আপনার কন্যাকে কোন পরিচয়ে দেখতে চান?

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী:

আপনি বাবা?
আপনার আদুরে রাজকন্যাটি সাবমিসিভ না। হয়তো ডমিনেটিংও না। কিন্তু সে অন্যের ডমিনেশন মেনে নিতে পারে না।

আপনার আহ্লাদী কন্যাটি ভীষণ স্বাধীনচেতা। কিন্তু স্বেচ্ছাচারী নয়।

আপনার প্রচণ্ড মেধাবী কন্যাটি মুক্তিকামী, মুক্তমনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী।

আপনার আদুরে বেড়াল ছানার মতো মিষ্টি রাজকন্যাটি ছোটবেলা থেকেই আত্মবিশ্বাসী, স্বনির্ভর।

আপনার রাজকন্যাটি চার দেয়ালে বন্দী জীবনে কেবল আপনার মেয়ের পরিচয়ে বাঁচতে চায় না। তার নিজস্ব একটা পরিচয় চাই, যে পরিচয় আপনাকেও দিবে একটি নতুন পরিচয়।

আপনার কন্যাটি কেবল পড়ার বইয়ে মুখ লুকিয়ে থাকতে চায় না। আপনার মেয়েটি খোলা মাঠে প্রাণ খুলে গান গায়।কলেজের ফাংশনে আবৃত্তি, উপস্থাপনা, অভিনয়ে ঈর্ষান্বিত সাফল্য অন্যের চোখে হিংসের আগুন জ্বালায়।

আপনার কন্যাটি আপনার নয়, তার নিজের গুণে তার জীবনের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সকলের চোখের মনি।

আপনার এই রাজকন্যাটি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিয়ের পাত্রী হিসেবে শতভাগ যোগ্য। কিন্তু বিবাহোত্তর জীবনে আপনার জামাতা এবং সেই কন্যার সুযোগ্য শ্বশুরালয় যদি বলেই ফেলে, তাদের সংসারী বউ চাই, চাকরিজীবী ম্যাডাম না। বউ বাজারে যেতে পারবে না। ফাংশনে গাইতে পারবে না। আবৃত্তি, উপস্থাপনা,পার্টি সব হারাম। বউয়ের আবার পরিচয় কিসের? তার একটিই পরিচয়! সে অমুক বাড়ির তমুকের বউ!

এ সবকিছু মানতে না পারলে আপনার সেই আদুরে কন্যাটি নারীবাদী? নষ্টা? ভ্রষ্টা?

এই মেয়েটিকে আপনিই তিল তিল করে গড়েছেন। আজ তার নিজস্ব পরিচয়ে পরিচিত হওয়া, আত্মবিশ্বাসী,আত্মনির্ভরশীল হওয়া ভুল হলে আপনার জীবনে তাকে দেয়া সব শিক্ষাই ভুল। আপনার রাজকন্যার প্রাপ্ত শিক্ষার মাপকাঠি পঁচিশটি বছর স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো পরীক্ষাতে হলো না?
শ্বশুর বাড়ির পরীক্ষাকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত পরীক্ষাটা তাকে বিচার করবে?

কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ বলছি না।
অন্য নারীকে দোষারোপ করতে স্থুল আনন্দ পাই, বা বেদনানুভব করি, এমন যারা আছি, নিজেরাই ঠিক করি,আমার কন্যাকে আমি কী হিসেবে দেখতে চাই। সেভাবেই যেন তার ভিত গড়ে দেই।

সমাজের রক্তচক্ষুকে চোখ রাঙ্গিয়ে স্বপরিচয়ে বাঁচতে শেখাই। সেখানে সে সকলের প্রিয় হতেও পারে, আবার নাও হতে পারে। প্রিয় না হতে পারার শোককে শক্তিতে পরিণত করার সাহস এবং বুদ্ধিমত্তা থাকতেই হবে।

অথবা এসবকিছুই না, তার চেয়ে নাম পরিচয়বিহীন সাবমিসিভ গৃহবধু বানাই। সেখানেও সে সকলের প্রিয় হতেও পারে, নাও পারে। তবে সমাজের রক্তচক্ষু সইতে হবে না। নিজের একটা আলাদা পরিচয়ও থাকবে না।

একজন নারীর জন্য দুটো পরিচয়ই আনন্দের হতে পারে। পছন্দ আপনার। সিদ্ধান্তও আপনার। আপনার কন্যাটিকে আপনি কোন পরিচয়ে দেখতে চান?

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.