ধর্ষণরোধে যৌনপল্লি: শাস্তির বদলে পুরস্কার!

0

প্রান্ত পলাশ:

‘ত্রিলোকমধ্যে কোনো স্ত্রীরই স্বাধীনতা নাই। কুমারাবস্থায় পিতা, যৌবনাবস্থায় ভর্ত্তা ও বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রেরা স্ত্রীজাতির রক্ষণাবেক্ষণ করিয়া থাকে, সুতরাং স্ত্রীজাতির কখনওই স্বাধীনতা থাকিবার সম্ভাবনা নাই।’

অবাক হতে হয়, বহু বহু বছর আগে ‘পুরুষাধিপতি’ রচিত মনুসংহিতায় নারীর স্বাধীনতা প্রসঙ্গে নারীকে যেভাবে অপমান করা হয়েছিল, মানবসভ্যতার বিকাশের পরও একই ধ্যান-ধারণায় আচ্ছন্ন আজকের পুরুষজাতি। নারীকে গৃহী সাজিয়ে, কর্মহীন ক’রে, নিরর্থ রেখে ‘রক্ষণাবেক্ষণের’ নামে তাঁর স্বাধীনতা কেড়ে নেয়াই ছিল তৎকালের পুরুষকুলের বীর্যত্ব। আবার সেই পুরুষই নিজের বহুগমনের লালসা মেটাতে নারীকে করেছে ‘গণিকা’। তাঁর রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ পুরুষ ভোগে বৈচিত্র্য আনতে গণিকাকে দিয়েছে শিল্পপাঠ। তাই যিনি গণিকা, তিনি রূপে শ্রেষ্ঠা, নৃত্যগীতে শ্রেষ্ঠা, অঙ্গভঙ্গি ও দৃষ্টিতে শ্রেষ্ঠা। আর তাঁর এই কলাবতী হয়ে ওঠার পেছনে মূল কারণ ভোগ। শুধু দেহদান করলেই চলবে না, এর আগে তার কলাদর্শনও চায়! ক্ষমতা যখন পুরুষের হাতে, তখন নারীকে মালসাভোগ বানিয়ে যথেচ্ছা উদরপূর্তির সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে তাঁরা। নারীর প্রতি পুরুষের এই ক্ষীণদৃষ্টি আজও। আর সেই কলাবতী ‘গণিকা’ এখন শুধুই ‘বেশ্যা’।

প্রাণীর মূল প্রবৃত্তি— ক্ষুধা ও যৌনতা। আমরা যে আদি মানুষের কথা বলি, তার ইতিহাস লাখো বছরের হলেও, লিখিত ইতিহাস বেশিদিনের নয়। বৈদিক যুগকে প্রাচীনকাল বলা হলেও তা মাত্র প্রায় ছয় হাজার বছরের পুরোনো। এর আগে লাখো বছর মানুষের অস্তিত্ব ছিল। স্বাভাবিকভাবেই তাদের ক্ষুধা ও যৌনতা ছিল। কিন্তু বেশ্যাবৃত্তির ধারণা বহু পরের, সমাজ বিবর্তনের পর। মানুষের ইতিহাসের কাছে তা এই সেদিনের! আর তাই বেশ্যাবৃত্তি আদিম বা প্রাচীন নয়, হয়তো পুরোনো।

কিন্তু বেশ্যাবৃত্তি কেন এলো? বেদ-পুরাণ-পুঁথিপাঠে যতদূর জানা যায়, বৈদিক যুগে নানা কুসংস্কার ও অন্ধত্ব ছিল। নারীর ওপর জঘন্য নির্যাতন ছিল। নারীকে যথেচ্ছা ভোগের পর তাঁকেই আবার সমাজছকের ভেতর ছুঁড়ে ফেলা হতো। আরও ভোগের স্বপ্নচারী পুরুষ নারীকে বিনিময়যোগ্য করে তুললো। যেহেতু পুরুষ নারীকে অর্থভূমিকায় দেখতে চাইতো না, তাঁকে সামাজিক, ধর্মীয় কুসংস্কারে বন্দি করে একমাত্র দেহজীবী করে তুললো। যদিও পরে বিবাহ-সন্তানাদির অধিকার পেল তাঁরা, তবু সমাজপতিরা তাঁদের ‘বিনিময়ে দেহদান’ চালিয়ে যাওয়ার নিয়ম করলো। নারীমুক্তি হলো সুদূরপরাহত!

