আনন্দের ইদে তেতো স্বাদ

0

সুচিত্রা সরকার:

শৈশবটা সত্যি অন্যরকম। অত-শত ভেদাভেদ নেই। নিয়মের গণ্ডি নেই। নেই মান অভিমানও।
একবার মনে আছে, ’৯৬ বা ’৯৭ এর রোজার ইদের আগের সন্ধ্যে!

চুল থেকে ‘মেরিল এগ শ্যাম্পু’ খুশবু ছড়াচ্ছে। টুনা’পু বাটা মেহেদী দিয়ে হাতে, চাঁদ তাঁরা একে দিয়েছে। মায়ের বোনাসের টাকা থেকে কেনা হয়েছে একটা স্কার্ট টপস। আর রোজার ইদে, স্কুলের লম্বা ছুটি তো আছেই।

সেই সন্ধ্যেটা মনে আছে এই কারণে, প্রতীক্ষার মানে সেদিনই ভালো বুঝেছিলাম। পড়ন্ত বিকেলে সব্বাই মিলে সাত তলার ছাদে। খুব কাছ থেকে আকাশটা দেখবো আমরা। শিশুরা। খুব কাছ থেকে চাঁদ ওঠা রজনীর সাক্ষী হবো।

সময় অনেক গড়ালো। চিলতে চাঁদখানা সেদিন আর হাসলো না। চাঁদ দেখা কমিটি ফের বসল! অনেক পরে, সকলকে উৎকণ্ঠায় রেখে ‘বিটিভি’র উপস্থাপক ঘোষণা করলেন, আগামীকাল ইদ!

মনে আছে, আমাদের মূল বাড়ির দরজাটায় (স্টিলের) ছ’-সাত বার একটা স্কেল দিয়ে আওয়াজ তুলেছিলাম আমি! আনন্দে! উল্লাসে! তখনও একজন (জন্মসূত্রে) মুসলিম ছেলের মতো, মেয়ের মতো, ইদের আনন্দে মাততে পারতাম!
বয়স ক্রমশ বাড়তে লাগল, আমিও নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে লাগলাম!

দেখলাম, প্রিয় বন্ধুরা, ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা, গরু খাবার নিমন্ত্রণ জানায়!

শিশু মন বোঝে, সেই নিমন্ত্রণ ‘সেমাই’ বা ‘জন্মদিনের কেক’ খাবার আমন্ত্রণের মতো সাধারণ কিছু নয়! স্পেশাল! হয়তো আমার জন্য ‘নিষিদ্ধ’!

তারপর পবিত্র হয়েছিলাম গঙ্গাজলে! আর ডুবেছিলাম ‘ধর্মের বেড়াজালে’! ওই যে শিশু মন!

আবিষ্কার করতে লাগলাম, ওই (জন্মসূত্রে) মুসলিম বন্ধুরা আর আমি আলাদা।

‘লাল পিঁপড়া-কালো পিঁপড়া’, সিঁদুর- শাঁখা, ‘বিধবা আচার’, ‘গোমাতা’- বিষয়ে জানতে ওই বন্ধুরা আমাকে ‘প্রশ্ন ব্যাংক’ ভাবা শুরু করলো! প্রতিনিয়ত ওদের প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে একসময় আমি ক্লান্ত। ওদের ক্লান্তি আসে না। বছর বছর একই প্রশ্ন!

তারপর এসব প্রশ্ন এলেই কীভাবে ‘পালাতে হয়’ সেটা রপ্ত করে নিলাম!

একবার এক বান্ধবী তার হাতের ফিনফিনে ঘন পশম দেখিয়ে বলেছিল, এগুলো বেহেশতের ঘাস! তাই ও সোজা স্বর্গে চলে যাবে! আর আমি জঘন্য মানব ‘কাফের’! আরেকবার আমার হাতের বাহু থেকে ঘ্রাণ নিতে চেষ্টা করেছিল! অনেকক্ষণ শুকে-টুকে বলেছিল, তোর শরীরে অন্যরকম গন্ধ! হিন্দু হিন্দু গন্ধ! ধুপের গন্ধ!

