ধর্ষণ প্রতিরোধে চাই প্রতিবাদ, চাই সেল্ফ ডিফেন্স, চাই সচেতনতা

0

সোনালী সেন:

আজ বিকালে আমার একটা ছবি ফেসবুকে আপলোড করেছি। চারদিকে ঝড়ের ঘনঘটায় আত্মবিশ্বাসী এক নারীর ছবি। ভাবছিলাম ঠিক কী বোঝাতে চাইছিলাম এই ছবি দিয়ে! আমার দেশের প্রতিটি মেয়ে কি এরকম আত্মবিশ্বাসী? নাকি তারা প্রস্তুত অন্ধকারে বেরিয়ে আসা হায়েনাগুলোকে মোকাবিলা করতে! আসলে আমি নিজের কাছ থেকে নিজে পালাতে চাইছিলাম, অবচেতনে খুঁজে চলেছি সমাধান।

না, ধর্ষণ নিয়ে আমি লিখতে আসিনি। আইন শৃংখলা বাহিনীর সদস্য হিসাবে প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয় এই বিভৎস অপরাধের। একটা ভাবনা শুধু অশান্ত স্রোত তুলে যায়, কবে শেষ হবে এই বিভীষিকাময় রাত্রি, চরমতম অবমাননার প্রহর? কবে ধ্বনিত হবে প্রতিবাদের স্বর, কবে গড়ে উঠবে ব্যুহ?

চলন্ত বাসে ধর্ষিত হয়েছে রূপা, শুধু তাই নয় ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খেয়েছে মধ্যরাতের মামদো ভূতের দল। তের বছর বয়সের পর মায়েরা যে ভূতের ভয় দেখিয়েছে, বাড়িতে সান্ধ্য আইন জারি হয়েছে, হাঁটুর ঝুল ফ্রকে বাহুল্য অনুষঙগ যোগ হয়েছে। চলাফেরা, মেলামেশায় হাজারটা নিষেধাজ্ঞা। জুজুর ভয়ে কুপোকাত। ভাবতাম এসব মেনে চললে ভূতেরা ঘাড়ে চাপবে না।

তারও অনেক পরে বুঝতে পেরেছি, না, পুরুষরুপী এই ভূতগুলোর কোনো বাছবিচার নেই। বয়স হোক না পাঁচ মাস, পাঁচ বছর, পঞ্চাশ কী তারও অধিক – শুধু সে “মেয়েমানুষ ” হলেই হলো। দিনরাত বলে কথা নেই, সকাল – দুপুর – বিকেল, সন্ধ্যে, রাত – যেকোনো সময়, যে কোনো ঘরের, যেকোনো বয়সের মেয়ে নরপিশাচদের বিকৃত লালসার শিকার হতে পারে। স্থান, কাল, পাত্র, সম্পর্ক নির্বিশেষে ওদের শুধু নারীদেহ, নিছক এক তাল মাংসপিণ্ড চাই।

উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত কোন শ্রেণিই নিরাপদ নয়। ধর্ষণের প্রতিবাদ, প্রতিরোধ নিয়ে আমাদের প্রচেষ্টার শেষ নাই। তারপরও প্রতিদিন যোগ হচ্ছে নিত্যনতুন অনাকাঙ্খিত ঘটনা।

ভাবতেই শিউরে ওঠে গা! এইতো মাত্র ক’ বছর আগে রূপার মতো আমাকে মফস্বল শহর থেকে ঢাকা যেতে হতো চাকরির সন্ধানে। বাবা মায়ের কত আশংকা! শিক্ষা অফিসার হিসাবেও যখন কাজ করেছি, প্রতিদিন বাসে চেপে যেতে হতো প্রত্যন্ত উপজেলা সদরে। যেখান থেকে সন্ধ্যার পর একটিমাত্র বাস। ঝড়-বৃষ্টির রাতে কখনও বাসটিতে একমাত্র নারী যাত্রী আমি।

না, তখনও সারদার মাঠে রপ্ত করা আত্মরক্ষার নিরস্ত্র কৌশলগুলি আমার সঙ্গী ছিল না। ছিল শুধু জাগ্রত ষষ্ঠেন্দ্রিয়। যা হয়তো আমাকে সতর্ক করার জন্য যথেষ্ট ছিল, কিন্তু রক্ষার জন্যে নয়। হয়তো একই ঘটনা আমার সাথেও হতে পারতো। ভাবতেই শিউরে ওঠে গা!

ধর্ষণ নিয়ে আমি কিছু বলবো না। কারণ এর আগে অনেক লজ্জা, ক্ষোভ, পরিতাপ, অনুযোগ প্রকাশ করেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসাবে কিছুটা অনুতপ্ত হয়েছি। চেষ্টা করেছি এ সংক্রান্তে রুজু হওয়া মামলাগুলো সর্বাধিক সতর্কতার সাথে দেখবার।

কিন্তু না, উপর্যুপরি কয়েকটা ঘটনায় মনে হলো, না, চোরাকে ধর্মের কাহিনী না শুনিয়ে সময় এসেছে প্রতিবাদ করবার, গৃহস্থকে সজাগ রাখার। আমরা এমন এক সমাজের বাসিন্দা যেখানে মানবিক শক্তি নয় “বাহুবলী” দের পেশীশক্তির জয় জয়কার সর্বত্র। আমি শুধু বলতে চাই এইসব বাহুবলীদের হাত থেকে বাঁচার জন্য সর্বপ্রথম প্রয়োজন আত্মরক্ষার নিরস্ত্র কৌশলগুলো অনুশীলন করা।

