মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, একটিবার আমাদের কথা শুনুন, প্লিজ

0

সালমা লুনা:

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,
শুভসন্ধ্যা এবং ঈদ মোবারক।
কেমন আছেন আপনি?
ভালোই থাকার কথা।

গতকাল বোধহয় খেলা দেখতে গিয়েছিলেন! তাই দেখলাম ফেসবুকে – উচ্ছ্বসিত আপনি। আপনার এই উচ্ছ্বাসটা আমার খুব ভালো লাগে। খেলা কি সংবাদ সম্মেলন। প্রীতি অনুষ্ঠান কিংবা পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে আপনি একটা সহজাত প্রগলভতায় নানা টিকা টিপ্পনি ঠাট্টা মশকরা করেন একে একটু আদর ওকে একটু খোঁটা বা খোঁচা দেন – বেশ ভালোই লাগে।

উচ্ছ্বসিত আপনাকে ভালো লাগার কারণ অবশ্য দুটা।
এক, আপনার জীবনটা আসলে দুঃখের তো। তাই আপনাকে হাসিখুশি দেখলে মনে হয় – আহা! থাক একটু ক্ষণের জন্য হলেও তো ভুলছেন এতবড় ভয়ঙ্কর শোক। সকালে ঘুম ভেঙে যে জমাট কান্নাটা বুকে উথলে উঠে। ছোট্ট একরত্তি ভাইটা, বাবা মা পরিজনের মুখগুলো ভেসে যায় চোখের সামনে দিয়ে। প্রতি রাতে ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসার আগে তাদের কথা ভেবেই তো চোখের কোনে নোনা বিন্দু জমে থাকে। সেটা একটু আনন্দের প্রলেপে ঢাকা পড়েছে ভেবে ভালো লাগে।

দ্বিতীয় কারণটা হলো আপনাকে তখন আর ভীতিকর মনে হয়না।
আপনাকে অবশ্য আমার তেমন ভয় লাগে না। যতটা ভয় ওই আইনটিকে। সাতান্ন ধারাটিতে আসলে কি আছে আমি সঠিক জানিও না। আপনাকে নিয়ে কটূক্তি করা যাবেনা এটা জানি।
এভাবে আপনাকে সম্বোধন করে ফেসবুকে লেখা যাবে কীনা তা জানি না। না জেনেই তবু আপনাকে এভাবে লিখছি।
এটি আমার কাছেও অকল্পণীয় এবং শিশুতোষ একটা ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে!
হোক শিশুতোষ! অনেক শিশুও তো সরকার প্রধানের কাছে এরকম খোলা চিঠি লিখে ফল পেয়েছে। কোন না কোনভাবে আমিও যদি পেয়ে যাই!

তাই এই লেখা।
লোকে এমনিতেই আমাকে ভয় দেখায়। এত কথা লিখি ফেসবুকে ! আমার স্বামীকেও অনেকে ভয় দেখায় , ভাবীকে এইসব লিখতে মানা করবেন। দিনকাল ভালো না। আত্মীয় বন্ধুরা সতর্ক করে দিনকাল ভালো না। খুব খারাপ সময় চলছে।

আচ্ছা আপা, দিনকাল এরচেয়ে আর কী খারাপ হবে বলেন তো!
ওই যে আপনাকে এইফাঁকে আপাই বলে ফেললাম!
যাইহোক, আপনাকে আপনার দলের ছেলেমেয়েরা আপা বলে। আমার অবশ্য আন্টি কিংবা খালামনি বলতে ইচ্ছা করে। কারণ আপনার বড় সন্তান আমার চেয়ে সামান্যই বড়।
তবুও একজন প্রধানমন্ত্রীকে কি আর আমার মতো বুড়ো মহিলার আন্টি বা খালামনি বলা শোভা পায়?

যাক সেসব, আপনাকে গতকাল খেলা দেখতে দেখে অনেকের ভালো লাগেনি। বিশেষ করে দেশে একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটার পরে আপনার খেলা দেখার আনন্দ অনেকের চোখে লেগেছে। অনেকে মন খারাপ করেছেন, কষ্ট পেয়েছেন।
আমি পাইনি। আমি নৈর্ব্যক্তিক নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখতে চেয়েছি। আপনি ছাড়াও আরো লাখো কোটি মানুষ খেলা দেখেছে। তারা বেশিরভাগই ওই দুঃখজনক ঘটনাটি জানে যেমন আপনিও জানেন। তারা খেলা দেখতে পারলে আপনিই বা পারবেন না কেন? তারা উচ্ছ্বাস দেখাতে পারলে আপনার দোষ কী? তারা ফেসবুকে আনন্দের বন্যা বইয়ে দিতে পারলে আপনি পারবেন না কেন ক্রিকেটারের সাথে খুনসুঁটি করতে? এসব করলে পাপ নেই কোন। এটা আপনার দায়িত্বও বটে! সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। আপনি সবারই অভিভাবক। আপনাকে তো সবই দেখতে হয়!

