ঢাকার রাস্তায় মাতাল ইঁদুরেরা

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম
সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহজাবীন ইমাম: আমার ধারণা বিষ খাবার পর ইঁদুরের মেমোরি লস্ট হয়। মেমোরি লস্ট হবার প্রথম ইফেক্ট হচ্ছে ব্রেনে রাখা ম্যাপ ডিলিট হয়ে যায়। যে কারণে ইঁদুর পাগলের মত ঘুরতে থাকে। যে দরজার নিচ দিয়ে একটু আগে সে প্রবেশ করেছে সেখানে যেয়ে গুঁতো খায়, গালে মুখে ব্যাথা পেয়ে কঁকিয়ে উঠে। আবারো সেখানেই হুমড়ি খেয়ে পরে কিন্তু রাস্তা আর খুঁজে পায়না। ঘরের ভেতর চক্কর কাটতে থাকে পাগলের মত। অনেকেরই নিশ্চই এমন ইঁদুর দেখার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

বিকেলে অফিস থেকে বের হলে আমার সেই ইঁদুরদের কথা খুব মনে পড়ে। কারওয়ান বাজার থেকে সায়েন্সল্যাবের পথ টুকুতে অসংখ্য ইঁদুরের সাথে দেখা হয়ে যায়। তারা বিষ খেয়ে ঘুরছে বন বন করে, কেউ রয়েছে বিষ খাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে। রাস্তা ভর্তি ইঁদুর আর ইঁদুর। পেট মোটা, চিকন, পারলার ফেরত, লাল লিপস্টিক দেয়া, বোরখা পরিহিতা, শার্ট ইন করা, টি শার্ট-জিন্স পরা, চোখে পোলিশ হাতে ফাস্টট্রাক ইঁদুরেরা নিউমার্কেট টু বসুন্ধরার ( গাউসিয়া, ধানমন্ডি হকার্স, চাঁদনী চক, হ্যাপি আর্কেড, ম্যাল্টিপ্ল্যান, ইস্টার্ন মল্লিকা, আলপনা প্লাজা, প্রিয়াঙ্গন এবং অরচার্ড পয়েন্ট) দরজায় দরজায় বিষ খেয়ে মাতালের মত ঘুরছে।
কাল শুক্রবার ছিল, অফিস থেকে বের হয়েছি ৪টায় বাসায় পৌঁছালাম তখন প্রায় ৬ টা, অথচ এই পথের দুরুত্ব রিকশায় ২০ মিনিট, গাড়িতে ৭ মিনিটের মত। বাঙ্গালী উৎসব প্রিয় জাতি বলেই এমন করে হাসতে জানে, সহজে আনন্দে ভাসতে জানে। আমোদে-প্রমোদে তার জুড়ি নেই কিন্তু সব কিছুরও তো একটা সীমা থাকে। ১০ রোজা পার হয়নি যেভাবে শপিং মলগুলোতে বিষপাণকারি ইঁদুরের মত গুঁতো খাচ্ছে মানুষ, কি পরিমাণ লিক্যুইড মানি তাদের পকেটে আছে ভেবে পাচ্ছিনা। সবাই যে কিনছে তা নয়, অধিকাংশ ঘুরছে।

অনেক আগে এক বন্ধু আমাকে ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্যে চরিত্রগত পার্থক্য বোঝাতে বলেছিল ইহুদিরা এমন এক জাতি যারা একটি প্লেট কেনার প্রয়োজন হলে সিরামিকের দোকানে যায় এবং সেটা কিনে নিয়ে ঘরে ফিরে আসে। আর খ্রিস্টানরা সূঁচের দোকান থেকে প্লেনের দোকান পর্যন্ত ঘুরে। এর ফলাফল ইহুদিদের ব্যবসায়িক দাপট। কতটা সত্যি আমি নিশ্চিত নই, শুনেছি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস পর্যন্ত নিয়ন্ত্রণ করে ইহুদি ব্যবসায়ীরা।

খ্রিস্টানরা যদি সুঁইয়ের দোকান থেকে প্লেনের দোকান অব্দি যায়, তাহলে বাঙ্গালী মুসলমানদের কি বলা উচিত? অহেতুক ঘুরছে তো ঘুরছেই। এক শার্ট কিনতে ১০ দোকানে যাচ্ছে। দুজনের কাজ করতে ১০ জন মিলে রাস্তায় বের হচ্ছে, আর ইঁদুরের বিষ খাবার মত বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন আর অপ্রয়োজনীয় চাহিদার লোভ গিলে পাগলের মত ঘুরছে। আমি বলছি না মানুষ শপিং করবে না। উৎসবে আনন্দ করবে না। তাই বলে এমন হার-হাভাতের মত আচরণ করবে? মানুষের এত টাকা আর এত সময়! ঈশ্বর পরজন্মে আমায় মাদাম কুরি না হয় নাই বানালে, বাঙ্গালী হলে কিছু অর্থ আর খানিকটা অবসর দিয়ে পাঠিও প্লিজ প্লিজ।

২০ জুলাই ২০১৩।

লেখক পরিচিতি: সাংবাদিক ও লেখক।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.