বহমান সময়ের গল্প

পীতম চট্টোপাধ্যায়:

ভরের বা শক্তির নিত্যতা সূত্র মনে আছে? ক্লাস সেভেন এর ভৌতবিজ্ঞান বই এ ছিল। মনে আছে অলক বাবু পড়াতে পড়াতে জানলার ধারে গিয়ে গেয়ে উঠেছিলেন – “তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না কো কভু…”। যারা ভুলে গেছেন তাদের মনে করে দিই আর একবার?

বিজ্ঞানী ল্যাভয়শিয়র বলেছিলেন, ভরের নিত্যতা সূত্রানুযায়ী পদার্থকে সৃষ্টি করা যায় না বা ধ্বংসও করা যায় না, তাকে এক অবস্থা থেকে অন্য অবস্থায় রূপান্তর করা যায় মাত্র। অর্থাৎ যে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থসমূহের মোট ভর, বিক্রিয়কগুলোর মোট ভরের সমান থাকে। মানে ওই কিছু হারায় না কো কভু।

এরপর আসে শক্তির নিত্যতা সূত্র – পদার্থবিজ্ঞানে শক্তির নিত্যতা সূত্র বলে যে বিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ ধ্রুবক। শক্তি অবিনশ্বর, শক্তি সৃষ্টি বা ধ্বংস করা যায় না। এক রূপ থেকে শক্তিকে কেবলমাত্র অন্য রূপে রূপান্তরিত করা যায়। যেমন, একটি ডিনামাইট এর লাঠির বিস্ফোরণের ফলে রাসায়নিক শক্তি যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। আইনস্টাইন এই দুই মিলিয়ে দিয়েছিলেন আপেক্ষিকতার আবহে। যেখানে মিলে যায় ভর আর শক্তি E=mc2।

আর এখান থেকেই বিজ্ঞানের খোসা ছাড়িয়ে বিষয়টা চলে আসে ব্যবসায়ীদের হাতে – আমায় যদি বেশি খেতে হয় – তাহলে তোমারটা কেড়েই খেতে হবে – সোজা হিসেব। এরপর এলো শক্তির একত্রীকরণ জনিত সমস্যা – বেনিয়ার দল ততদিনে বেশ ভারী হয়ে গিয়েছে। তাই ভারী শক্তি হিসাবে নিজেদের আরো বাড়বাড়ন্তের অভিযানে তারা টের পেল অনেকগুলো কালো কালো সিড়িঙে হাত একসাথে দড়িতে টান মেরে রাজার মূর্তি খান খান করতে শিখে গিয়েছে। এবার মাঠে নামলো রাষ্ট্রের আইন – রক্তচোষার সুললিত সিলেবাস – এক ডজন লোক এক হয়ে কিছু বলতে গেলেই তাদের বারোটা বাজিয়ে দেওয়ার ফরমান -“দুয়ার এঁটে ঘুমিয়ে আছে পাড়া”- জারি আছে ১৪৪ ধারা।

সহজ হিসেব – বেনিয়ারা আবহমান যুগ থেকেই রাজা পুষতে জানে। রাজা খুশি হলে, হাতে থাকলে লুট করার সরকারি পারমিট ছাপিয়ে নেওয়া সোজা। আর গজনীর মামুদ দরকার কী? দেশ সজনী বিভিন্ন রাজনৈতিক মামুরা তো আছেই যে কোনো সৎকার্যে পাশে দাঁড়াবার জন্য! আরে বাবা ‘মানুষ মানুষের জন্য’ আগে ‘অ’ লাগিয়ে গেয়ে ধন্য হয়ে গেলেই হলো – ল্যাঠা চুকে যায়।

কিন্তু এবার সমস্যা এলো অন্য জায়গায় – সব শালাকে ম্যানেজ করা যায় – কিন্তু এই অকারণ ভালোবাসা – এর চেয়ে বড় সমস্যা আর কীইবা হতে পারে? কোথায় ভিয়েতনামে কিছু লোক মরেছে – এখানে তোদের অত দুঃখ উতলে ওঠার কী আছে হে? মানুষ বন্যায় মরছে – তোরা খামোখা নুন আনতে ফুরিয়ে যাওয়া পান্তার ভাগ নিয়ে ছুটছিস কেন নৌকা নিয়ে – কী আপদ!

