শ্রমিকের বঞ্চনা আরও বাড়বে

kolpona daktarউইমেন চ্যাপ্টার: সংশোধিত শ্রম আইন কার স্বার্থ রক্ষা করেছে? তৈরি পোশাকশিল্পের চলমান অস্থিরতা প্রশমনে তা ভূমিকা রাখতে পারবে কি? এসব নিয়ে দৈনিক প্রথম আলোর সাথে কথা বলেছেন বাংলাদেশ সেন্টার ফর ওয়ার্কার্স সলিডারিটির নির্বাহী পরিচালক কল্পনা আক্তার। উইমেন চ্যাপ্টারের জন্য এখানে তার সাক্ষাতকারটি তুলে ধরা হলো।

প্রথম আলো: শ্রম আইনের সংশোধনী পাস হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সত্তর বা আশির দশকের চেয়ে এই আইনে শ্রমিকদের অধিকার আরও কমেছে।
কল্পনা আক্তার: ২০০৬ সালে যখন শ্রম আইন প্রণীত হচ্ছিল, তখনই আমরা দাবি করছিলাম, ব্রিটিশ আমলের বিধিবিধান দিয়ে চলবে না। আমরা শ্রমিকবান্ধব সংশোধনী দাবি করছিলাম। যেহেতু পোশাক খাতেই সবচেয়ে বেশি শ্রমিক কাজ করেন, সেহেতু এই শিল্পের শ্রমিকদের কথা চিন্তা করেই যাতে আইনটা হয়। অথচ যে আইন হয়েছে, তাতে আমরা আরও পিছিয়ে গেলাম। এই আইনে গার্মেন্ট মালিকদের খুশি করা হয়েছে। অতীতের তুলনামূলক অগ্রসর জায়গা থেকে অবনতির জায়গায় কীভাবে এলাম? এর কারণ, পোশাক মালিকদের ক্ষমতা। সংসদে ১০ শতাংশ হলো গার্মেন্ট মালিক। তারাই বাংলাদেশের সবচেয়ে শক্তিশালী গোষ্ঠী। বড় দুই দলেই পোশাকশিল্পের মালিকেরা প্রভাবশালী। তাঁরাই সরকারকে চাপ দিয়ে এমন শ্রমিকবিরোধী আইন করিয়ে নিয়েছেন।

প্রথম আলো: শ্রম আইন কি তাহলে অধিকার দেওয়ার বদলে শ্রমিকদের অবস্থান আরও বেশি দুর্বল করে তুলছে?
কল্পনা আক্তার: ২০০৬ সালে শ্রম আইন প্রণয়নের সময় আমাদের কথা শোনা হয়নি। এবারও শুনল না। ১৯৬৯ সালের আইনের কোথাও ছিল না যে শ্রমিকেরা ইউনিয়নের নিবন্ধনের জন্য আবেদন করলে তার একটা কপি মালিককে দিতে হবে। মালিকেরা শক্তি প্রয়োগ করায় ২০০৬ সালে এসে এই শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। নতুন সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, ‘শ্রমিকেরা এখন থেকে সংগঠন করতে পারবে।’ তার মানে কি ইউনিয়ন করার অধিকার আগে ছিল না? এর মাধ্যমে আসলে ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন সহজীকরণ হয়েছে। কিন্তু একটা বাধা তুলে নেওয়াই কি সহজীকরণ? সমস্যাটা ওখানে না। শ্রমিকেরা সংগঠন করা শুরু করলেই কারখানায় যে নির্যাতন শুরু হয়, আসল সমস্যা সেখানে। এই নির্যাতন তো দৃশ্যমান না। আমি-আপনি গিয়ে প্রমাণ করতে পারব না। যদিও আইনের ১৯৫ ধারায় বলা আছে, ‘শ্রমিকেরা যদি মালিকের দ্বারা বাধাগ্রস্ত হয় বা নির্যাতিত হয়, তাহলে শ্রম আদালতে মামলা করতে পারবে।’ কিন্তু কীভাবে করবে? শ্রম আদালত শামুকের থেকেও ধীরে চলে এবং সারা দেশে তা আছে মাত্র তিনটি—যার দুটিই আবার চরম দুর্নীতিবাজ।

প্রথম আলো: ট্রেড ইউনিয়ন গঠনের প্রক্রিয়াকে কীভাবে কঠিন করা হয়েছে?
কল্পনা আক্তার: আইনে বলা আছে, সব কাগজপত্র জমা দেওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ট্রেড ইউনিয়নের নিবন্ধন দেওয়া হবে। তবে শ্রম মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক যদি সন্তুষ্ট হন তবেই। এই ‘সন্তুষ্ট’ শব্দের ব্যাখ্যা কী? একটা কমা বা দাঁড়িতে তাঁর সন্তুষ্টি চলে যেতে পারে, টাকায় চলে যেতে পারে, মালিকদের বা রাজনৈতিক চাপে চলে যেতে পারে। শ্রমিকেরা কীভাবে তাঁকে সন্তুষ্ট করবেন? যদি বলা হতো, যথাযথ কাগজপত্র দাখিলের ৬০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন পাওয়া যাবে, তাহলে সহজীকরণ হয়েছে বলতে পারতাম। সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, এখন থেকে মালিকেরা বাইরে থেকে ঠিকাদারের মাধ্যমে শ্রমিক নিয়োগ করতে পারবেন। কিন্তু ঠিকাদারের শ্রমিক কারখানার শ্রমিক বলে গণ্য হবে না। তারা শ্রম আইনের আওতায় থাকবে, কিন্তু ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবে না। অদ্ভুত, শ্রমিক যে কারখানায় কাজ করছে, বঞ্চিত হচ্ছে, সেই কারখানায় তারা ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবে না? এখন থেকে মালিকেরা আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ৭০ শতাংশ শ্রমিক নেবেন বাইরে থেকে এবং তাঁরা ট্রেড ইউনিয়ন করতে পারবেন না। এভাবে মালিকদের ট্রেড ইউনিয়নের ঝামেলা থেকে রেহাই দেওয়া হলো। অন্যদিকে রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ট্রেড ইউনিয়নের বাইরে থেকে ১০ শতাংশ সদস্য নেওয়ার সুযোগ থাকলেও পোশাক খাতে সেটা একেবারে বন্ধ করে দিয়েছে। আমরা দাবি করেছিলাম, ট্রেড ইউনিয়নের ন্যূনতম শ্রমিকের সংখ্যা মোট শ্রমিকের ১০ শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। একটা কোম্পানির বিভিন্ন কারখানা যেখানে দূরে দূরে, সেখানে ৩০ শতাংশ শ্রমিককে সদস্য করতে তো জীবন চলে যাবে। অন্যদিকে সদস্য করতে গেলেই হয়রানি-নির্যাতন বাড়তে থাকে। তাই কোথায় সহজীকরণ করা হয়েছে, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