এই একটা প্রশ্ন পরে আমি কতজনকে করেছি, ইয়ত্তা নেই! কেউ আমার শরীরে বিশেষ কোনো ধর্মের গন্ধ পায়নি!

তবু। তবুও ইদ আমার! যে যাই বলুক!

এখনও ইদের আগে শৈশবের মতোই উৎকন্ঠা হয়! আনন্দও। বন্ধুদের সঙ্গে গরুকে ঘাস না খাওয়ালেও, রাস্তার অপরিচিত লোককে গরুর দাম জিজ্ঞেস না করে পারি না! ইদ এলে সেমাই, ফিরনি, নারকেল, দুধ কিনি আমিও।
মোট কথা- ইদ এলে, মার্কেটের ব্যস্ততা, মুদি দোকানের বিক্রি-বাট্টা- সব আমায় টানে! রোশনাই আমায় টানে!

তবু ওই (জন্মসূত্রে) মুসলিম বন্ধুরা, পরিচিতরা আমাকে ইদ-উৎসবে দূরে সরিয়ে রাখে!যেন ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটা শুধু দুর্গাপুজোর বেলায় প্রযোজ্য! কারণ বুঝি না।
আমার বয়স বেড়েছে! বন্ধুদেরও। আরো কতো জ্ঞানী গুণীর দেখা পাই চারপাশে আজকাল। কেউ লেখক, কেউ ব্যাংকার, কেউ কেউকেটা! সকলের দেখি একই রকম আচরণ!

গতবার দুর্গাপূজার সময় এক বান্ধবী ফোন করে জানতে চাইলো, এটা কী পূজা! চারদিকের সাজ সাজ রব, চ্যানেলগুলোর নিউজ, জি বাংলার সিরিয়াল (চ্যানেলগুলো একমাস ধরে পূজার আয়োজন দেখায় অর্থে)- কিচ্ছু হয়তো ওর চোখে পড়ে না। রাগ হলো! উত্তর দিলাম, কালী পূজো! ফিরতি প্রশ্ন, যেই দেবী জিভ বের করে থাকে? বললাম, আজ্ঞে!

পঞ্চাশোর্দ্ধ এক বৃদ্ধা এবার জন্মাষ্টমীর পরদিন জানতে চাইলেন, এটা কি রথযাত্রা? সেই একই ব্যক্তি, সপ্তাহ খানেক আগে জিজ্ঞেস করেছেন, কোরবানি ইদের পরেই দুর্গাপূজা কিনা! বললাম, তা কেন? তিনি জানালেন, কোরবানি ইদের পরই তো দুর্গা পূজো হয়! এবারও শান্তকণ্ঠে বললাম, আজ্ঞে না! শরৎ এলে দুগ্গা আসবেন!

ওদের এই ‘আনমনা ভাবটা’ খুব স্বাভাবিক মনে হয় না আমার!

প্রতিবার সকলকে একই উত্তর দিতে, কি পূজো, কেন পূজো, আমি তিতি-বিরক্ত! কেন যে সকলে প্রত্যেক বছর সব গুবলেট করে ফেলে, ভুলে যায়, আজও বুঝিনি!

কই আমি তো ভুলিনি! নাকি আমার বেলায় জানতেই হয়! সংখ্যালঘুদের কি এসব বাধ্যতামূলক? সংখ্যাগুরুদের আচার-বিচার নখদর্পণে রাখা? নইলে পিছিয়ে পড়তে হয়?

লক্ষ্য করেছি ইদ এলেই ওরা নিজেদের মধ্যে গুটিয়ে যায়। অথবা আমার গুটিয়ে যেতে হয়! সেমাই, ফিরনি, ইদ, সালামি- সব সেরে-টেরে আমি যে একটা প্রাণী এই সমাজে আছি- এইটা তাদের মনে পড়ে পূজো এলে!