বেনিয়ারা টের পেল তাদের সবচেয়ে বড় সঙ্কট হলো এই ভালোবাসা। তাই সেটাকে নির্মূল করার চেষ্টা চালু হলো – নিখুঁত – নিপুণ একটা সিনেমা। যেটা দেখতে দেখতে মনে হবে শ্রেষ্ঠ প্রেম কাহিনী বা বিদ্রোহের আঁচে লাল – কিন্তু ভিতরে ভিতরে কাজ করে যাবে ঘেন্নার দালালরা। ময়লা তাড়াতে টিভিতে ডিটারজেন্ট এর অ্যাড দেখেছেন তো? আগে ময়লার চাঁইগুলো ছোট ছোট টুকরোয় ভেঙে – তারপর তাকে চার ধার দিয়ে ঘিরে ফেলে ডিটার্জেন্ট – সাফ করবে বলে। হজম করে নেওয়ার আগে এভাবেই খাবারের অ্যাকটিভ সাইট খুঁজে নেয় উৎসেচক। ঠিক তেমনি খুব ধীরে কিন্তু সংকল্পে দৃঢ়ভাবে শুরু হলো মানুষে মানুষে স্বাভাবিক ভালোবাসার দীর্ঘমেয়াদী প্রশমন বা টাইট্রেশন।

সক্কলে খারাপ – কেউ আপনাকে বোঝে না – আপনি দেবদাস এর ৩৮৯০ তম সংস্করণ। সব্বাই আপনার আবেগ নিয়ে দীঘার বিচে ফুটবল খেলে – এসব জেনে আপনি বিশ্বাস করতে এবং বিষ শ্বাস নিতে শুরু করে দিলেন। সন্ধ্যার সিরিয়ালে চেনানো হতে লাগলো নয়া অভিমন্যুর আত্মকথন – বউ বা শাশুড়ি যে কোনো এক পিসের মধ্যে চেনা জানা কাওকে খুঁজে পাচ্ছেন? ’কই কেউ না তো’ বলার আগে দেখুন কৈকেয়ী নেই তো লুকিয়ে? ভালোবাসা ভাঙ্গার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো এক চিলতে ফাঁকা জায়গা পেলেই সন্দেহের পাথরকুচি হালকা করে ফেলে দেওয়া। সব্বার তিনটে বউ – দুটো বর তার মধ্যে আবার একটা আধার কার্ডে লিঙ্ক একটা প্যানে – আরেকটা হুঁ হুঁ বাওয়া অন্তর্যামী জানে। আপনার দুঃখবাড়ির চুড়োর সাথে মিলবে না যাদের প্রার্থনা ঘরের ছাদ – তারা সব্বাইই খুব খারাপ – খালি খালি আপনার বিশ্বাসের কান মুলে দেয়। নিজের জীবনে না ঘটলেও আপনি টের পান “ওদের“ কাজ কম্মো – বেনিয়া চ্যানেলে আপডেট আসে।

