ধর্ষণের শিকার যখন বাংলাদেশ

0

রহমতউল্লাহ ইমন:

ধর্ষণ আর মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হলো আরেকটি নাম- রূপা। ইয়াসমিন- পূর্ণিমা- তনু এমন হাজার হাজার নাম মনের কোনে এসে ভিড় জমায়। পাহাড়ে, সমতলে, আদিবাসী পল্লীতে, স্কুল কলেজ মাদ্রাসা, চলন্ত গাড়ি কিছুই বাদ পড়ছে না।

কখনো ধর্মের নামে, কখনো রাজনীতির নামে, এমনকি কখনো ভালোবাসার নামে হামলে পড়ছে পুরুষতন্ত্র। আমরা কিছুদিন হৈ চৈ করছি, সোশ্যাল মিডিয়া বা পত্রিকার পাতায় অশ্রুপাত করছি, মানববন্ধন করছি- তারপর ব্যস্ত হয়ে পড়ছি জাগতিক কাজকর্মে। বিস্মৃত হচ্ছি সব যতদিন না পর্যন্ত আরেকজন নারী শেয়াল শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। তারপর আবার ক’দিন রুটিনমত হৈ হল্লা- তারপর আবার সব ভুলে যাওয়া।

যে জাতি দুই লাখ ধর্ষণের শিকার মা-বোনের কথা বিস্মৃত হয়েছে সে তো এমন কয়েকটি ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনার’ কথা ভুলে যাবেই। যে সমাজে একেবারে পারিবারিক পর্যায় থেকেই নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়, ছেলে শিশু জানে সে একজন মেয়ে শিশুর থেকে বেশি প্রিভিলেজড, ধর্ম যেখানে নারীকে ‘উত্তম ভোগের বস্তু’ ছাড়া আর কিছু ভাবতে শেখায় না, ধর্ষণ যেখানে শৌর্য আর বীরত্বের প্রতীক, যেখানে ধর্ষকের বিচার হয় না, শাস্তি হয় না, সেখানে যে ধর্ষণ বন্ধ হবে না এতে অবাক হবার কী আছে?

আমি তখন বল স্টেট ক্যাম্পাসের বাসায় থাকি। বিকেলে বাইরে ঘুরতে এলে প্রায়ই দেখা হত একটি ছেলের সাথে। ডাক্তারি পড়ে সে। নাম আফানো। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ সামোয়ার ছেলে। কারো সাথে পরিচয় হলে আমি সাধারণত সেই সমাজে নারীর অবস্থান জানার চেষ্টা করে থাকি। আমার কাছে সভ্যতার পরিমাপক এই একটিই। সামোয়াতে বিরাজ করছে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা। তাই স্বভাবতই নারীর স্বাধীনতা সেখানে অনেক বেশি। তারপরেও যে সেখানে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে না এমন নয়, তবে তার সংখ্যা অনেক কম, বিরল বলা চলে। আর ধর্ষকের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা। প্রথমে ধর্ষককে একটি গাছের সাথে বেঁধে গণপিটুনি দেয়া হবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলবে এই পিটুনি। যার যত রাগ ক্ষোভ আছে সব মেটানো হবে এভাবে। তারপর তাকে সমুদ্রের ধারে নিয়ে গিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে হত্যা করা হবে। তারপর সেই মৃতদেহ তীরবর্তী কোনো বড় গাছে ঝুলিয়ে দেয়া হবে। সেই দেহের সমাধি হবে না, সৎকার হবে না। সেখানেই পচে গলে কংকাল হবে, শকুনের খাদ্যে পরিণত হবে। বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে সেই কংকাল গাছের ডালে। স্মরণ করিয়ে দেবে সবাইকে এই হলো ধর্ষকের শাস্তি।

কী? খুব কঠোর, নির্মম আর নিষ্ঠুর মনে হচ্ছে এই শাস্তি, তাই না? আমারও। আমি যে মানবিধাকারের ধারক এবং বাহক। আমি বড় জোর ধর্ষণের তীব্র নিন্দা করতে পারি। আফানোকে কেবল এটুকু বলতে গেলাম যে, শাস্তিটা একটু বেশি নির্মম হয়ে গেল না? মুহূর্তেই চোখে আগুন জ্বলে উঠলো আফানোর। “মোটেই না। আমি খুনিকে মাফ করে দিতে পারি, কিন্তু ধর্ষককে নয়”।

কেন? কারণ একজন মানুষ আত্মরক্ষার্থে অথবা আকস্মিক রাগের মাথায় একজনকে খুন করে ফেলতে পারে। কিন্তু ধর্ষক এটা করে ভেবে চিনতে ঠাণ্ডা মাথায় পরিকল্পনা করে। আত্মরক্ষার্থে কেউ ধর্ষণ করে না। রাগের মাথাতেও কাউকে ধর্ষণ করা যায় না। একজন ধর্ষক এই কর্মটি উপভোগ করে, তাই সে একজন ঠাণ্ডা মাথার খুনির থেকেও বড় অপরাধী। একজন ধর্ষকের অত্যাচার শুধু একটি দেহের ওপরে এটা ভাবলে বড্ড ভুল করা হবে। সে আসলে একটি মেয়ের আত্মাকেই হত্যা করে। এরপর মেয়েটি বেঁচে থাকলেও মরে বেঁচে থাকে। তাই একজন ধর্ষক একজন খুনির চাইতেও বড় খুনি। ভেবে দেখ ড. ইমন, এর চেয়ে নির্মম শাস্তির কথা তোমার মাথায় আসে কি না! আমি সেটাই চালু করে দেবার চেষ্টা করে দেবো সামোয়ায়।

না, বিষয়টা নিয়ে অনেকদিন আর ভাবা হয়নি। আফানোকেও বলা হয়নি কিছু। শুধু ভাবছি ইয়াসমিন- পূর্ণিমা- তনু- রূপা শুধু কয়েকটি নাম তো নয়। অবিরত ধর্ষণের শিকার হচ্ছে এই বাংলাদেশ। জানি, আপনি আমি হয়তো কিছুই করতে পারবো না, কিন্তু এইটুকু কি অন্তত নিশ্চিত করতে পারবো না যে আমার পুত্রকে আমি এমনভাবে বড় করে তুলবো যে, সে কখনো ধর্ষক হবে না? এমন একটা সমাজ গড়ার চেষ্টা করে যাবো যেখানে পুরুষতন্ত্র সবসময় চোখ রাঙ্গাবে না!

আর ধর্ষকদের জন্য কেমন শাস্তির কথা ভাবা যাবে? যে আফ্রিকার মানুষকে আমরা এখনো কথায় কথায় জংলী বলি, সেখানেও কিন্তু ধর্ষকদের খোজা করে দেবার বিধান আছে। তবে সেটাও যথেষ্ট নয়। সামোয়ার শাস্তিও এখন খুব লঘু মনে হচ্ছে আমার কাছে, আপনারা কী বলেন?

রহমতউল্লাহ ইমন, প্রফেসর, গাণিতিক বিজ্ঞান বিভাগ, বল স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়, মানসী, ইন্ডিয়ানা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র

সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৭

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ১,০৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.