আহা, এমন যদি হতো!

0

সালমা লুনা:

সকালের পত্রিকা পড়ে মাথায় রক্ত উঠে গেল!
কীভাবে সম্ভব! পত্রিকা দলামোচা করে দুহাতের মুঠিতে পুরে প্রচণ্ড আক্রোশে বাঘিনীর মতো গা মোচড়াতে থাকে।
নাহ্! আর না!
আর সহ্য করা যাচ্ছে না, যাবে না। কিছুতেই না।
এবার ঘুরে দাঁড়াতেই হবে!
কেউ আসুক বা না আসুক। কণ্ঠে আওয়াজ তুলুক বা না তুলুক। পত্রিকা মিডিয়া কাভারেজ পাওয়া যাক বা না যাক, একাই প্রতিবাদ করবো। যে আসে আসবে – এই ভেবে ফেসবুকেই সবাইকে টিএসসিতে শুক্রবার সকাল দশটায় আসতে বলে দিলেন তিনি।

মনে একটু খচখচে ভাব জেগে রইলো। শুক্রবারে লোকে দাওয়াত খায়, ঘরের বাজারঘাট করে, কাপড়চোপড় ধোয়া রান্নাবান্না ম্যালা কাজ! এই সময়ে কেউ কি আসবে?
না আসুক!
তিনি একাই যাবেন।
আজ কটা রাত ধরেই তিনি ঘুমাতে পারছেন না। মেয়েটার চেহারা চোখে ভাসছে কেবলি।

না, মেয়েটাকে তিনি দেখেননি। তার পত্রিকাতেও কখনো লেখেটেখে নি। একেবারেই সাদাসিধা মফস্বলী একটা মেয়ে। চেহারায় আধুনিকতা বা চটকের ছাপ নেই কোন- ছবিতে দেখেছেন তিনি।
তবে মেয়েটা শিক্ষিত। মাস্টার্স পাশ, আবার আইন বিষয়েও পড়ালেখা করছিলো। পাশাপাশি একটা ছোটখাট চাকরি। ওই ছোটখাট চাকরিতেই পরিবারটিকে টিকিয়ে রাখার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছিলো সে। বাবা নেই তার। ছোট ভাইবোন আছে। আর আছে মা। সবাইকে নিয়ে সুখে থাকবে বলে ওই চটকহীন
ওই সাদাসিধা মেয়েটি নিজেকে আরো ভালো ও সম্মানজনক চাকরি পেতে ইন্টারভিউ দিয়ে যায়। স্কুলের চাকরির জন্য নিবন্ধন পরীক্ষা দিতে যায়।
এরকম মেয়ে বাংলাদেশে কতজন আছে?!
হিসেবটা জানেন না তিনি। তবে আন্দাজ করেন -অসংখ্য!

তিনি নিজেও যে এইদল থেকেই উঠে এসেছেন!
বোধকরি এইজন্যই মেয়েটির জন্য রাতের ঘুম চলে গেছে তার। হয়তো এইজন্যই মেয়েটিকে তার আপনজন মনে হচ্ছে। মেয়েটির জায়গায় তিনি নিজেকে ভেবে ওই তিনটে পুরুষের সাথে লড়াই করেন খালিহাতে- কল্পনায়। কারো অন্ডকোষে জোড়াপায়ে লাথি কষান নয়তো ডানহাতের তর্জনি আর মধ্যমা দুটো একত্রে ঢুকিয়ে দেন কারো চোখে। চোখ গলে যায়। স্পর্শকাতর জায়গায় লাথি খেয়ে ব্যথায় তড়পায় নরকের কীট। তার শক্ত মজবুত দাঁতের কামড়ে মাংস খুবলে যায় আরেকটি নরকের কীটের শরীরের।
কল্পনার ঘুম চটকে গেলে তার খুব অস্থির লাগতে থাকে।
ফেসবুকের কল্যাণে এবং একটি নারী পত্রিকার সম্পাদক হওয়ায় তিনি সব খবরই পেয়ে যান আগেভাগে।
এই মেয়েটির খবরও জেনেছিলেন। ইদানিংকালের ঘটে যাওয়া অসংখ্য ঘটনাগুলির মতোই মনে হচ্ছিলো এটিও।
কিন্তু এখন ঘটনার বিস্তারিত পড়ে আর সহ্য হচ্ছে না।

একটা একা মেয়েকে বাসে রেখে সবগুলো মানুষ নেমে যেতে পারলো?
একা একটা মেয়েকে পেয়েই বাসের কর্মচারিরা তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারলো?
বাস ড্রাইভার গাড়ি চালাতে চালাতে ধর্ষণের এই ঘটনা প্রত্যক্ষ্য করলো?
অবশেষে ধর্ষণ শেষে লোক তিনটা মেয়েটাকে ঘাড় মটকে দিয়ে মুখ থেঁতলে থেঁতলে সবাই মিলে কি অনায়াসে একটা জীবন্ত মানুষকে মুহুর্তেই লাশ বানিয়ে জঙ্গলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বাড়ি চলে গেলো, তাদের পরিবারের কাছে! ঠিক সাধারণ মানুষেরই মতো।