নগর পত্তনের পর ‘বিনিময়ে দেহদান’ আরও বাড়লো। আগেই বলেছি, নারীকে যে কলাচর্চার শিক্ষা দিয়েছিল পুরুষ, তা একান্তই ভোগের স্বার্থে। নারীকে নৃত্যগীতরত রেখে তাঁর চোখ ও ঘামের জলের গন্ধে উদগ্র কামনা চরিতার্থ করাই ছিল পুরুষের অহম। ক্ষমতাবান পুরুষের হাত ধরে এ কামলীলা পৌঁছে গেল অপেক্ষাকৃত ক্ষমতাহীনের হাতেও। তৈরি হল নানা শ্রেণির দেহপসারিণী। শুধু তাই-ই নয়, নারীর প্রতি নির্যাতনের মাত্রা এত বেড়ে গেল যে, ভোগের জন্য বিক্রি করা হতো। ধর্মীয় কুসংস্কার ছড়িয়ে পিতাকেও বাধ্য করা হলো কন্যাকে যেন মন্দিরে উৎসর্গ করা হয়। ওই নারীকে ভোগ করতো পুরোহিত। আর পিতা যেন পেল ঈশ্বরসান্নিধ্য। বৈদিক যুগেও এ বর্বরতা ছিল। আরও পরে সামন্ত যুগে রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়বাড়ন্ত হলো বেশ্যাবৃত্তির। পুরুষ হলো বেশ্যার দালাল। অপরূপ নারী ধরে বেঁধে এনে ক্ষমতাবানদের কাছে বেচে দিয়ে এ দালালরা পেল আনুকুল্য, বিত্ত।

তুলনামূলক আধুনিক যুগেও দেখা যায়, বণিকদের সুবিধার্থে সমুদ্র বা নদীতীরবর্তী এলাকায় পুরুষ তৈরি করেছে নারীপল্লি— সেখানে মুদ্রাবিনিময়ে পুরুষ যথেচ্ছা ভোগ করতে লাগল নারীকে। নারী নির্যাতনের মাত্রা চরমে পৌঁছাল। এই উপায়হীন নারীর কেউ কেউ স্বচ্ছল হলেও বেশিরভাগের ক্ষুধানিবৃত্তির উপায় হলো দেহদান। পুরুষ এদের ছড়িয়ে দিল সমাজের রন্ধ্রে আর পুরুষই এদের নামে রটালো কুৎসা।

তথাকথিত সভ্যতায় পুরুষের ইতিহাস বর্বরতার, আর নারীর ইতিহাস নির্যাতনের! প্রসঙ্গক্রমে একদিন নির্বাসিত লেখক তসলিমা নাসরিনকে বলেছিলাম বেশ্যাবৃত্তিকে প্রাচীন পেশা বলে তা জিইয়ে রাখার পুরুষতান্ত্রিক হীনমন্যতার কথা। তিনি আমায় বলেছিলেন, ‘কেউ যদি তোমাকে প্রাচীন পেশা বলে, তুমি বলে দিয়ো— প্রাচীন পেশা না, প্রাচীন অপ্রেশন (Oppression)’।

আমরা লেখাপড়া শিখছি, জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নতিসাধন হলেও পুরুষের মগজের কোষে-কোষে আজও সেই পুরুষতন্ত্র। এ সময়ে এসেও যখন কেউ ধর্ষণরোধে যৌনপল্লির কথা বলে, তখন থমকে যেতে হয়। দেশজুড়ে ধর্ষণের মহামারী যখন, তখন ধর্ষককে পুরস্কারস্বরূপ যৌনপল্লি দেওয়ার ধৃষ্ঠতা অনেকের। যেন, ‘যাও বাবা, তোমার খায়েশ মিটিয়ে এসো’! যেন যৌনতার ভার পুরুষ একাই বহন করে, সেই ভার নিয়ন্ত্রণে অক্ষম পুরুষ যেকোনো উপায়ে নারীগমন করবেই। তাঁর নিয়ন্ত্রণহীনতার বোঝা বইতে হবে নারীকে। নারীকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে পুরুষের লালসা মেটাও। টাকা তো দিচ্ছেই! কী জঘন্য এ পুরুষমগজ! কারও প্রতি ন্যূনতম প্রেমবোধ না থাকা সত্ত্বেও যে নিয়ন্ত্রণহীন কামার্ত সেই তো ধর্ষণপ্রবণ। যৌনপল্লিতে যারা পতিত, তাই তারাও ধর্ষক। আর যারা ধর্ষণরোধে যৌনপল্লির কথা বলে, তারাও ধর্ষণপ্রবণ।

