ক্রিয়া-বিক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া

0

ঈহিতা জলিল:

রবিবার আমার “ছেলেদের মায়েরা কি একটু শুনবেন” লেখাটি উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত হয়েছে। আমি পোর্টালটির সম্পাদকের কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ যে কোনো কাজেরই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রয়োজন। লেখাটি যতক্ষণ শুধুমাত্র আমার ফেবু ওয়ালে ছিলো, ততক্ষণ এর প্রতিক্রিয়া একরকম ছিলো। উইমেন চ্যাপ্টারের ব্যানারে যাওয়ার পর এটি বিশালতা পেয়েছে।

WC তে এটি আমার প্রথম লেখা। আনন্দিতও হয়েছি। কারণ একটা সুপ্ত ইচ্ছা তো ছিলোই, ‘একদিন আমিও’।
আমি ভীষণ রকম অলস। আমার মাথায় ঘোরে অনেক কিছুই, কিন্তু লিখতে কষ্ট লাগে। আরো একটা ব্যাপার আমার আছে, আমি চাইলেই লিখতে পারি না। আমার উপর লেখা ভর করতে হয়। তারপর লেখা আসে, আমি লিখি।

মূলত: আমার লেখার আগ্রহের জায়গা আমাদের সামাজিক বিভিন্ন অসংগতি। কারণ আমার মনে হচ্ছে আমাদের সমাজ ব্যবস্থা দিন দিন ভেঙে পড়ছে। কিন্তু আমি কিছুতেই তা চাই না। আমাদের বাঙালী সমাজ আমাদের গর্বের জায়গা। তাহলে এই ভঙ্গুর সমাজকে কিভাবে টিকিয়ে রাখা যায়! সেই ভাবনা থেকেই মূলত আমার এই ইস্যু নিয়ে লেখা।

আমার কাছে প্রতিনিয়ত এমন অনেক মানুষ তাদের জীবনের গল্প নিয়ে আসে। তাঁরা শুধু বলেন “আমি আমার কথাগুলো বলে একটু হালকা হতে চাই”। আমি মন দিয়ে শুনি আর তাঁরা বলতে বলতে ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যান। আমি সব সমস্যার সমাধান দিতে পারিনা। ওটাতো আমার কাজ না। আমাকে যখন বলে ” বন্ধু তুমি বলে দাও আমি কি করবো” আমার কষ্ট হয়। আমি তাদের একটা জায়গা হই, বলুক, বলে হালকা হোক। আমি অনেক ভাবলাম, তারপর লিখলাম। লেখাটা পাবলিশ হবার পর বুঝলাম পরিস্থিতি আমি যতটা ভয়ঙ্কর ভেবেছিলাম তারচেয়ে অনেক বেশী ভয়ঙ্কর। বিশেষত যারা পরিবারে আগে কখনও এধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়নি তাঁরা বুঝেই উঠতে পারেন না কি করবেন।

আমার লেখাটি মোটামুটি যারা পড়েছেন তাঁরা সবাই পজেটিভ রেসপন্সই দিয়েছেন। বিশেষত, অনেক আপারা যারা হয়তো আজ নিজেই শ্বাশুড়ি, কেউ শ্বাশুড়ি হতে যাচ্ছেন।কেউ বলেছেন তিনি তাঁর হোল লাইফ এই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, কেউ বলেছেন ১৬ বছর আগে কেনো লিখলাম না ইত্যাদি।

আমি আসলে মূল ফোকাস রাখতে চেয়েছি মানসিক নির্যাতনের উপর। নির্যাতন কি শুধু শরীরে আঘাত দিয়েই হয়!!! মনে-মগজে আঘাত দিয়ে হয়না!!!

দিনের পর দিন শাশুড়ি যদি বেডরুমের বাইরে দাঁড়িয়ে থেকে ছেলে-ছেলে বউয়ের কথা শোনে, ওটা কি ঠিক? কেন বিবাহিত দম্পতি নিজের বেডরুমের দরজা বন্ধ করতে পারবে না! কেন স্বামী-স্ত্রী ঘুরতে যেতে পারবে না! কেনো নাতি-নাতনিদের কাছে তাদের মাকে খারাপ বানানোর চেষ্টা করা হবে! এগুলো কি নির্যাতন নয়! কেনো এই নির্যাতনের কথা বললে শুনতে হবে বউ চায় না ছেলে মা-বাবাকে দেখুক! স্ত্রী যদি মা-বাবার খোঁজ নিতে নিষেধ করেন, তাহলে স্ত্রীর এই অন্যায় দাবিই বা স্বামীটি মানবেন কেনো!