তাঁর মনে পড়ে যায় বেশ কিছুদিন আগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মেয়েকে এমনই ধর্ষণ শেষে থেঁতলে আধমরা করে জঙ্গলে ফেলে গিয়েছিলো। জীবন্ত মেয়েটিকে পোকা আর পিপঁড়ায় খেয়েছে। শরীরে পচন লেগেছিলো।
কী বিভৎস !!
সে অবশ্য হসপিটাল পর্যন্ত গিয়েছিলো। কিন্তু বাঁচেনি।
তারও আগে ওই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ছাত্রনেতা একশ মেয়েকে ধর্ষণ করে তা সেঞ্চুরি পার্টি দিয়ে সেলিব্রেট করেছিলো।
আরেকটি মেয়ে, খুব বেশিদিন আগে না, এই সেদিন, কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই ধর্ষিত হয়ে নৃশংসভাবে খুন হয়ে ক্ষতবিক্ষত পড়েছিলো। কত কাহিনী হলো তাই নিয়ে। কেউ ধরা পড়লো না। শেষে সাব্যস্ত হলো ভালুক এসে করে গেছে এই কাজ!!
আরো কত কত অসংখ্য নাম যে আছে এই তালিকায় তার ইয়ত্তা নাই।
এখানে অবশ্য ধর্ষকরা ধরা পড়েছে, স্বীকার করেছে অপরাধীরা সব। এখন বিচারের অপেক্ষা। তা হোক। বিচার কী হবে, হোক।

কিন্তু এ থেকে বাঁচার উপায় কী? সেজন্য তো কিছু করা দরকার। একটা চাপ, একটা দাবি তোলা দরকার। যেন ধর্ষকরা, হবু ধর্ষকরা এবং মনের গহীনে ধর্ষনেচ্ছা লালনকারীরা ভয় পায়। তারা একাকি নারী দেখামাত্রই কামেচ্ছা নিবৃত্ত করতে না পেরে ঝাঁপিয়ে না পড়ে।
এটি করতে হলে একটি শক্তপোক্ত আইন দরকার। এমন আইন যাতে বিশেষ ট্রাইবুনাল করে এইসব ধর্ষকদের বিচার হয়। এসব নিয়ে লেখালেখিও হচ্ছে প্রচুর।
এইসব চিন্তাভাবনা করেই
তিনি ফেসবুকে ডাক দিলেন কে আসবে/আসতে চাও, আসো। আমি ধর্ষকদের জন্য কঠিন শাস্তির একটি আইনের দাবি নিয়ে দাঁড়াচ্ছি, যদি মনে হয় দাবিটি সঠিক, এসে আমার পাশেই দাঁড়িয়ে যেও। আমি থাকবো।

2)
সারারাত ঘুম হয়নি। আজই শুক্রবার। রাতে দুটো ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়েছিলেন তিনি। এপর্যন্তই!
ঘুম তো দূর দুচোখের পাতাও এক হয়নি। ভীষণ টেনশন হচ্ছে তাঁর। রাত পোহালেই শুক্রবার। দেখতে দেখতেই সকাল দশটা বেজে যাবে।
কেউ যদি না আসে!
পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত হয় তাঁর। না আসুক! তিনি যাবেনই। সাথে যাবে দুই ছেলেমেয়ে। তাদের বন্ধুরা। তাঁর নিজের সতীর্থরাও কেউ কেউ আসবেন। পত্রিকার লেখকরা যদি আসেন! ফেইসবুকের পাঁচ হাজার বন্ধুর অন্তত এক হাজার। টিএসসিতে দাঁড়ালে ইউনিভার্সিটির অন্তত শ’খানেক ছেলেপুলে! পাশেই রোকেয়া হল, মেয়েরা তো আসবেই।
আর পথচারীরা?
তাদের মধ্য থেকেও কি জনা পঞ্চাশেক দাঁড়িয়ে যাবে না সংহতি জানাতে?

আনন্দে তার বুক ঢিপঢিপ করে। মনে মনে বলেন রূপা ,রূপারে! তুই একা না। আমি আছি, আমরা সকলেই আছি তোর পাশে রে হতভাগী বোনটা আমার!
আর জন্মে তুই আমার মেয়ে হবি। তোকে আমি শেখাবো কী করে পশু শিকার করতে হয়! কী করে নিজেকে দুর্দান্ত করে আগলে রাখতে হয়!
তবে বিশ্বাস কর বোন, এটাই শেষ। তোর ঘটনাটাই হবে শেষ ঘটনা। আর কখনো যদি ঘটেও তবে কঠিন বিচার হবে এই দেশে। কঠিন শাস্তি! তুই ওপার থেকে দেখিস।

