ধর্ষণ: প্রকৃতিগত নাকি সামাজিক শিক্ষা ও রীতিলব্ধ ফলাফল?

0

সাদিয়া রহমান:

ঘটনা ১: আমি যে বাসায় পড়াতে যাই প্রায় দেড় বছর যাবত, আমি সেইখানে পড়াচ্ছি। নিয়মিত যাচ্ছি আসছি। দেড় মাস আগে হুট করে গেটে দারোয়ান সাহেব আটকালেন। চরম ধমক! “এই মেয়ে কোথায় যাওয়া হচ্ছে?” আমি বেশ অবাক হলাম। ছোট খাটো সাইজ দেখে হয়তো আমার বয়স অনুমান করা যায় না, কিন্তু নিয়মিত আসার পরেও এমন ধমকের মর্ম না বুঝে শুধু তাকালাম, এবং বললাম, কোথায় যাবো আর কেনো এসেছি। সেই লোক তখনো ধমকের উপরেই আছে “এই এইখানে দাঁড়াও। আমি আগে ফোন করে দেখবো ওদের বাসায়। এইদিকে এই সাইডে এসে দাঁড়াও।”

এক লোক ঢুকলো, তার দিকে তাকিয়ে বলে,”স্যার, আপনি একটু অপেক্ষা করেন এইখানে”! পরে স্টুডেন্ট এর বাসায় ফোন করা হলো, উনারা হয়তো একটু বকা দিয়েছিলেন। পরে সেই লোক মাফ চাইলো আর বললো, এইটা তার ডিউটি। আমি কোনো কথা না বাড়িয়ে চলে আসলাম। পরে স্টুডেন্ট বললো, কোনো এক ভাড়াটিয়া ঘুরতে গেছে তার এক পুরুষ রিলেটিভের জিম্মায় বাসা রেখে। তার মেয়েবন্ধু আসে, সমাজে কথা হয়, তাই এখন থেকে নিয়ম যেই আসুক, অপরিচিত হলে আগে ফোন দিবে। ঠিকই আছে। যে দিনকাল, সিকিউরিটির জন্যই এমন করা উচিত। কিন্তু অবাক লাগলো, আমাকে সে চিনে না, আমি অপরাধী কিনা সেটা সে জানে না, কিন্তু আমাকে সে ধমকাতে পারে, শাসন করতে পারে এমন ধারণাটা সে গভীরভাবে পোষণ করে! একজন লোককে সে ‘স্যার’ বলতে পারে, কিন্তু পাশাপাশি আমাকে সে ধমকের ওপর রাখতে পারে!

ঘটনা ২: বছর খানেক আগে আমি আর আমার বান্ধবী হেঁটে যাচ্ছি। চরম গল্প করছি। এক রিকশাওয়ালা জিজ্ঞেস করলেন, যাবো কিনা। আমরা বললাম যে, যাবো না। সে জিজ্ঞ্যেস করছে তো করছেই, কোথায় যাবো আমরা? দুইবার বলেছি যাবো না, বলে হাঁটছি। হুট করে সামনে চলে আসলেন রিকশা নিয়ে, এবং চরম মেজাজ দেখাতে লাগলেন। “এই মেয়ে তোমাদের বাপ কী করে? কোথায় থাকো? ডাকলে শুনতে পাওয়া যায় না? কোথায় পড়াশুনা করো তোমরা?” কী অদ্ভুত! আমরা রিকশায় উঠবো না, সেটা নিয়েও সেই লোক হম্বিতম্বি করতে পারে!

ঘটনা ৩: রোজার মধ্যে ফিরছিলাম। সাথে বোন ছিলো বলে সাহস করে নাইট কোচে উঠে গেছিলাম। আমাদের দুই বোনের পাশে এক লোক। আমরা খুব অসামাজিক। রাস্তাঘাটে অচেনা মানুষের সাথে গল্প ঠিক হয়ে উঠে না। তাই ট্রেনে উঠেই ঘুম। সেহরির সময় কিছুক্ষণ জেগে থাকা। সেই সময় ফোনটা হাতে নিলাম। পাশের ভদ্রলোক বেশ উস্খুস করে কথা শেষপর্যন্ত শুরু করতে পারলেন, “তোমরা এখনকার জেনারেশন খালি ফোন নিয়ে ব্যস্ত। বই পড়ো না। আমরা বই পড়তাম।” তারপর এই-সেই ম্যালা কথা।
সেই লোক নিজে বইপত্র লিখেছে এইসব। তারপর উনি বর্ণনা করতে লাগলেন, কীভাবে ফোন আজকাল সবকিছু ধ্বংস করে দিচ্ছে। আজকাল সবাই আল্ট্রা মডার্ন হয়ে যাচ্ছে। যুব সমাজ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি। তারপর বলতে লাগলেন, “এই যেমন ধরো, সংসারও আজকাল ফোনের জন্যই নষ্ট হচ্ছে। কেনো? কারণ এইসব ফোনের মধ্য দিয়ে পর্ন সহজলভ্য হয়ে যাচ্ছে। সবার ফোনে ফোনে পর্ন!”
আমি এমনিতেই অচেনা মানুষের সাথে কথা বলতে পছন্দ করি না। উপদেশ তো দূরের কথা। তার ওপর কথা যদি হয় এইরকম। বেশ চিৎকার করেই বলে উঠলাম “আল্ট্রা মডার্ন হওয়ার কিছু সুবিধা তো পাচ্ছেন। মেয়ের বয়সী একজনের সাথে ফোনে পর্ন নিয়ে কথা বলতে পারছেন।” আশেপাশের সবাই ঘুরে তাকালো, কিন্তু লোকটা শেষপর্যন্ত চুপ করেছিলো। আগে জার্নির সময় যখন কাউন্টারে বলতো, মহিলা সিট নাই কিন্তু। ছেলের পাশে বসতে হবে, যাবেন? প্রথম প্রথম ভাবতাম, ওমা! কী হবে গেলে? এখন শুধু পই পই করে ‘মহিলা সিট’ খুঁজি। ভার্সিটির বাসে দুপুরে উঠলেও বার বার বাসা থেকে বলে যে বাস ফাঁকা হলে বাসে যাওয়ার প্রয়োজন নাই।