দক্ষিণ এশিয়ার যৌনপল্লিগুলো নারী নির্যাতনের আখড়া। যৌনপল্লিগুলোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে নারী পাচারকারীদের রমরমা ব্যবসা। মাদক ও অস্ত্র ব্যবসায়ীদের আশ্রয়স্থল সেখানে। নারীর অসহায়ত্ব পুঁজি ক’রে এই অসুস্থ, স্যাঁতস্যাঁতে কারাগার পুষছে রাষ্ট্র। ভাসমান যৌনকর্মীরাও নিগৃহীত হচ্ছে খদ্দের দ্বারা, সন্ত্রাসীদের দ্বারা, পুলিশ দ্বারা।

মাগুরা শহরে একটি যৌনপল্লি ছিল। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সেটি তুলে দেয়া হয়। পরে সেখানে স্থাপন করা হয় মসজিদ। সে সময় আমি মাগুরায় ছিলাম। শুনেছিলাম ঘরহারা এসব নারী মিছিল করেছিল। আদালতের সামনে গিয়েও বিক্ষোভ করেছিল। কিন্তু কেন এ বিক্ষোভ? যৌনকর্মি হয়ে তাঁরা বাঁচতে চেয়েছিল? না। এতোসংখ্যক নারীর কোনোরকম অন্ন-বাসস্থানের ব্যবস্থা না করেই সরকার তাদের ছোট ছোট ঘরগুলো ভেঙেছিল। তাঁদের দাবি ছিল, চাকরির ব্যবস্থা করা হোক। ওই নির্যাতিতের জীবন থেকে তাঁরা মুক্তি চায়। কিন্তু যতদিন না সরকার তা করছে, ততদিন তাঁদের যৌনকর্ম ছাড়া উপায় তো নেই! যেহেতু তাঁদের পরিবারও গ্রহণ করতে চায় না, শহরে বা গ্রামে বাসা ভাড়া দিতে চায় না কেউ, তাঁরা কোথায় যাবে? ওই নারীরা পরে হয়ে গেছে ভাসমান। হয়তো দীর্ঘদিন তাঁদের মানবেতর জীবন কাটাতে হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় প্রত্যেক যৌনকর্মির জীবন কী দুর্বিষহ নির্যাতনের! কেউ প্রেমিক দ্বারা প্রতারিত, কেউ স্বামী দ্বারা, কাউকে তাঁর আত্মীয় চাকরি দেবে বলে এনে বেচে দিয়েছে দালালের কাছে, কেউ ধর্ষণের শিকার। পরিবারের কাছে যেতে চাইলেও তাঁরা যেতে পারেননি। একসময় কান্না মুছে মেনে নিয়েছেন জঘন্য জীবন। মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি, ক্ষুধানিবৃত্তির উপায় হিশেবে এ অন্ধকার পথ আমাদের জানিয়ে দেয়, আমরা সভ্য হতে পারিনি। বৈশ্য হয়ে আমরাই আবার গালি বানিয়েছি বেশ্যা শব্দকে!