3)
বঙ্গভবনে ভীষণ অস্থিরতা!
বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে আছে প্রধানমন্ত্রীর। একটার পর একটা খবর আসছে। গোয়েন্দা, স্পেশাল ফোর্স, পুলিশ, দলের ছেলেরা – ফোন ফোন আর ফোন !
এরা আগে জানতো না এমনটা ঘটবে?!
প্রধানমন্ত্রীর নিজের উপরেও বিরক্ত। গত কদিন ধরেই আন্তর্জাতিক কিছু বিষয় নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন। চীন মায়ানমার। রোহিঙ্গা- শরণার্থী। মায়ানমার ভারত। কে কার সাথে দেখা করছে, কি হচ্ছে না হচ্ছে – এত জট পাকিয়ে গেছে সব!
এদিকে মনোযোগ দিতেই পারেননি।

আজ শুক্রবার, একটা ছুটির দিন। একটু আরাম করে সবকিছু ভাববেন, তা না, কোথাকার কোন টিএসসিতে কোন নারীরা নাকি কীসব গোলমাল পাকিয়েছে!
একজন ফেসবুকে এক ডাক দিয়েছে তাতেই নাকি এই শহরের অর্ধেক মানুষ গিয়ে ভেঙে পড়েছে ওইখানে।

কী? না! তারা দ্রুত বিচার আইনে ধর্ষকদের বিচার চায়। এবং প্রমাণিত হলে সাজা চায় ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড। সকালে শুরু হয়ে ওই মুভমেন্ট এখন এই বিকেলে নাকি জনতার সমুদ্রে পরিণত হয়েছে।
ব্যাপারটা অবশ্য তিনিও ভেবেছেন। ভেবে দেখেছেন, এটাই সঠিক হবে। এভাবেই মৃত্যু হওয়া উচিত ওই হারামজাদাগুলোর। কিন্তু ভাবনা চিন্তার একটু সময় নিতে গিয়ে অনেকটাই দেরি হয়ে গেলো। এইফাঁকে এখন এই মহাভারত শুরু হয়েছে।
মহাভারত সামলাতে এখন কী কী করতে হবে কে জানে!

প্রধানমন্ত্রীর কপালে ভাঁজ দেখে আইনমন্ত্রী ফোকলা দাঁতে তেলতেলে হাসি দিয়ে বললেন, আপনি ভাববেন না। আমি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা বলেছি উনি সামলে নেবেন বলেছেন।
বিরক্তি চেপে ঠোঁট বাঁকিয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন, সামলে নেবেন তো বটেই। আমি ছাড়া কোন কাজটা আপনারা একা একাই সামলাতে পারেন জানিয়েন তো !

প্রেস সচিব দৌড়ে এলো। মুখে ঘামতেল লেপ্টে আছে। হন্তদন্ত হয়েই বলতে শুরু করলো, এতোটা আমিও ভাবি নাই! বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে সব মেয়েরা নেমে এসেছে। রাস্তায় যত মানুষ ছিলো সবাই দাঁড়িয়ে গেছে। মানুষজন ঘরবাড়ি ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে এসেছে। মনে হচ্ছে যেন আরেকটা শাহবাগ।
প্রধানমন্ত্রী বললেন, দম নাও। এতো অস্থির হবার কিছু নাই। কী বলছে তারা গুছিয়ে বলো। তারা কী চায়?

তাঁর মাথায় চিন্তার ঝড়, ভুল কিছুটা আমারই হয়েছে। আমার এদিকে নজর দেয়া উচিত ছিলো আগেই। এতোবড় একটা বিষয় – বাচ্চা বাচ্চা মেয়েগুলিকে রেপ করে করে মেরে ফেলছে। মেয়েরা রেপের ভয়ে দিন কাটাচ্ছে। অথচ তিনি এখনো কোন ব্যবস্থাই নেননি। তারা তো কত লেখালেখিই করলো ,তিনি আমলই দিলেন না!
যা হোক এসব তো এদের বলা যাবে না! মন্ত্রীগুলোও একেকজন! কাউকে দিয়ে যদি কিচ্ছু হতো!

প্রেস সচিব ছেলেটা হড়বড়িয়ে বলে যাচ্ছে, তারা এখন এক দাবিই করছে, ধর্ষক যতগুলো আছে সকলকেই নাকি ক্রেনে ঝুলিয়ে ব্রাশ ফায়ার করতে হবে। অথবা প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে হবে!
এখন কী হবে?
প্রধানমন্ত্রী আড়চোখে বসে থাকা আইনমন্ত্রী আর দুচারটে খুচরো মন্ত্রীদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যা আমাদের করার কথা তা যদি এভাবেই অন্যদের সিদ্ধান্তে হয়ে যায়, তবে আমার জন্যই সুবিধা।
আমি রাজি!
হোক, তবে তাই হোক!

4)
টিএসসির সামনে তখন সমুদ্রর গর্জন।
সেই গর্জনে কান পাতলে শুধু শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ! বাংলাদেশ!!
আর জয় বাংলা ! জয় বাংলা!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 454
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    458
    Shares

লেখাটি ১,৬৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.