ঘটনা ৪: ফেসবুকের আদার বক্সের কথা তো নতুন করে বলার নাই। আদার বক্স বাদ থাকুক। স্বল্প পরিচিত পুরুষেরাও মনে করে তাদের সাথে খোশগল্প করা সেইসব মেয়েদের একান্ত কর্তব্য, যাদের সাথে তারা খোশগল্প করতে চায়। বেশ কদিন আগে ক্যাম্পাসে ভালো হিসেবে নাম পাওয়া এমন একজনের স্ক্রিনশট পাব্লিকলি না, প্রাইভেটলি প্রকাশ করেও সবার তোপের মুখে পড়েছিলাম। একদিনের ক্যাজুয়াল পরিচয় তারপর রিকোয়েস্ট। এক্সেপ্ট না করলে সুন্দর অতি সভ্য ভাষায় মেসেজ! আমি জানি, আমার মতো অসংখ্য মেয়ে ফেসবুকের কাছে কৃতজ্ঞ, ফিল্টার অপশনটা নিয়ে আসার জন্য।

ঘটনা ৫: বাসে, লেগুনায় হেল্পারদের কাছে ছোঁয়াছুঁয়ির শিকার হওয়া নতুন কোনো ঘটনাই না। বাসের ড্রাইভার আর হেল্পার এর শিকার রূপা যদিও প্রায় থিতিয়ে যাওয়া একটা ঘটনা এখন। তবু এদের কাছে যৌন হয়রানির শিকারের ব্যাপারটা চিরন্তন। ছোটো শহরগুলোতে সেই তালিকাতে যুক্ত হয় অটো ড্রাইভার। প্রায় শুনি, “আমি মেয়ে মানুষ আমার গাড়িতে তুলতে চাই না। ভেজাল। ভাড়া দিতে টাইম লাগায়”। এই বলে পাশের প্যাসেঞ্জারের সাথে হাসি। আবার এই অটোর মধ্যে বসে থেকেও বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের কাছে হয়রানি নতুন না। তবে আমার অভিজ্ঞতায় এক অসাধারণ অটোওয়ালা একবার পেয়েছিলাম যে অটো থামিয়ে এক বিকৃত রুচির মানুষকে নেমে যেতে বাধ্য করেছিলেন, এবং বলেছিলেন, “আপা আপনি মেরে দিলেন না কেনো লোকটাকে? এতো কমে ছাড়া ঠিক হলো না।” এরাই স্বপ্ন দেখায়।

এই যে অভিজ্ঞতাগুলো, সেগুলো সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের থেকে অর্জন করা। শ্রেণি ভিন্ন কিন্তু অন্তর্নিহিত কথা এক। সবাই কেন যেন মনে করে যে, যেই শ্রেণি থেকেই আসুক, যেকোনো শ্রেণির নারীর ওপর তার কর্তৃত্বের একচ্ছত্র অধিকার আছে। এই ব্যাপারটা আগে থেকেই অনেক নাড়া দিতো। যখন মধুমিতা পান্ডে নামের একজন ভারতীয় মেয়ের গবেষণা বিষয়ে পড়লাম, তখন ব্যপারটা নতুন করে আবিষ্কার করলাম। তিনি তার গবেষণা কাজে একশ ধর্ষকের সাথে কথা বলেছেন, তাদের মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করেছেন, এবং তিনি বলেছেন, বেশিরভাগ ধর্ষক মনেই করে না এটা একটা অপরাধ।

এই ব্যাপারটা কি আসলেই ধর্ষকদের মজ্জাগত সমস্যা? সমাজের বেশিরভাগ মানুষই কি আসলেই এই রকম ভাবেই চিন্তা করে না? যেকোনো শ্রেণির পুরুষই কি যেকোনো শ্রেণির নারীর ওপর আধিপত্য আছে বলে মনে করে? নইলে রিশা নামের মেয়েটিকে একজন টেইলার্সের সহকারির পক্ষে হয়রানি করা এবং শেষপর্যন্ত খুন করা সম্ভব ছিল না। এই যে ধর্ষণ এর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে; তা কি আসলেই শুধু ধর্ষকদের মানসিক বিকৃতির কারণে? নাকি সমাজের নির্লিপ্ততার কারণে? নাকি সামাজিক শিক্ষা ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের অভাবে? এটা ভাবার সময় কি এখন এসে যায়নি?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১,৪২৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.