শত শত রূপার জন্য আসুন একবার অন্তত জেগে উঠি!!!

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

ছোটবেলায় রূপকথার গল্পে পড়েছিলাম –
এক ছিল মানুষখেকো রাক্ষস। তার অত্যাচারে অতিষ্ট গোটা রাজ্য। সে তার প্রতি রাতের আহার সারতো একজন করে মেয়ের শরীরের মাংস ভক্ষণ করে। যাদের ঘরে মেয়ে ছিল, তারা প্রতিদিনই ভয়ে থাকতো – আজ না জানি কার আদরের কন্যাকে যেতে হয় রাক্ষসের পেটে! যেদিন যে মেয়ের কপাল পুড়তো, ভয়ংকর রাক্ষসপুরীতে গিয়ে সে দেখতো চারপাশে মানুষের হাড়গোড়, খুলি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। ওগুলো আসলে রাক্ষসটা আগে যাদেরকে খেয়েছে সেই হতভাগ্য মেয়েদের হাড়গোড়।…

দেশব্যাপী ধর্ষণ আর হত্যার মহোৎসব দেখে আজ আমার ছেলেবেলার সেই কল্পকাহিনী মনে পড়ে গেল। কখনো ভাবিনি যে দেশে জন্মেছি, মা, মাতৃভূমি, “সকল দেশের রানী” জেনেছি যে দেশকে, আমার সেই প্রাণপ্রিয় দেশটা একদিন আমাদের তথা মেয়েদের জন্য একটা আস্ত রাক্ষসপুরীতে পরিণত হবে। গল্পে তো এক রাক্ষসের অত্যাচারেই মানুষের ঘুম হারাম হয়ে গেছিলো! আর বাস্তবের এই রাক্ষসপুরীর পরতে পরতে লক্ষ লক্ষ ধারালো নখের দাঁতাল নরপিশাচ ওঁৎ পেতে আছে।

না, পুরুষ নামধারী এই দানবগুলোর কোনো বাছবিচার নেই। বয়স হোক না পাঁচ মাস, পাঁচ বছর, পঞ্চাশ কী তারও অধিক – শুধু সে “মেয়েমানুষ ” হলেই হলো। দিনরাত বলে কথা নেই, সকাল – দুপুর বিকেল, সন্ধ্যে, রাত – যেকোনো সময়, যে কোনো ঘরের, যেকোনো বয়সের মেয়ে নরপিশাচদের বিকৃত লালসার শিকার হতে পারে। স্থান, কাল, পাত্র, সম্পর্ক নির্বিশেষে ওদের শুধু নারীদেহ, নিছক এক তাল মাংসপিণ্ড চাই।

বেশ কিছুদিন আগে উইমেন চ্যাপ্টারে “এই শহরে যৌনপল্লী দরকার” শিরোনামে কামরুন নাহার রুমার একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলছি – আপা, ওদের বিকৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ঘরে ঘরে, মোড়ে মোড়ে, পথে পথে যৌনপল্লী হলেও ওদের বর্বরতা থেকে রেহাই মিলবে না। নোংরা পুরুষের শরীর আর মগজে রন্ধ্রগত এ ধর্ষকাম।ওদের জিহ্বার বিষাক্ত লালা থেকে ফুলের মতো নিষ্পাপ কন্যাশিশুটিও মুক্তি পায় না।

দেশ তো নয়, এ যেন সেই ভয়ংকর রাক্ষসপুরী।
এখানে মেয়েরা সারাক্ষণ আতংকে থাকে , কে হবে আজকের শিকার! এরপর কার বলিদানের পালা? আমাদের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে ইয়াসমিন, মহিমা, সিমি, তনু, রিশা, পূজা, রূপাদের ছিন্নভিন্ন শবদেহ।
চলন্ত বাসে বাসের চালক ও তার সহকারীদের দ্বারা গণধর্ষণের পর খুন হওয়া রূপার জন্য আমাদের আহাজারি কতদিনের জন্য? আর কত রূপাদের কাছে মাথা হেঁট করে আমাদের বলতে হবে যে, আমরা লজ্জিত?

