‘বড় ছেলে’ টেলিফিল্ম এবং কেঁচোর মহত্ত্ব

0

ডা. নাজিয়া হক অনি:

নাটক ভালো, বানিয়েছে ভালো, অভিনয় ভালো। গল্পটা বিরক্তিকর। বলতে পারেন এটা আমাদের সমাজের সার্বিক চিত্রের একটি অংশ। ঠিক আছে। কিন্তু এই হেরে যাওয়া অংশটিকে মহৎ প্রমাণ করার এই যে বিশাল প্রচেষ্টা, আমি বলবো, সেটিও বিরক্তিকর।

এই সমাজে পুরুষদের যেমন কলুর বলদ হবার জন্য ছোট থেকে প্রস্তুত করা হয়, বড় হয়ে কামাই করে পরিবারের সবার ঘানি টানার জন্য সরাসরি বা আকার ইঙ্গিতে গুঁতানো হয়, তেমনি নারীদেরকে মেরুদণ্ডবিহীন পরগাছা হয়ে থাকার জন্য প্রস্তুত করা হয়, তা সে যতো শিক্ষিতই হোক। অনেকে এই বিষয়গুলোকে সম্পর্ক শেষ করার হাতিয়ার বা অজুহাত হিসেবে ব্যাবহার করে।

এটার জন্য কি পুরুষতন্ত্র দায়ী? না।

ভুল শুনেননি। আমি পুরুষতন্ত্রের ঘোরবিরোধী নারীবাদী মানবতাবাদী আমি একজন মানুষ। কিন্তু এই ব্যাপারটা জোর দিয়ে বলতে পারি যে এটা পুরুষতন্ত্রের ফলাফল না। এটা কেঁচো ও মানুষের মাঝে পার্থক্য। কিছু মানুষ বাইরে থেকে দেখতে মানুষ হলেও ভিতরে একটি কেঁচো। এর সাথে সমাজ, পুরুষতন্ত্র, নারীতন্ত্র, শিক্ষা, সম্পদ, ধর্ম কোন কিছুর যোগাযোগ নেই। এদেরকে আপনি যেভাবেই বড় করেন না কেন, তারা যে মানুষ, তাদের যে মস্তিষ্ক আছে, মেরুদণ্ড আছে, বিবেকবুদ্ধি আছে তা মনে রাখে না। কেঁচোর মতো কর্মকাণ্ড করে। আর অজুহাত দেয় পারিপার্শ্বিকতার।

সদিচ্ছা বলে একটা ব্যাপার আছে। সততা বলে একটা ব্যাপার আছে আর ধৈর্য। এই তিনটা জিনিস যদি কারো না থাকে সে কাউকে ভালবাসতে পারে না। মনে মনে কাউকে ভাল লাগতে পারে তা কেবলই ভাললাগা, ভালবাসা না। ভাললাগাকে ভালবাসা নাম দিয়ে সম্পর্ক গড়ে সেটাকে শেষ করে ফেলা বেশ সহজ একটা কাজ। আজকাল অনেক হচ্ছে। লেটেস্ট ট্রেন্ড এখন যোগ হলো এই শেষ করে ফেলাকে মহিমান্বিত করে দৃশ্যায়ন করা।

কাউকে ভালবাসলে তার খুশির জন্য, তার সাথে থাকার জন্য তাকে নিজের একটা অংশ ভাবতে হয়। আসলে ভাবতে হয় না, এটা নিজে থেকেই চলে আসে। তার কষ্ট, তার সুখ তখন নিজের মনে হয়। সেখানে তখন যুক্ত হয় সদিচ্ছা, সততা আর ধৈর্য সম্পর্কটিকে সফল করার, একসাথে সুখী হবার। কিন্তু ঐ তিনটি বিষয়ের কোনটি যদি দুই পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে না থাকে সেই ভালবাসার সফল পরিণতি হওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

“বড় ছেলে” নাটকটির গল্পের শেষ দৃশ্যে দুইজনের কান্নাকাটি দেখে আমার আরও বিরক্ত লেগেছে। কোন কিছু না পেয়ে সেটার জন্য হাউমাউ করে কেঁদে ফুলস্টপ দেয়াকে আমার সবচেয়ে মেরুদণ্ডহীন কর্ম বলে মনে হয়। কান্নাকাটি করুন, কষ্ট পেয়েছেন ভালো কথা, এরপর কাঁদা শেষ হলে ঠিক যে কাজগুলো করলে ভালবাসার মানুষটিকে পেতে পারবেন সে পথগুলো চিন্তা করুন এবং সেই মোতাবেক কাজ করুন। একটা পথ না থাকলে আরেকটা আসবে।

আপনার এবং আপনার সঙ্গীর যদি আসলেই আন্তরিক ইচ্ছা থাকে, সততা থাকে এবং ধৈর্য থাকে লেগে থাকার, তবে সফল হবেনই তা যেকোনো পরিবারের যেকোনো মানুষের মাঝে সম্পর্ক থাকুক না কেন। ভেজাল থাকলে অন্য কথা।

এখানে মেয়েটি যদি চাইতো, তবে ছেলেটির পাশে দাঁড়াতে পারতো। দুইজন মিলে একসাথে তাদের দুজনের পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারতো। কত রকম সমাধান করা যেত!! তা না করে ঢ্যাং ঢ্যাং করে বিয়ে করতে বসে গেলেন। আর ছেলেটিও তাকে কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করলেন না, ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে বিদায় নিলেন। দূরে থেকে সবার আড়ালে কেঁদে খুব মহৎ প্রমাণ করলেন তিনি নিজেকে!

