আপনার ‘ব্যক্তিগত’ বিষয়গুলোও যখন পুরুষতন্ত্র দ্বারা ম্যানিপুলেটেড!

0

পিংকি মাইতি:

আপনার ‘ব্যক্তিগত’ পছন্দ-অপছন্দগুলো যখন পুরুষতন্ত্রকে প্রমোট করে, পুরুষতান্ত্রিক ধ্যান-ধারণা দ্বারা ম্যানিপুলেটেড হয়, বিষয়টা নিয়ে তখনই দু’-চার কথা না বলে পারি না।

কথা বলতে হয় তখনই, যখন- আপনি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে, আমাদের এগিয়ে চলাকে ডিমোট করেন।
‘ফ্রিডম অব চয়েজ’- এর দোহাই দিয়ে অন্যকে ম্যানিপুলেট করেন, সমষ্টি ম্যানিপুলেটেড হয়-‘নারীবাদ’ আন্দোলনের স্বার্থ কিছুটা হলেও বিঘ্নিত হয়।

‘আমার ভালো লাগে, তাই পরবো! আমার ভালো লাগা কিংবা মন্দলাগায় অন্য কেউই হস্তক্ষেপ করার বিন্দুমাত্র অধিকার রাখে না।’-

অবশ্যই- আপনি কী পরবেন, কী খাবেন, কী মাখবেন,কীভাবেই বা মাখবেন-মাখাবেন, কীভাবে হাঁটবেন, তা আপনার ব্যক্তি স্বাধীনতা।
কিন্তু ধরুন, যখন- আপনার ‘খাওয়া-পরা-শোওয়া’র মতো খুব ছোটোখাটো বিষয়গুলোও আর শুধুমাত্র আপনাতেই আটকে থাকে না?
কথা বলতে হয়- তখনই।

এটা ঠিক যে-‘নারীবাদী’দের ব্যক্তিগত নেতিবাচক আচরণের কারণে ‘নারীবাদ’ কখনোই ভুল প্রমাণিত হয় না আর ‘নারীবাদ’ কোনোভাবেই এর দায় বহন করে না।

কিন্তু যখন আমাদের ‘ব্যক্তিগত’ আচরণ ‘নারীবাদ’ আন্দোলনের মতো বেশ কিছু লিবারাল আন্দোলনের স্বার্থকে আহত করে, তখন কোনোভাবেই তার দায় আমরা এড়িয়েও যেতে পারি না।

বরং প্রশ্ন না ওঠাটাই অস্বাভাবিক- লিবারালিজম্ কিংবা ইন্ডিভিজুয়ালিজমের দোহাই দিয়ে ঠিক কতক্ষণ আমরা
– ‘সিঁথির ওপর একচিলতে সিঁদুর’,’হিজাব প্যাঁচানো’ কিংবা ধরুন-সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোডানো-‘গায়ে হলুদ’, ‘জামাই ষষ্ঠী’,’ভাই ফোঁটা’,’সিঁদুর খেলা’য় সহাস্য অংশগ্রহণের ছবিগুলোকে নিছকই ‘ভালোলাগা’ কিংবা ‘ব্যক্তি স্বাধীনতা’র তকমা পরিয়ে তাবিজ বানিয়ে রাখতে পারি?

আপনি নারীবাদ আন্দোলনের শরিক হবেন অথচ দইয়ের ফোঁটায় ভাইয়ের যমদুয়ারে কাঁটা দেবেন! আর ভাইয়ের কাছ থেকে নীল-সাদা জামদানি, কেয়া শেঠ’স ফেসিয়াল কিট, হালফ্যাশনের রিস্টওয়াচ কিংবা ব্রান্ডেড হেয়ার স্ট্রেইটনার পেয়ে, আপনার যমদুয়োরে কাঁটার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে হাত ধুয়ে ফেলবেন!