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, দুঃখজনক ঘটনা তো এই দেশে প্রায়শঃই ঘটে। আপনার জানা হয়েও যায় নিশ্চয়ই।
তেমনি এই গত শুক্রবারের রূপার ধর্ষণ এবং হত্যা ঘটনাটি থেকে পেছনের সকল ধর্ষণের ঘটনা যেগুলো পত্রিকায় টিভিতে আলোড়ন তুলে দেশকে ক্ষুব্ধ করেছে সবগুলোই আপনি জানেন- অনুমান করি। এবং প্রতিটিই মানুষ হিসেবে আপনাকে ব্যথিত করে এবং শাসক হিসেবে চিন্তিত করে এটিও আমার অনুমান।

একটি বিনীত প্রশ্ন আপনাকে, এই ঘটনাগুলি আপনাকে কতটুকু ব্যথিত করে? শাসক হিসেবেই বা আপনি কতটুকু চিন্তিত হোন?
দয়া করে বেয়াদবি নেবেন না। ব্যাথা কি আপনি আপনার নিজ শরীরে অনুভব করেন?
শাসক হিসেবে চিন্তাটা কি আপনার ব্যর্থতাকে স্মরণ করাতে চায়?
উত্তর চাই না।

আমি আপনাকে অত্যন্ত ব্যাথাভরা হৃদয়ে বলতে চাই, একজন নারী হিসেবে আপনি একজন নারীর প্রতিটি সংবেদনশীল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ চেনেন। তার কোথায় আঘাত পেলে কেমন ব্যথা, কেমন যন্ত্রণা, কোথায়ই বা অপমান তার মান অভিমান সব সবকিছু সম্পর্কে আপনার সম্যক ধারণা আছে।

আপনি কি দয়া করে রূপার জায়গায় একবার নিজেকে কল্পনা করে দেখবেন?
পূজা তনু …… থাক, সকলের নাম নিতে চাই না।
আপনি কি রূপার মায়ের জায়গায় নিজেকে একবার বসিয়ে দেখবেন?
আপনি কি আমার মতো আরো অসংখ্য নারীদের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে দেখবেন?

আমি নিশ্চিত, আপনি রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠবেন। টুকরো টুকরো করে ফেলতে ইচ্ছে করবে আপনার রূপার অপরাধীদের। নিজহাতে পিটিয়ে পিটিয়ে ততক্ষণ মারতে ইচ্ছে করবে, যতক্ষণ না তার মুখটা রূপার চেয়েও থেঁতলে যায়।
আপা, ঠিক এ জিনিসটাই। ঠিক এটাই চাচ্ছি আমরা। আপনি রাগে দুঃখে ক্ষোভে এমন ফেটে পড়ে একটা সিদ্ধান্ত নিন। সিদ্ধান্ত নিন একটি আইন প্রণয়নের। যে আইনে থাকবে ধর্ষণের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। এবং এই বিচারটি হবে দ্রুত বিচার আইনে। আর এটি হবে অবশ্যই অ-জামিন যোগ্য।

দেখেছেন হয়তো, আজকের পত্রিকায় বেরিয়েছে – ধনবাড়িতে গতবছরও যে গার্মেন্টস কন্যাটি বাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছিলো, সেই ধর্ষকদের একজন জামিন পেয়েছে।
এই খবরগুলো আমাদের বিচার পাওয়ার আশাকে কালো মেঘে ঢেকে দেয়। তাই কঠোর আইন চাই।
আপা, আপনি অনেক এবাদত বন্দেগী করেন জানি। আপনি নিজের পাশাপাশি দেশবাসীর জন্যও নিশ্চয়ই দোয়া করেন। আপনি আল্লাহর দরবারে অনেক কিছুই চান। আপনি দয়া করে এটিও কি চাইবেন আল্লাহ যেন আপনাকে এমন একটি আইন করার তৌফিক দান করেন ?এবং আপনার শাসনামলে কোন নারীয় বা শিশু যেন ধর্ষিতা না হয়। যৌন নির্যাতনের শিকার না হয়।

প্রধানমন্ত্রী হলে অনেক যন্ত্রণা জানি। কিন্তু এমন একটি আইন না করলে যে আমাদের যন্ত্রণা আরো বহুগুণ বেড়ে যায়! একজন নারী প্রধানমন্ত্রী পেয়েও আমরা অনিরাপদ। আমাদের দেশের উচ্চ পদগুলোতে যে নারীরা স্বগৌরবে অধিষ্ঠিত আছেন তারা আসলে আমাদের কেউ না – এই বোধের যন্ত্রণা আমাদের আরো অসহায় করে তোলে। আমরা মায়েরা আমাদের কন্যাদের নিরাপত্তা নিয়ে যখন অস্থিরতায় থাকি তখন আমরা আপনাদের দিকে দিশেহারার মত চেয়ে থাকি ভরসার আশ্রয় খুঁজি। কিন্তু তা যখন পাইনা সে যে কী যন্ত্রণা এটি আপনাকে আসলে বোঝাতে পারবো না । এরকম অসহায়ত্বের যন্ত্রণা আপনার তো মাননীয় বোঝার কথা!

যাহোক আমি বিশ্বাস করি আপনি বোঝেন। আপনার কোথাও কোন অসুবিধা আছে, তাও বুঝি।
আপনি খুব দ্রুতই নিশ্চয়ই সেই অসুবিধা কাটিয়ে উঠে আপনার কন্যা বোন মা সকলের প্রাণের দাবিটা পুরণে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসবেন।

আমাদের দাবি একটাই, একজন ধর্ষককে অ-জামিনযোগ্য বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিচার করে ধর্ষকের ফাঁসি অথবা ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড চাই।
ভালো থাকবেন প্রধানমন্ত্রী।
আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করি।
মনোকামনা পূর্ণ হোক আপনার এবং আমাদেরও।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.9K
  •  
  •  
  • 5
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.9K
    Shares

লেখাটি ৩,৯১২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.