ভালো খবর এর TRP কমে ভালোবাসার ভেঙে যাওয়া সাস্থ্যের সাথে তাল মিলিয়ে। রোজ সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে আপনার পাতে সাজিয়ে দেওয়া হয় -টাটকা মৃত্যু – কয়েক ফালি ধর্ষণ – আর এক প্লেট ডাক্তার – পুলিশ বা শিক্ষকের গাফিলতির মতো মুখরোচক স্যুপ – এক চুমুকেই দিনের সুরটা বেঁধে নেন আপনি। “শালাদের….” নিজের মনেই বেশ কয়েকটা ফাঁসি আর ডজন খানেক দ্বীপান্তর দিয়ে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে অফিসে বেরোন। লাঞ্চ আওয়ারে ক্যান্টিনে ক্লাস সিক্সের মেয়ের ধর্ষণের খবরটা নিয়ে আলোচনা হয় – আশপাশ দিয়ে উড়ে আসা “সব পুরুষই সুযোগ পেলে……”র মতো তীক্ষ্ণ মিসাইলগুলো তখন শার্ট প্যান্ট গোঁফ দাঁড়িতে আপনাকেই খুঁজে নিয়েছে চাঁদমারি হিসেবে। এঞ্জয় করছেন নিশ্চয়ই? অকারণ পাপবোধে কেমন তন্দুর তন্দুর ফ্লেভার আসছে না বন্ধু? রাগের ক্ষোভের ফিক্সড ডিপোজিটে সুদ বাড়ে – এতো আর SBI নয়। ফলত ছেলের আপাত নির্বিষ টিনএজার সিগারেট ঠোঁট আপনার কানে কানে আয়ুশ বা সজল বারুই এর গল্প শোনায় – একটা ভেন্টিলেটর পেয়ে জুলাই এর DVC হয়ে যান আপনি।

এরপর মেয়ের ওটস না কেনার জন্য অনুতপ্ত হবেন – আপনার পাশের পাড়ার সুইসাইড করা বাচ্চা মেয়েটার স্মৃতি আপনাকে ঘুমোতে দেবে না সেই রাতে। সকালে কোনো শ্যামা সঙ্গীত বা আজানের আওয়াজে আপনার গাত্রদাহ হবে খুব – গুগল খুলে “ওদের“ কেচ্ছা ঘাঁটবেন আপনি।

পড়শি দেশগুলো সব্বাই খারাপ।

পড়শি মানুষগুলো হিংসুটে।

পড়শি ধর্মের সব্বাই সন্ত্রাসবাদী।

পড়শি লিঙ্গরা সব্বাই ফেমিনাজি না হয় পুরুষতান্ত্রিক।

সমস্ত মামা কাকা জ্যাঠারাই পিঠে হাত বুলানো পিডোফিলিক।

সমস্ত আত্মীয়রা সুযোগ সন্ধানী – শকুনি টাইপ।

সব্বাই খারাপ এর ছাঁকনিতে এভাবেই ছাঁকতে ছাঁকতে পড়ে থাকবেন শুধু আপনি – একা।

এই ব্রহ্মাণ্ডের একমাত্র বিশ্বস্ত – সৎ – খাঁটি – নির্ভেজাল – ভালো মানুষ।

অত:পর একরকম বাধ্য হয়েই সেই একমাত্র মানবিক অস্তিত্বের সযত্ন পরিচর্যায় মগ্ন হয়ে যাবেন আপনি। মিনারেল ওয়াটার – হেলথ ড্রিংক – অ্যান্টি এজিং ক্রিম – পাতায়ায় স্যান্ডুইচ ম্যাসাজ – ড্রট বিয়ার – ব্ল্যানকেট ডেটা প্যাক – ভার্চুয়াল লিভিং – রিচ কিডস – জীবন এগিয়ে (?) যাবে 4G স্পিডে।

সবার অজ্ঞাতে আপনার আমার বিজ্ঞানীদেরও ঢের আগে কিন্তু বেনিয়ারা আবিষ্কার করে ফেলেছে – কাঁটাতার বা সীমান্তর নিত্যতা সূত্র।

চারিদিকে ক্রমাগত হয়ে চলা এই সীমান্তর বাড়াবাড়ি- আমার দেশ – তোমার দেশ; আমার ধর্ম – তোমার ধর্ম; আমার যৌনতা তোমার যৌনতার মাঝের এই যে ক্রমবর্ধমান বৈরীতার সীমারেখা তার যোগান দিতে মুছে যাচ্ছে মুনাফা আর ঠকানোর মধ্যের বর্ডার লাইন। পুলিশ এর উপরি – ডাক্তারের কম্পানি স্পন্সরকৃত বিদেশ যাত্রা দিব্যি চোখে পড়ে, কিন্তু ব্যাবসায়ীদের মুনাফা করার কোন ঊর্দ্ধসীমা নেই। লাভের জন্য সবকিছু করাই মুনাসিফ – নাহলে দেশ এগোবে কী করে দাদা? ব্যবসার পুঁজি আর সাধারণ মানুষের রক্তের মধ্যের সীমারেখা মিশে যাচ্ছে রোজ – সারা পৃথিবীর বেনিয়ারা কিন্তু মুনাফার সরণীতে এক।