এবার আপনি দাঁত খিঁচোতেই পারেন, বলতেই পারেন, হচ্ছিল-পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা-ভাবনা বনাম নারীবাদ এর কথা, এর মাঝখানে আপনার অন্দর মহলের (টাইম লাইনের) পর্দা সরাই কোন্ দুঃখে?
দুঃখের কথা না হয়, তবে খুব সুখে যে আপনার অন্দরমহলে ঢুঁ মারছি না, এটুকু অন্ততঃ বলতেই পারি।
কারণ আপনার- আমার অন্দরমহলের গল্পটা বদলে দেওয়ার নামই কিন্তু ‘নারীবাদ’!
অতএব no ‘পর্দে মে রেহনে দো’,পর্দা জরুর উতারো! আভি ভি উতারো!

আপনি গলায় টুকটুকে লাল গামছা দিয়ে, পাত্রের গায়ে ছোঁয়ানো হলুদ মেখে সেই ছবি ফেইসবুকে আপলোডাবেন আর কেউ ফোঁস করলেই দোষ!
অবশ্য, আপনি চাইলেই আমার মুখের ওপর বিয়ের দিন ‘গায়ে হলুদ’ অনুষ্ঠানের কেন প্রয়োজন, কীইবা এর উপকারিতা, এ বিষয়ে আলোর চেয়েও দ্রুত গতিতে সায়েন্স জার্নাল- একশো কিংবা একহাজারটা রেফারেন্স ছুঁড়ে দিতেই পারেন!
Enough is enough! বলছি,এই বেলা থামেন!

আচ্ছা,বেশ- আপনার সব রেফারেন্স-ই (ভুয়ো কিংবা নির্ভুল) নতমস্তকে হাঁটু গেড়ে মাথা পেতে নিলাম।
কিন্তু ‘ভবিষ্যতের ভাবীগণ’- বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে, আপনারা একবারও ভেবে দেখেছেন কি আপনাদের গায়ে ছোঁয়ানো হলুদ দিয়ে কেন,ছেলেদের গায়ে হলুদ হয় না? ছেলেদের গায়ে মাখা হলুদের কি জার্ম প্রোটেকশন কিংবা ব্লিচিং পাওয়ার বেশি?
ভাবুন,ভাবতে থাকুন!
আর তারপর নাহয়,হাসি-হাসি মুখে সেলফি-গ্রুপফি, যা খুশি আপলোডান!

আর এরপরও যদি বুকে আঙুল ঠুকে বলেন-এটা আপনার ব্যক্তিস্বাধীনতা,তাহলে দুঃখিত-আপনার মস্তিষ্কে গ্রে ম্যাটারের ব্যাপারে আর যেই হোক আমি অন্ততঃ নিঃশংসয় হতে পারছি না!

আপনি বিজয়ার সিঁদুর খেলায় আছেন,জামাই ষষ্ঠীর রসগোল্লায় আছেন,ফুলশয্যায় পানের বাটা আর দুধের গ্লাস হাতেও আছেন!
বলছি-তোতাপাখির মতো ‘নারীবাদ’- এর বুলি না কপচে,’কীভাবে সহজেই পুরুষের মন জয় করা যায়’,’পদিপিসির রকমারি রান্না’র পাতা ওল্টান,কথা দিচ্ছি-‘নারীবাদ’ ঠিক থুড়ি,পুরুষতন্ত্র ঠিক উল্টে যাবে!

আপনি যে নাচতে পারেন, সে তো বেশ বুঝতেই পারছি (কারণ আপনার মগজটাই তো পুরুষতন্ত্র দ্বারা রিইন্সটলড),তা গাইতেও পারেন কি?
তাইলে একখান গান ধরেন-“তুমি পালকি নিয়ে এসো….”
এই রে! ব্লাশ করছেন যে! আপনে বরং ‘ঘোমটা’র আড়াল থেকে শ্লোগান দেন- ‘নারীবাদ’ জিন্দাবাদ!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ১,৬৮৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.