, চুলের লাল রঙা হাইলাইট সবই এক আদর্শ বধূর আদর্শ ছবির বিপরীতে গেছে। আর উনিও অত্যন্ত অখুশী ওনার প্রেডিকশন ভুল জেনে!

কম কথা মানেই মেয়ে দেমাগি! শুধুমাত্র বিয়ে হয়ে গেছে বলে আমি ইচ্ছেমতো সাজতে পারবো না, এই ধরনের মানসিকতা আজও এই সমাজে কতজন বয়ে বেড়ান তাই ভাবি। এদের বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাথে এদের কত ‘লাগে’ আর ‘লাগবে’ ভেবেই পাচ্ছি না।

আমি কেবল বিবাহিতা বলে আমায় লম্বা কালো চুলে আলো করতে হবে এমন কথা কোথাও লিখিনি আমি, ব্যক্তিমাত্র তার ইচ্ছের মালিক। আমি বিবাহিতা বলে সেই মালিকানা দখল করে অন্য কেউ খবরদারি চালাবে তাতে ভাই আমি রাজী নই।
বাড়ির বৌ বলে সে চাকরি করেও এসে সারাদিন পর বাড়ির হেঁসেল ঠেলবে, কেন?? তাদের ক্লান্তি কি ঘাস খেতে যায় না কি! বাড়ির বৌ, তাই তার ইচ্ছে না থাকলেও তাকে বাড়ির মজলিশে পরচর্চা শুনতে হবে, পিত্তি জ্বালানো ডেইলি মাথামুণ্ডুহীন সিরিয়াল দেখতে হবে, কেন?

হ্যাঁ, এইসব ম্যাদামারা জিনিস পত্রে আমার আপত্তি আছে। আমি আমার চারপাশে গণ্ডি টেনে রাখি, যারা আমার খুব কাছের, তারা ভীষণ ভালোভাবে জানে আমি কী! বাকিরা কে কী ভাবলো, সে নিয়ে কোনোদিন আমার কিছু যায় আসেনি, আসবেও না। আমি ঘন্টার পর ঘন্টা বসে কার বাড়ির দেওয়ালে পাঁচটা টিকটিকি, কে মোচার ঘন্টে চিনি দেয়, কার লাল জামার ভেতরে অন্তর্বাস জলের মতো বোঝা গেছিল, সেসব শুনতে আগ্রহী নই, তাতে কারো আমায় দেমাগি মনে হলে, হোক! সেটা ভাই তার সমস্যা, আমার নয়।

আরো একটা সমস্যা আছে, স্যোশাল মিডিয়া! অনেক রাতে ফেইসবুকে অনলাইন দেখলে লোকজন অনায়াসেই ভেবে বসে এর ব্যক্তিগত জীবন খারাপ, একে খেলানো চলে।

আত্মীয়দের মধ্যে কানাঘুষো শুরু এর বাপু নির্ঘাত চরিত্রের দোষ! ইনবক্সে লোকজনের কৌতুহল উপচে পড়ে এতো রাতে কেন অনলাইন?

সাধারণ লোকের কথা বাদই দিন। এক স্বঘোষিত নারীবাদী এবং মুক্তমনা লোককেও দেখেছি দিনের পর দিন এক প্রশ্ন করতে!
রাত্রি মানেই বিবাহিতারা বরের দেহতৃষ্ণা নিবারণ করবে, নয়তো ঘুমাবে। আরে ভাই, আমি যা ইচ্ছে করবো, তুমি বলার কে? নিজেরা তো বিবাহিত কিম্বা অবিবাহিত কারোকেই ছাড়েন না, যতো গাত্রদাহ কি মেয়েদের বেলায়?

আমি নখে কালো নেইল পলিশ লাগালে অশুভ, চুল খোলা রাখলে অশুভ, স্লিভলেস পরলে “আহ! কী গরম বৌদি!”
একটা সম্পর্কের কী চরম অবনতি! আমি বিবাহিতা বলে বোল্ড কিছু পরলেই আমার ওপর চরিত্রহীন তকমা লাগবে,
কেন??

বিয়ে করার সময় কেউ দাসখত লিখে দেয় না যে তোমার দেওয়া এক চিলতে সিঁদুরের বদলে আমার যাবতীয় শখ আহ্লাদ তোমার পায়ে উৎসর্গ করলুম। একটা আধ দামড়া পুরুষ তার একপা ভর্তি লোম আর বিশাল ভুঁড়ি নাচিয়ে হাফপ্যান্ট আর টিশার্ট পরে বিশ্ব চষে ফেলতে পারে, আর আমি স্রেফ মেয়ে এবং বিবাহিত বলে আমায় যথাসম্ভব গা হাত পা ঢেকে বেরুনোই শ্রেয়?

আমাদের এই সমাজের লোকজন যে কতখানি হিপোক্রিট সেটা বলার অপেক্ষা রাখে??

তবু স্বস্তি, আমার ব্যক্তিগত জীবনে এরকমটা হয় না। আমার শাশুড়ি মা বরাবর বলেন,
“তোর যা ইচ্ছে পরবি, আমরা পারিনি বলে তুই পারবি না, এমন যেন হয় না। এই তো বয়স নিজের মতো থাকবি।”

সেকারণেই জোর পাই আরো বেশি। মাকে জোর করে চুলে বার্গ্যান্ডি রঙ মাখিয়ে দিই, নিজেও যা ইচ্ছে তাই সাজি। তাতে আমায় যদি কেউ আদর্শ বউ না ভাবতে পারলো, তাতে আমার কিচ্ছুটি যায় আসে না, বিশ্বাস করুন, একটুকু না।

আমি ইচ্ছে হলে হাসবো, নইলে হাসবো না। ইচ্ছে হলে কথা বলবো, নাহলে বলবো না। ইচ্ছে হলে চুলে কাঁচি দেবো, নইলে দেবো না। ইচ্ছে হলে কানে নাকে দশটা ফুটো করাবো, কিন্তু যদি বলতে আসেন নাক ফুটো না করলে বরের অমঙ্গল, আমি হেসে বলবো,
দয়া করে মরে যান সময় করে!!
আমি ইচ্ছে হলে আলতা রাঙা পায়ে লাল গরদ পরে উঠোন রাঙাবো, কিন্তু আমার ঘাড়ের ট্যাটু তার জন্য লুকাবো না কিছুতেই।

আমি মেয়ে, আমি সুন্দর এবং নিজে নিজের মালিক। এই সহজ সত্যটা যেদিন প্রতিটা মেয়ে বুঝতে শিখবে সেদিন আমাদের সমাজ টাও একচোখামি বন্ধ করতে বাধ্য হবে, হবেই।।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ৫৭,৯৯৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.