পিতৃহীন সাধারণ পরিবারের অর্থনৈতিক হাল ধরা উচ্চশিক্ষিত, সাহসী মেয়ে রূপার ভুল ধরতে আমাদের ভুল হয় না মোটেও। কী দরকার ছিল রাতবিরেতে একা বাসে ওঠার? স্বাবলম্বী রূপার আসলে সবচেয়ে বড় ভুল নিজেকে “মানুষ” জ্ঞান করা। নতুবা রূপার সহকর্মীসহ বাসের সকল যাত্রী যার যার গন্তব্যে নেমে যাবার পরেও কী করে সাহস পায় একা বাকিটা পথ যাবার? ধর্ষকামী পুরুষ যে বিবেকহীন, বর্বর, অমানুষ! ওরা যে কারো পিতা – পুত্র – সন্তান – বন্ধু -সংগী হবার অযোগ্য! বোধ করি, রূপা শুধু নিজেকে না, ধর্ষণের শিকার হবার আগ পর্যন্ত ধর্ষণের পাঁয়তারা আঁটা শয়তানগুলোকেও মানুষই ঠাউরেছিলো। তাই বুঝি রূপার জীবনে মৃত্যু ডেকে এনেছে।

২০১২ সালে ভারতের নয়াদিল্লীতে প্রায় একইভাবে চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল একজন প্যারা মেডিকেলের ছাত্রী।সেই ধর্ষণের প্রতিবাদে সমগ্র ভারতবর্ষ গর্জে উঠেছিল সেদিন। দেশ তাকে অভিহিত করেছিলো
“নির্ভয়া”, ” দামিনী “, “Brave heart”, “India’s daughter” নামে। সিংগাপুরের হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়তে লড়তে নির্ভয়া জানিয়েছিল, সে ধর্ষকদের বিচার দেখতে চায়, সে বাঁচতে চায়। শেষ পর্যন্ত নির্ভয়া মৃত্যুর কাছে হার মানলেও বিশ্ববাসীর হৃদয়ে বেঁচে থাকবে তার নির্ভীক উচ্চারণ। সেসময় পড়েছিলাম, কোনো আইনজীবী ধর্ষণকারীদের পক্ষে দাঁড়াবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

হয়তো রূপার শেষ উচ্চারণও দামিনীর মতো
দৃঢ় ও স্পষ্ট ছিল। ভারতকন্যার জন্য জেগে উঠেছিলো পুরো দেশ। বিচার হয়েছে ধর্ষকদের।

আমরা কেন পারলাম না রূপার জন্য জেগে উঠতে? একজন তনু বা একজন রূপা কী “Daughter of Bangladesh” নয়?
ফারহানা আনন্দময়ী তাঁর লেখাতে ঠিকই তো বলেছেন – রূপা পারেনি আমাদের Brave heart হয়ে উঠতে।

ধর্ষকপুরীতে বসবাস করতে করতে সর্বংসহা হয়ে গেছি, ভুলেছি দানবনিধন – এক অদ্ভুত অনুভূতিহীন জাতি আমরা!
এ ক্রান্তিলগ্নে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কয়েকটি লাইন আমাদের গভীর আত্মবিশ্লেষণ দাবি করে।
“নৈতিক দুৰ্ব্বলতাই আমাদের সর্বনাশের মূল। দৈহিক পক্ষাঘাত অপেক্ষা মানসিক পক্ষাঘাত আরও অধিকতর ক্ষতিকর; কিন্তু বুঝিয়া সুঝিয়াও আমাদের সমাজের – নানাবিধ অনিষ্টকর প্রথা নিরাকরণ করিতে অগ্রসর হইতে পারি না। তাই বলিতেছি, এই মানসিক দুৰ্ব্বলতা পরিহার করিতেই হইবে,— যদি আমরা টিকিয়া থাকিতে চাই।”

জরুরি ভিত্তিতে মানসিক পক্ষাঘাতের চিকিৎসা প্রয়োজন আমাদের। নাহলে মুক্তি নেই। আমরা কী এই সত্যটা অনুধাবন করতে পারছি? প্রতিবাদ না করতে করতে আমরা যে অভিশপ্ত হয়ে যাচ্ছি! যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিশ্চিত বিচার চাই, অস্তিত্বের এ লড়াই যদি জিততে চাই তাহলে চলুন প্রতিবাদ করি, জেগে উঠি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 3
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3
    Shares

লেখাটি ৪২১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.