সেই দিন আর নাইরে নাতি

শাশ্বতী বিপ্লব:

(লেখাটি নাঈমাহ তানজিমকে উৎসর্গিত)

“সেই দিন আর নাইরে নাতি, মুঠা ভরি চিনি খাতি।” কথাটা শুনতে খুব মজার তাই না? কথাটার অন্তর্নিহিত সুর আমার খুব পছন্দের। কেমন মিলে যায় এই সময়ের সাথে। মুফতে বাগে পাওয়া, নরম শরম, নিরীহ, সাত চড়ে রা না করা, তথাকথিত সম্মানের ভয়ে কুঁকড়ে থাকা বা মরতে মরতে বেঁচে থাকা মেয়েরা দিন বদলের ডাক দিয়েছে।

ঘোর কলিকাল ভাই! ঘোর কলিকাল!! যে কলিকালের শুরু হয়েছিলো আমারও জন্মের আগে। সেই কলিকাল ফুরিয়ে নতুন কাল এলো বলে। তাকে ভালোবেসে উত্তর কলিকাল বলে ডাকি আমি। উত্তর কলিকাল হবে মেয়েদের আনন্দের কাল, মুক্তির কাল। বাঁধ ভাঙ্গার আওয়াজ উঠেছে চারদিকে। এখনো অনেকটা পথ আছে বাকি। তবুও এসো সকলে আনন্দ করি। উদযাপন হোক সেই অবশ্যম্ভাবী পরিবর্তনের।

আমাদের সেই আনন্দ মিছিলের নেতৃত্ব দিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঘুরে দাঁড়ানো মেয়েরা। পিপার স্প্রে হাতে, কলম হাতে, মুষ্ঠিবদ্ধ হাতে বা নিছক খালি হাতে। তারা সকলে মাথাটা উঁচু করে দাঁড়াক, শিরদাঁড়াটা থাক একদম ঋজু, চোখে থাক তীব্র প্রতিবাদের আগুন, কিন্তু মুখে নির্মল হাসি। সে হাসি মুক্তির, সে হাসি নিয়ম ভাঙ্গার। সে হাসি সকল অন্ধকারকে চ্যালেঞ্জ করার, সে হাসি দুঃসাহসের, সে হাসি বিজয়ের। মেয়েগুলোর বড্ড বাড় বেড়েছে যে, বদনামের ভয়, সম্মান (!) হারানোর ভয় মোটেও করে না। পঁচন ধরা এই সমাজ সংসার বদলে না দিয়ে ওরা থামবে বলে মনে হয় না।

হ্যাঁ, মেয়েগুলো থামছে না কিছুতেই। মুখ লুকাচ্ছে না ঘরের কোনে। পরে পরে মার খেতে চাইছে না আর। রাস্তাঘাটে গায়ে হাত দিলে বেহায়ার মতো চিৎকার করে ওঠছে। পাল্টা তেড়ে আসছে। চড়, লাথি, ঘুষি যা পারে লাগিয়ে দিচ্ছে। গলা ফুলিয়ে চিৎকার করছে, ওই শুয়োয়ের বাচ্চা আমার গায়ে হাত দিয়েছে, বলে। ধর্ষিত হয়ে থানায় চলে যাচ্ছে অপদস্থ হবে জেনেও। দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলছে, আমি ধর্ষণের শিকার। অকপটে নাম বলে দিচ্ছে ধর্ষকের। ক্ষমতাবান ধর্ষক অর্থ ও ক্ষমতার দাপটে বিচার কিনে নিতে পারে জেনেও। এদের কী করে আটকাবে তোমরা বলো? পারবে না।

পঁচে যাওয়া সমাজ তেড়ে ফুড়ে আসছে সেই মেয়েদের আটকাতে। গেলো গেলো রব তুলেছে। অশ্রাব্য গালি দিচ্ছে। বলছে, তোদের বিয়ে হবে না। তোরা বেহায়া, বেয়াদপ। তোরা বেশ্যা। তোরা মাগী। কিন্তু, মেয়েরা থোরাই কেয়ার করতে শিখে গেছে যে। তারা ঘাড় ফুলিয়ে বলছে, তো? কী হয়েছে? শুয়োরের সাথে বাঁচবো না আমরা। কিছুতেই না। প্রতিবাদ চলছে, চলবে। আর যেসব ছেলেরা পাশে দাঁড়িয়েছে, শামিল হয়েছে এই মিছিলে, গালি থেকে বাদ পড়ছে না তারাও।

আমি আশার আলো দেখতে পাই এই মিছিলে জড়ো হওয়া ওই নারী-পুরুষের মুখে। আর খসে পড়তে দেখি তথাকথিত ভদ্রলোকেদের মুখোশ। ভয়ের রেখা ফুটে উঠতে দেখি নির্যাতনকারীর মুখে, গোপন ও প্রকাশ্য ধর্ষকের মুখে। ভাঙ্গনের শব্দ উঠেছে জোরেশোরে বন্ধুরা। ভাঙছে এই নষ্ট সমাজ, নষ্ট সংসার, নষ্ট রীতিনীতি। আবার নতুন করে গড়বে বলে।

সমুদ্র মন্থনে উঠে আসছে কালকূট বিষ। আমরা সেই বিষপানে নীলকন্ঠ হবো। বিষাক্ত গরলে ছেয়ে যাচ্ছে চারদিক, যাক আপাতত। কিন্তু এর শেষ হবে একদিন, হবেই। ভালোবাসার উত্তর কলিকালে আমরাই এই ঘুনে ধরা সমাজ সেঁচে তুলে আনবো অমৃত ভাণ্ড।

ততদিন পর্যন্ত এসো, বেহায়া সকল ভ্রাতা ভগিনীর দল, দিন বদলের কাণ্ডারি বন্ধুরা, আমরা সমস্বরে গাই,

আমরা চঞ্চল, আমরা অদ্ভুত,
আমরা নূতন যৌবনেরই দূত।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.