নারীর চরিত্রে কালিমা লেপন, কুৎসিত নারী বিদ্বেষী আচরণ

ডাঃ শিরীন সাবিহা তন্বী:

ঘটনা এক:
রুনার বিয়ের বয়স সাত মাস। বিয়ের আগে থেকেই ওর স্বামী রফিকের সাথে অবৈধ সম্পর্ক আছে তার ভাবীর। রফিকের বড় ভাই সৌদি থাকেন। বিয়ের পরের মাসেই টের পায় রুনা। রফিককে অনেক বুঝিয়েছে। অস্থির হয়েছে। কেঁদেছে।কেটেছে। আত্মহত্যার অপচেষ্টা করেছে। পরে মনে হলো, আমার কী দোষ?
আমি কেন মরবো? মরতে হলে ওরা মরবে। ওরা পাপী।
প্রতিবাদী হলো সে!
আর যায় কই? দেবর-ভাবী মিলে এক গীত গাইতে শুরু করলো। সবার কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুললো,পরকীয়া করে রুনা। চরিত্র ভালো না। একাধিক ছেলের সাথে রিলেশন। তাই স্বামীর সাথে ঝগড়া করে। সব শুনে স্তব্ধ রুনা।

ঘটনা দুই:
অনা খুবই পরিশ্রমী ব্যাংক কর্মকর্তা। সকলের সুনজরে। ফাঁকিবাজ বীণা সবার অপছন্দের লিস্টে। তাই বীণার দু চোখের বিষ অনা। এর মাঝে অনাকে কু-প্রস্তাব দেয় ওর এক কলিগ কর্মকর্তা। প্রতিবাদী হয় সে। কর্মকর্তার নামে কমপ্লেইন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে (ব্রাঞ্চ ম্যনেজার)।
জানাবার পরে এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই স্তব্ধ সে!
ম্যানেজারের ওয়াইফ ভরা অফিসে সকলের মাঝে চড় বসালো অনার গালে। বীণা আর ঐ কর্মকর্তা ম্যানেজারের বউকে প্রমাণসহ জানিয়ে এসেছে এক চরম মিথ্যা – ম্যানেজারের সাথে অনার পরকীয়া।

ঘটনা তিন:
চার বছরের মেয়েসহ অসহায় উপমা। চাচার বাসার চিলেকোঠায় থেকে একটা স্কুলে জব করে। স্বামী আসিফ ঢাকাতে ভালো বেতনের জব করে। সে মা-মেয়ের কোন দায়িত্ব পালন করে না। নিজে ধূমপান, মদ্যপান,পরনারী নিয়ে ব্যস্ত।মেয়েকে স্কুলে দিতে হবে। আর তো পারছে না উপমা। প্রতিবাদী হলো সে। আসিফকে প্রেশার দিল। তাতেও কোনো আর্থিক সহায়তা না পেয়ে আসিফের অফিসে নালিশ করলো উপমা।
এবার তার কারিশমা দেখালো আসিফ। ভূয়া ফোন/মেসেঞ্জার লিস্ট তৈরি করে বাড়িওয়ালা চাচাকে জড়িয়ে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে উপমার স্কুলে জমা দিল। নিজের ছাত্র-ছাত্রীর সামনে চরম অপদস্থ এবং আশ্রয়হীন হলো উপমা।

ঘটনা চার:
ডাঃ শম্পা। একটি উপজেলা হেল্থ কমপ্লেক্স এ কাজ করার সময় তার অনুপস্থিতিতে ঘটে যাওয়া এক রুগীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকার সন্ত্রাসীরা নির্মমভাবে আহত করে তাকে। শম্পা প্রচণ্ড মানসিক শক্তি নিয়ে সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মামলা করে। রাজনৈতিক দল থেকে বহিষ্কৃত হয় ঐ সন্ত্রাসীরা।
দুই সপ্তাহ যেতে না যেতেই নিরাপত্তার তাগিদে আশ্রয় নেয়া এক কর্মচারির বাড়িতে ঐ সন্ত্রাসীরা, পুলিশের ওসি আর লোকাল সাংবাদিকদের সাথে নিয়ে পৌঁছায়। এবং জোরপূর্বক ঐ কর্মচারির সাথে ডাঃ শম্পার ছবি তুলে লোকাল পেপারে রসালো নিউজ করে বদনাম করার অপচেষ্টা হলো ডাঃ শম্পাকে!

একজন নারী হয়ে খুব জানতে ইচ্ছে করে, এই পোকায় খাওয়া, কুষ্ঠের ক্ষত সমেত সমাজটাতে নারীকে অপমান, অপদস্থ করার এই যে যুগ যুগ ধরে চলে আসা কুপ্রথাগুলো কখনো কি বিলীন হবে?
কখনও কি নারীকে মানুষ হিসেবে বাঁচতে দেবে এই সমাজ, যে মানুষের সব মানবীয় গুণ আছে – ব্যথা পেলে কাঁদে, আনন্দে হাসে, খুশিতে জড়িয়ে ধরে, অত্যাচার অবিচারে প্রতিবাদ করে?
না কি নারীগণ চিরদিনই থেকে যাবে চাবি দেয়া পুতুল, যারা কেবল তোমাদের অহংকারী, অনৈতিক ইচ্ছের দিকেই মাথা নাড়ে?

আসলে বহুদিনের পুরনো নিয়মনীতিতে চলা পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী কেবল একটা যন্ত্র বিশেষ। এই যন্ত্র পুরুষের কাম ক্ষুধা নিবারণ করবে এবং শরীরে সন্তান ধারণ করে বংশ বিস্তার করবে।

মানবতা আছে এমন পুরুষেরা নারীদের প্রাপ্য সম্মান দেয়। কিন্তু হিংস্র মানসিকতার পুরুষেরা নারীর বেঁচে থাকা, কথা বলা,পুরুষের অন্যায়ে প্রতিবাদ করাটাকে গর্হিত অপরাধ মনে করে। আর এই অপরাধের একটাই শাস্তি। প্রতিবাদী নারীকে চরিত্রহীন বলে প্রমাণ করা।

পৃথিবীতে যাই ঘটুক, আমাদের নোংরা সমাজের হীন দৃষ্টি নারীকেই দোষ দেয়।
তাই দোষী, চরিত্রহীন, দায়িত্বহীন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের নারী বা পুরুষ অপেক্ষাকৃত সবল, স্বনির্ভর এবং আত্মসম্মান সম্পন্ন নারীকে চরিত্রহীন আখ্যা দিয়ে নারীর সম্মানিত জীবনযাপন, অন্যায়ের সাথে আপোসহীন জীবনযাপনকে অসম্ভব করে তোলে।

তাই আজকের দিনে নারী – পুরুষ নয়, মানুষের সমাজ গড়তে হলে নারীকে অসম্মান করার এই সস্তা রাস্তা, নারীর চরিত্রে কালিমা লেপনের বিরুদ্ধে আমাদের সকলকে একজোট হতে হবে!

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.