আমরা সবসময় অন্যের কাঁধে বন্দুক রেখে গুলি চালাতে পছন্দ করি। যে ছেলে বিয়ের পর মা-বাবাকে দেখে না এতে বউ কী করবে! আমি অনেক ছেলেকে দেখেছি, বউ বললেও মা-বাবাকে দেখতে যায় না। আর শ্বশুর বাড়ির লোকজন ধরেই নেয় বউ এর বাবার বাড়ি নিয়ে ব্যস্ত, তাই মা-বাবার খোঁজ রাখে না।

আসলে বিষয়টা তা না। কোন বউ যদি শাশুড়ির সাথে সম্পর্ক না রাখে, সমাজ ধরেই নেয় বউয়ের দোষ। একবার নিজের মনকে কেউ জিজ্ঞেস করে না, আচ্ছা, বউটা তাঁর শাশুড়ির সাথে কেন কথা বলে না!! তালি তো এক হাতে বাজে নারে ভাই। তালি দিতে দুইটা হাত লাগে। একটা হাত তো বউয়ের, আরেকটা হাত কার?

ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখলে আমার কষ্ট লাগে। ওরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। আর তাদের এই অসুস্হ সম্পর্কের প্রভাব পড়ছে তাদের সন্তানদের উপর। আর এভাবেই তৈরি হচ্ছে একটা হতাশ জেনারেশন। এখনকার ছেলেমেয়েরা বিয়েতে অনাগ্রহী হচ্ছে। বিয়ে নামক সবচেয়ে কার্যকরি সামাজিক প্রতিষ্ঠান থেকে তাঁরা দূরে থাকতে চাইছে। যা এই সমাজের জন্য কখনই শুভ না। তাঁরা কোন সম্পর্কেই আস্থা রাখতে পারছে না। প্রেমের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একের পর এক সম্পর্কে জড়িয়ে যাচ্ছে। দায়বদ্ধতা তৈরি হচ্ছে না। কারণ আমাদের সম্পর্কের গোড়া দুর্বল। আসুন এই গোড়াকে এমন করে শক্ত করা যায় সবাই মিলে সেই চেষ্টা করি। ভাবুন। অলরেডি অনেক দেরি হয়ে গেছে, আমরা আর সময় নষ্ট না করি।

আরেকটা বিষয় না বলে পারছি না, আমি কিন্তু লেখাটি লিখেছি সাধারণ মানুষের কথা ভেবে। অনেকে তাদের নিজ পরিবারের উদাহরণ টানছেন। উনারা বুঝতে চাইছেন না উনাদের মতো ভাগ্যবান সবাই না। তাঁরা দশজনে একজন। আমি তো বাকি নয়জনের জন্য লিখেছি। ব্যতিক্রম, ব্যতিক্রমই। ব্যতিক্রমকে উদাহরণ ধরা যায় না।

যদি কাউন্সিলিং এর মাধ্যমে এই সমস্যাগুলোর সমাধান করা যায়, তাহলে ক্ষতি কী! সবাই মিলে সুখে-শান্তিতে থাকবে। যার যার জায়গা তার তার। একজন কখনো অন্যজনের জায়গা নিতে পারে না।

এটা আমাদের সবাইকে বুঝতে হবে। সময় বদলাচ্ছে। আমরা আশা করতে পারি না আমরা যেভাবে জীবন যাপন করেছি আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মও সেভাবেই জীবন কাটাবে। পরিবর্তন যদি ভালোর জন্য হয়, হোক না। যে পরিবর্তন আমাদের একত্রিত করে রাখবে একজনকে অপরের সাথে জুড়ে রাখবে আসুন সে পরিবর্তনকে আমরা খোলা মনে স্বাগত জানাই।

আমরা শপথ নেই, যে কঠিন সময় আমরা পার করেছি আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম যেনো তার ভিতর দিয়ে না যায়। আমরা কাঁটা বিছানো পথে হাঁটছি, যেনো আমাদের সন্তানের জীবন ফুলেল হয়। সবাই ভালো থাকুন। সুন্দর থাকুন। সুস্থ থাকুন। দিনশেষে নিজের বিবেকের কাছে পরিস্কার থাকুন। সবাইকে ধন্যবাদ।

২৮.০৮.১৭
সোমবার
রাত: ১১.২৮ মিনিট

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 695
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    697
    Shares

লেখাটি ৪,০৩১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.