ওয়াও!! জোস!!!

এই ধরনের গল্পকে মহান প্রমাণ করার কুফলটা বলি এবার। এমনিতেই মানুষজনের মধ্যে আজকাল আবেগ, নীতি প্রায় নাই নাই অবস্থা, তার মধ্যে এই ধরনের গল্প এতো বেশি মহিমান্বিত করার ফলাফল হবে এক শ্রেণীয় মানুষ কাউকে ভালবাসলে সে সম্পর্ককে সফল করার জন্যে যে চেষ্টা করা দরকার, তা তারা করে না এবং এই ব্যাপারটি এখন এক প্রকার সোনায় সোহাগার মতো কাজ করবে। পরাজয় বরণ করে নিতে তাদের গৌরব এতো হয়, তবে আর জয় হবার চেষ্টা করার কী দরকার?

হেরে যাওয়াই যদি এতোই মহৎ হয়, তাহলে জেতার জন্য এতো চেষ্টা করবে কয়জন?

আমাদের অবস্থা এতোই খারাপ আমরা ভালবাসায় সফল হবার গল্প নিয়ে আনন্দ করি না। কারণ সেটা করতে অনেক কাঠ খড় পুড়াতে হয়, এতো কষ্ট করতে হবে ভাবলে একটু ঝামেলাই মনে হয় সম্পর্ক ব্যাপারটা। এর চেয়ে সম্পর্ক শেষ করার পিছনে অনেক অজুহাত দেখিয়ে, চোখের পানি নাকের পানি ঝরিয়ে, নিজেকে বিরহে কাতর প্রেমিক-প্রেমিকা বানিয়ে সবার সিমপ্যাথি নেয়া অনেক সহজ। কাজেই তাই করি!

এই ধরনের মানুষদের কেঁচো বললেও অসম্মান হয়। ছেলে ও মেয়ে উভয় পক্ষেরই এই পুরুষতন্ত্রকে দোষ দিয়ে, পরিবারের দায়িত্ব নেয়ার অজুহাত দেখিয়ে, বিয়ের বয়স বেড়ে যাচ্ছে, ইত্যাদি ইত্যাদি আরও কয়েকশ প্রকার অজুহাত দেখিয়ে সম্পর্ক শেষ করা কেঁচোর মত পালিয়ে যাওয়ারই শামিল।

আসলে তাকে পাওয়ার কোনো চেষ্টা তখনই করা হয় না, তখনই তাকে চলে যেতে দেয়া হয় যখন সে আমার জন্য এতো মূল্যবান কিছু না। এটা দুই পক্ষ থেকেই হতে পারে। যখন আমি জানি সে চলে গেলে আরেকজন তো আসবেই, একা তো জীবন থেমে থাকে না তখনি তাকে বিদায় করে কয়েকফোটা চোখের পানি আর নাকের পানি ফেলে হাঁটা দেয়া যায়।

যা ভালো লাগে করেন। আপনি কয়বার প্রেম করবেন, আর কাকে পাবার চেষ্টা করবেন, আর কাকে করবেন না অথবা কেন করবেন না তা আমার কোন মাথা ব্যথা না। আপনার জীবন। আপনার ব্যাপার। কিন্তু যারা সত্যি তাদের সঙ্গীকে পাবার জন্য সবকিছুকে সামলিয়ে সফল হয়, তারাই আসল জয়ীা

হ্যাঁ সম্পর্ক শেষ হতে পারে, সেটা সম্পূর্ণ নিজেদের কারণে, এছাড়া পারিপার্শ্বিক কোনো কারণে যদি শেষ হয়, তবে তাদের সম্পর্ক করাই উচিত না।

কেঁচো নরম তুলতুলে এঁকেবেঁকে চলে, কারণ তার মেরুদণ্ড নেই। আপনার আছে। সেটা ব্যবহার করুন। মেরুদণ্ডহীন প্রাণীর মতো কর্মকাণ্ডকে মহান ও মহীয়সী প্রমাণ করে নিজের মনুষ্য জন্মকে কলঙ্কিত করবেন না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 4.9K
  •  
  •  
  • 2
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
    4.9K
    Shares

লেখাটি ২১,২২৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.