‘নাড়ু চাই, দিতে হবে! ঘুরতে চলো!

তখন তো স্লোাগান আছেই- ‘উৎসব সবার’! তাতে আমার আপত্তি নেই! তবে ইদ? তার বেলা?

শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠদের উৎসবে নয়! সব ধর্মের উৎসবে হুল্লোড় করার ইচ্ছে আমার বহুদিনের।

আমার কোনো খ্রিস্টান বন্ধু ছিল না। যতটুকু জেনেছি, সেই বিটিভির বড়দিনের অনুষ্ঠান দেখে।
একবার বড়দিনের সকালে মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি স্কুলের পাশে চার্চে গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। ওদের সঙ্গে উদযাপন করতে!

দরজা বন্ধ! উৎসবের কোনো চিহ্ন দেখলাম না! অনেকক্ষণ পর একজন দরজা খুললেন। কেন এসেছি কারণ জানতে চাইলেন। তারপর বললেন, ভোরে প্রার্থনা শেষ হয়ে গেছে। বিকেলে ফার্মগেটের চার্চে অনুষ্ঠান হবে! আর সোনারগাঁ হোটেলে!

ততক্ষণে আমার ‘এনার্জি’ ফুরিয়ে এসেছে!

গতবারের আগেরবার (কুমিল্লায় বলে ‘তেইত্যাবার’) এক খ্রিস্টান বন্ধুকে বললাম, বড়দিনে কী করবেন? আমি আসবো আপনার সঙ্গে চার্চে? তিনি জানালেন, তিনি ঢাকায় থাকবেন না। ভিক্টর (নওগাঁ বাড়ি) সাক্ষী, কতবার ওকে নিজে, বড়দিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছি।

বৌদ্ধ পূর্ণিমায় বা কঠিন চীবর দান অনুষ্ঠানে ঢাকার ‘দুইন্ন্যার জ্যাম’ ঠেলে লালবাগ থেকে সবুজবাগ চলে যেতাম! যারা ঢাকার ম্যাপটা চেনেন, মানেন নিশ্চয়ই, এই ‘লাল’ থেকে ‘সবুজে’ যেতে কতো পরিশ্রম করতে হয়! তবু যেতাম! ভালো লাগতো! আনন্দ মাখা মুখগুলো দেখতে! অংশগ্রহণ করতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গুরু দুয়ারার’ খিচুরি! অথবা দিল্লির শঙ্করী দি’র সঙ্গে সবচে বড় গুরুদুয়ারায় প্রার্থনায়!

এসব কোনো বিশ্বাস বা অবিশ্বাস থেকে নয়! নিখাদ ভালবাসা থেকে! একাত্মতাবোধ থেকে।
আমার একান্ত মত, পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের উৎসবে আমার অংশগ্রহণের অধিকার আছে! নিজেকে বিরত রাখলে নিঃসঙ্গ লাগে। ক্লাউন ক্লাউন লাগে! কারো অধিকার নেই আমাকে দূরে সরিয়ে রাখার!
উৎসব সবার। শুধু স্লোগানে নয়, আয়োজনেও!

আজ এমন একটা শুভদিনে কেন বলছি একথা? অনেক দুঃখে! অনেক যন্ত্রণায়! অনেক অভিমানে।
কেন বললো না! যখন বুঝতে পারছি, আজ একটা দিন, যেদিন ইচ্ছেমতো নাচা যায়! হাসির হুল্লোড় করা যায়- সেদিন কোনো অভিশাপে আমি ‘আইসোলটেড’! কেন আনন্দের উৎসবে তেতো স্বাদ? কেন প্রচ্ছন্নভাবে ‘বিভেদের দেয়াল’ তৈরি করা?

কেন? কেন? কেন?

(ব্যতিক্রম আছে, তবে জেনারেল চিত্র এই-ই)

২.৯.২০১৭
রাত ১০.৩৯ মিনিট
লালবাগ, ঢাকা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ১,৪৪৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.