আপনি যত ঘেন্না করবেন – সন্দেহ করবেন যত ভুগবেন নিরাপত্তাহীনতায়, তত ক্রমাগতই একা হয়ে যাবেন আপনি। আপনার স্বাভাবিক খুশির তেষ্টা পাবে। সহজ সাদামাটা আনন্দের জন্য ছটফট করবেন স্বভাবতই। ঠিক তখনই বন্ধুদের সাথে আড্ডার তাজা হাওয়া – ভালো একটা বই পড়ার তৃপ্তি – বাড়িতে ঘরোয়া আলাপ – ভালোবাসা থেকে পাওয়া শান্তির প্রক্সি দিতে আপনার কাছে হাজির হবে বেনিয়াদের তৈরি একটা ঝকঝকে স্মার্ট মরীচিকা, যার নাম Shopping। সুন্দর সাজানো দোকান বা মলে গিয়ে কেনাকাটা করলে তাৎক্ষণিকভাবে কেটে যাবে ক্রনিক মনখারাপের মেঘ। একাকিত্বের সাথে সাথে বাড়বে ভয়। আর তত ভয় কাটাতে আপনি বাড়ি বানাচ্ছেন সব চাইতে সুরক্ষিত করে – আপনার আগ্রহের তালিকায় ঢুকে যাচ্ছে অস্ত্র! সত্যি কারের বন্দুক চালানোর ইচ্ছে মেটাতে ভার্চুয়াল দুনিয়াই আপনার বন্ধু হবে। দামি নেট প্যাক নিচ্ছেন – ইন্টারনেট না থাকলেই আপনার স্ট্রেস হবে, অবিকল যেন মাঝরাতে হারিয়ে গেছেন অচেনা জায়গায়।

আপনার স্ক্রিনে যেচে আসা বিভিন্ন App দেখে ইন্সটল করে দেখার নির্বিষ মজা – আপনার সম্মতির তোয়াক্কা না করেই আপনার ঠিকুজি কুষ্টি বানিয়ে পৌঁছে দেবে বেনিয়াদের ডাটাবেস এ। আপনি কোন ভিডিও বেশি দেখলেন – কোন সাইটে কী জিনিষ কিনবো বলে ফেলে রাখলেন অনলাইন ঝুড়িতে – তার ভিত্তিতেই আপনার পছন্দ-অপছন্দ – মনের বারান্দা – অন্দরমহল এর ম্যাপ তৈরি হয়ে যাচ্ছে। আর বেনিয়াদের হাতে চলে যাচ্ছে আপনার সম্ভাব্য লোভনীয় পণ্যের ফর্দ। সময়ে সময়ে সেসব আসবে আপনার স্ক্রিনে লোভ দেখাতে।

কতদিনে পাশ কাটাবেন এমন নেমন্তন্ন? তাই আপনি কিনেই যাবেন ক্রমাগত শান্তির জল – কর্মফল – রাজনৈতিক দল বা খুঁড়োর কল। ক্রেডিট কার্ড – ইএএমআইএ এর কাঁধে ভর দিয়ে আপনি ধুঁকতে ধুঁকতে ভালো থাকবেন। Happy Selfie ভর্তি দেওয়াল চকচকে পালিশ মেরে – জিনিষ কিনে – নেশার ঘোরে – সহানুভূতিশীল উইজার্ড এর ভিড়ে একদম cool।
আর তাতেই আরো শাঁসে জলে ফুলতে থাকবে দুনিয়ার বেনিয়াকূল।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.