যদিও আমাদের মতো বাংলাদেশের আবহাওয়ায় দুধে-ভাতে মানুষ সুশীল শ্রেণির বোনেদের পক্ষে এটা দুরূহ ব্যাপার, তবুও কেউ আপনাকে বাঁচাতে আসার আগে নিজে অন্তত প্রথম প্রতিরোধটা গড়ে তুলুন।

২০১২ সাল থেকে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি টোল ফ্রি হেল্পলাইন কাজ করে যাচ্ছে। এগুলো সম্পর্কে জানাও একধরনের সেল্ফ ডিফেন্স। শিশুর আইনগত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার শিশু সুরক্ষা বিষয়ক হেলপ লাইন-১০৯৮ চালু করে চলতি বছর ২৭ অক্টোবর।

নির্যাতিত নারী ও শিশুদের সেবা দিতে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মহিলা অধিদপ্তর “১০৯২১”সেন্টার বা হেল্প লাইন চালু করে ২০১২ সালের ১৯ জুন। বর্তমানে এটি পরিবর্তিত হয়ে “১০৯” করা হয়েছে। এই হেল্প লাইনটিতে ২৪ ঘন্টায় ৩০০ থেকে ৪০০ কল আসে।

তাৎক্ষণিক পুলিশি সেবা পেতে “BD POLICE HELP LINE” চালু আছে। এছাড়াও বাংলাদেশের সকল থানার অফিসার ইনচার্জের তথ্য সম্বলিত Apps চালু আছে। পারিবারিক সহিংসতার শিকার ভিকটিমদের জন্যে রয়েছে টোল ফ্রি হেল্পলাইন “৯৯৯”। আছে বাংলাদেশ পুলিশের তত্ত্বাবধানে আটটি বিভাগীয় শহরে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার। আপনার নিকটস্থ পুলিশি সেবাসমূহের ফোন নম্বরগুলি সংগ্রহে রাখুন। বিপদে একাধিক নাম্বারে প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন।

কোন সমস্যার প্রতিকার বা উত্তরণের পূর্বশর্ত যেহেতু প্রতিবাদ, আর প্রতিবাদের পূর্বশর্ত যখন সমস্যাটির বিষয়ে সচেতনতা, প্রতিরোধ গড়ে তোলার এতোগুলো অস্ত্র আমাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও রয়েছে সচেতনতার অভাব।
সচেতনতা তৈরি করা দরকার পরিবারে, তৈরি করা দরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে।

রাষ্ট্রকে অভিযুক্ত করি, অভিসম্পাত দেই, ভর্ৎসনা করি আমাদেরকে নিরাপত্তা দিতে পারেনি বলে। করবার আছে অনেক কিছু, কিন্তু সীমাবদ্ধতাও অনেক। দিল্লিতে নির্ভয়ার ঘটনাটা মনে আছে? এরকম উন্নত দেশগুলোতেই অজস্র ব্যর্থতার উদাহরণ আছে। সমাজের প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করা হয়, আইনের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করাটাও সমাজের নৈতিক দায়িত্ব।

অনেকে ধর্ষণ সংক্রান্ত নতুন আইন প্রচলনের কথা বলেছেন। প্রকাশ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন। এ সংক্রান্ত আমাদের দেশের প্রচলিত আইনগুলি যথেষ্ট কার্যকর। এবং এ আইনে সর্বোচ্চ শাস্তিও কিন্তু মৃত্যুদণ্ড। আইন রয়েছে, প্রয়োগকারী সংস্থাও রয়েছে। এখন দরকার শুধু সর্বোত্তম প্রয়োগ নিশ্চিত করা। আইনের অধিকার সচেতনতাটাও এক ধরনের নাগরিক কর্তব্য।

একটি একটি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, আমরা স্তব্ধ হই, আমরা শোকাহত হই, লজ্জিত হই, ঘৃণায়, প্রতিবাদে ফেটে পড়ি। মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন হয়। হৈচৈ ডামাডোল থেমে গেলে চুপ হয়ে যাই আমরা। আবার ভাত খাই, সাজগোজ করি, ঘুরতে যাই, ফেসবুকে ছবি দেই। রীতিমতো ভুলে যাই পূজা, তনু, রূপাদের। আমরা নিশ্চিন্তে থাকি যতক্ষণ না আমাদের নিজেদের ঘর পর্যন্ত পৌঁছে।

আসুন, এই ভূত তাড়ানোর মন্ত্র শিখি। ঘরে ঘরে প্রতিবাদের সুরে সচেতনতা গড়ি। আসুন, আইনকে জানি, আইনি সহায়তা পাবার অধিকারকে নিশি্চত করি। বন্ধ করি ধর্ষণের এই অপসংস্কৃতিকে।

“Every society gets the kind of criminal it deserves. What is equally true is that every community gets the kind of law enforcement it insists on. “
Robert Kennedy

লেখক: সিনিয়র এএসপি, বাংলাদেশ পুলিশ। খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 7.4K
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.4K
    Shares

লেখাটি ৩,৪৫৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.