অনেক আগে এক বড় ভাই তাঁর জীবনের গল্প শুনিয়েছিলেন। যশোরে একটি বড় যৌনপল্লি আছে। সেখানে এক মেয়ের সাথে তাঁর পরিচয় হয়। কীভাবে যেন ওই মেয়েটির সাথে তাঁর সম্পর্ক গাঢ় হয়। মেয়েটি তাঁকে বলেছিলেন, তাঁর কষ্টপূর্ণ জীবনের কথা। মেয়েটি একজনকে ভালবাসতো। পরিবার মেনে না নেওয়ায় একদিন মেয়েটি কাপড়চোপড় ও সোনাদানা নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। তারপর ছেলেটির সাথে ওঠে এক বাসায়। সাবলেট। ছেলেটি বেকার। মেয়েটির সোনাদানা বেচে কয়েক মাস ওই ঘরে কাটায় তাঁরা। একদিন চলে যায় ছেলেটি। আর যার ঘরে সাবলেট থাকতেন তিনি, ওই নারীই ছিলেন দালাল। মেয়েটি বাড়িতে ফিরে যেতে চাইলেও তাঁর পরিবার তাঁকে গ্রহণ করেনি। উপায়হীন হয়ে ওই ঘরটিতেই ফিরে যান তিনি। একদিন তাঁর রুমে একজনকে ঢুকিয়ে দেয় ওই মহিলা। মেয়েটিকে রেপ করা হয়। পরে একসময় ওই মহিলার প্ররোচনাতেই এ বৃত্তিতে নামেন তিনি। খুব সংক্ষিপ্ত করেই বললাম। ওই বড় ভাইয়ের মুখে মেয়েটির আরও গল্প শুনেছিলাম। কীভাবে যেন ওই বড় ভাইয়ের সাথেও সখ্য হয় মেয়েটির। মেয়েটি ওই অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। বড় ভাইটির সাথে সংসারও করতে চায়। কিন্তু পারিবারিক-সামাজিক অপমানের শিকার হতে হবে, এই ভয়ে তিনি পারেননি। যা হোক, উনি বলেছিলেন একদিন, মেয়েটির জন্য তাঁর নাকি আজও কষ্ট হয়। তিনি ভুল করেছিলেন, এ কথাও আমাকে বলেছিলেন।

বাংলাদেশের যৌনপল্লিগুলোতে বা ভাসমান যৌনকর্মিদের জীবন অনেক কষ্টের। কেউ সাধ করে এ পথে পা বাড়াননি। তাঁদেরকে বাধ্য করেছে এ পুরুষশাসিত সমাজ। আর এ পুরুষশাসিত সমাজের কর্ণধারেরা যেকোনো অজুহাতে পল্লিগুলো টিকিয়ে রাখতে চান। দেশজুড়ে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আতঙ্কে। আর এই আতঙ্কের মাঝেই কেউ কেউ সুযোগ নিয়ে বলেন, ধর্ষণরোধে যৌনপল্লি বাড়ানোর কথা বা ভাসমান যৌনকর্মীদের জন্য নির্দিষ্ট স্থানের কথা। নিজের সন্তান বা স্বজনকে ধর্ষকের হাত থেকে বাঁচাতে তাঁরা অপরের সন্তানকে ঠেলে দিতে চান ওই অন্ধকার পথে। এই নির্লজ্জতার শেষ কোথায়, জানা নেই। যেখানে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির জন্য জোরালো ভূমিকা রাখা দরকার, সেখানে যৌনপল্লির কথা বলে সেইসব ধর্ষকদের পুরস্কার হিশেবে কারও সন্তানকেই তুলে দিতে চান এরা!

ধর্ষণরোধে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন জরুরি। বিচারকাজে দীর্ঘসূত্রিতা ও অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়ায় ধর্ষণ বাড়ছে। প্রত্যেক পরিবার যেন তাদের সন্তানকে নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের শিক্ষা দেয়। সরকারের করণীয় হোক প্রত্যেক যৌনকর্মিকে এ পথ থেকে ফেরানোর ব্যবস্থা করা। তাঁদের পুনর্বাসন করা। বাংলাদেশে শিল্পকারখানা বাড়ছে। বেশ কয়েকটি অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। যৌনকর্মিদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ কর্মী হিশেবে গড়ে তোলা হলে তাঁরা স্বাভাবিক জীবন পাবেন। তাঁরা আমাদেরই সন্তান। তাঁদের রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সর্বোপরি আমাদের।

লেখক : কবি ও সাংবাদিক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৫,৮৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.