প্রথম আলো: শ্রমিকদের সুযোগ-সুবিধার বেলায় কি কোনো অগ্রগতি আছে?
কল্পনা আক্তার: আগে গ্র্যাচুইটির একটা ব্যাপার ছিল। পাঁচ বছর চাকরির পর চাকরি ছাড়লে ১৪ দিনের টাকা পেত। ১০ বছর কাজ করলে এক মাসের বেতন নিয়ে যেতে পারত। এবারের সংশোধনীতে বলা আছে, ১০ বছর কাজ করলে ৪৫ দিনের টাকা পাবেন। টাকার অঙ্কটা বাড়ানো হলেও আসলে সুযোগ অনেক কমে গেল। শ্রমিকেরা এক কারখানায় এক বছরের বেশি থাকে না। এক জায়গায় থাকলে তো তার বেতন বাড়ে না। তাই তারা বছর বছর চাকরি বদলায়। এ অবস্থায় দরকার ছিল বলা, এক বছর চাকরি করলে এত পাবে, দুই বছর করলে এত পাবে। তা না করে একবারে ১০ বছরের সীমানা দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, এর আগে শ্রমিক স্বেচ্ছায় চাকরি ছাড়লে গ্র্যাচুইটির টাকা পাবে না।
আগে অসদাচরণের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে টার্মিনেশন বেনিফিট পেত, কোনো ক্ষেত্রে লঘু শাস্তির পর চাকরি ফেরত পেত। আগে চুরি ও আত্মসাৎ ছাড়া অন্য যেকোনো অভিযোগে শ্রমিক কারখানা থেকে বেনিফিট নিয়ে বেরিয়ে যেতে পারত। কিন্তু এখন কোনো ধরনের অসদাচরণ করলেই সব বেনিফিট থেকে বঞ্চিত হবে। আগে ১০ দিন একটানা বিনা নোটিশে অনুপস্থিত থাকলে কারণ দর্শাতে বলা হতো, ইত্যাদি। এখন বলা হয়েছে, ১০ দিন আপনাকে দেখবে। তারপর সাত দিন সময় দেবে যথাযথ প্রমাণাদি দেখানোর জন্য। তা না পারলে ধরে নেওয়া হবে ১০ দিন আগেই চাকরি চলে গেছে এবং তিনি বেনিফিট পাবেন না।

প্রথম আলো: তার মানে মালিকের হাতকে আরও শক্তিশালী করা হলো?
কল্পনা আক্তার: আগে এসব অন্যায় অলিখিত ভিত্তিতে চলত, এখন আরও তোড়জোড়ের সঙ্গে করার বৈধতা দেওয়া হলো। আইনে বলা হচ্ছে, দাঙ্গা-হাঙ্গামা-অগ্নিসংযোগের অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হলে আপনি কিছুই পাবেন না। অনেক ক্ষেত্রে বাইরের লোক এসে ভাঙচুর করে অথবা মালিকও শ্রমিকদের ফাঁসাতে এসব করে। এখন আইনের বলে এই অভিযোগে কারখানার সব শ্রমিকের বেনিফিট কেড়ে নিতে পারবে মালিক। একজন ২০ বছর চাকরি করার পর দেখলেন, মালিক তাঁকে দাঙ্গা-হাঙ্গামা বা অসদাচরণ বা ১০ দিন অনুপস্থিতির অভিযোগে সব থেকে বঞ্চিত করছেন। আগে ৩০৭ ধারায় মালিকের বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা করা যেত এবং মালিককে কোর্টে হাজিরা দিতে হতো। কিন্তু হাইকোর্ট থেকে রুল এনে নিম্ন আদালতে দিয়ে রাখায় এখন আর আপনি ফৌজদারি মামলা করতে পারবেন না। তারপরে বলা হয়েছে, দুই বছরের কম সময়ে দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করলে ক্ষতিপূরণ পাবে না। দুই বছরের আগে মারা গেলে আপনি মানুষ না, শ্রমিক না? তারপরে, নয় মাস চাকরি না করলে কারখানার সুবিধাভোগী শ্রমিক বলে গণ্য হবে না। আবার ইপিজেডের শ্রমিকদের এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। সুতরাং এ আইনের বলে কেবল বেতন আর ওভারটাইম ছাড়া শ্রমিককে আর সবকিছু থেকে বঞ্চিত করার পথ খুলে গেল। আইন মালিককে আর ধরতে পারবে না।

(প্রথম আলো থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.