মানব সম্পর্ক জানতে অকপট হওয়ার বিকল্প নেই

0

শেখ তাসলিমা মুন:

কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে অনলাইন বুলিং একটি নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভণিতা ভর করে আছে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সত্য সুন্দর আলোচনা থেকে আমাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মূর্খতা ভর করছে আমাদের। আমি মনে করি, সত্য কখনই রেসিপি অনুযায়ি হয় না। সত্যকে সে যেমন তেমন করেই এক্সপ্লোর করতে হবে জ্ঞান তথ্য এবং বিশ্লেষণের ভিত্তিতে।

মনোগামিতা কী?

সময়ের সাথে সাথে মনোগামিতার সংজ্ঞা বদলেছে। মনোগামিতার পুরনো সংজ্ঞা অনুযায়ি মানুষ বুঝতো, জীবনে একজনের সাথে একবার বিবাহ সম্পর্কে থাকাকে। এরপর মনোগামিতার অর্থ সামান্য বদলালো। মানুষ সারা জীবনে একটিবার মাত্র নয়, পৃথক পৃথক সময়ে আবারও বিবাহ করতে পারবে, কিন্তু একটি বিবাহে শুধু একজনের সাথে বিবাহিত থাকবে। এরপর আরও একটি পরিবর্তন। এবার বলা হলো, একসাথে একজন সেক্স পার্টনার থাকাকে মনোগামিতা বলে। অর্থাৎ মানুষ তার মেধাকে পরিচালিত করেছে, প্রসারিত করেছে সময়ের সাথে সাথে। মূল কনসেপ্ট, এমন একটি রিলেশন, যেখানে একটিমাত্র মানুষের প্রতি তার ভালবাসার সম্পর্ক অভিব্যক্ত হয়।

মানুষ প্রকৃতপক্ষে অবলম্বন প্রিয় এক প্রাণী। সে ভাঙে আবার সমর্পণের এক আকাঙ্ক্ষা তাকে তাড়িত করে। সে সারা জীবন ধরে একটি আশ্রয় খুঁজে ফেরে। মেধার বিকাশের সাথে সাথে প্রেম মানুষের নান্দনিক বিষয় হয়ে উঠেছে। সেক্স এবং প্রেমের ভেতর পার্থক্যও মানুষের নান্দনিকতা বোধের উন্মেষের পর।

চার্লস ডারউইন বলেছেন, মানুষ ন্যাচারালি মনোগামাস নয়। পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীকুল এবং স্পিসিসের ভেতর বহুগামিতা রয়েছে। এমনকি মানুষের ভেতরও এ আচরণ স্বাভাবিক আচরণ।

অবশ্যই ডারউইনের সমালোচনাকারীরা বলেছেন, এটা উড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি বিষয়, কারণ মানুষের মেধা কখনও থেমে থাকেনি। মেধা ক্রমাগত বিকাশের একটি ধারা। মানুষের মেধার বিকাশের সাথে সাথে মানুষ অনেক বিষয়কে ফর্ম করেছে। মানুষ শিখেছে। মানুষের শিক্ষাই ‘সিভিলাইজেশন’। আর সেজন্যই মনোগামিতা যতটা স্বভাবজাত, তার থেকে মেধাজাত সৃষ্টি।

তবু মানুষ বারবার অনুভব করেছে, মানুষ সবখানে অবস্থান করছে কেবল তার বর্তমান সম্পর্কে নয়। মানুষের ব্যর্থতার ইতিহাস তাই নিছক কম নয় এ এরিয়াতে। যদি মানুষ এ বিষয়ে সফল হতো, তাহলে আজকের এ আলোচনার কোন প্রয়োজনীয়তা থাকতো না। আলোচনার বিষয়ও হয়ে উঠতো না।

মনোগামিতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো ম্যারেজ। মনোগামিতা এবং ম্যারেজ প্রায় সমার্থক। বলা হয়ে থাকে infidelity and cheating মনোগাম রিলেশনের নিড। যে অর্থে একটি কন্ট্রাক্ট তৈরি হয়, কন্ট্রাক্ট ভঙ্গের বিষয়টিও তার সাথে জড়িয়ে থাকে।

ওপেন রিলেশনশিপ কী?

ওপেন রিলেশন বিষয়ে অনেক মিথ আছে। সবচাইতে স্থুল ব্যাখ্যা মনে হয় এটি যে, ওপেন রিলেশন অর্থ একই সাথে একাধিক সেক্সুয়াল রিলেশনের ছাড়পত্র নেওয়া। বিষয়টি সেভাবে কী? ওপেন রিলেশন মূলত মনোগাম সম্পর্কের ব্যর্থতার বিপরীত একটি কনসেপ্ট।

একটি ‘ইচ্ছা সম্পর্কের’ নাম। এটি সেক্সুয়াল অবশ্যই হতে পারে, তবে সেক্সই এ সম্পর্কের মূল ভিত্তি নয়। ‘বন্ধন’ মুক্ত থেকেও যে ‘বন্ধন’ টিকে থাকে, সে সম্পর্কের নামই ওপেন সম্পর্ক। আবারও বলছি, এ সম্পর্কের মূল কনসেপ্ট সেক্সুয়াল নয়, তবে সেক্সুয়াল সম্পর্ক আসবে, সেটা অস্বাভাবিক নয়, আবার অবশ্যই নিষিদ্ধও নয়। এ সম্পর্কটিকে বরং অনেক বেশি শক্তিশালী সম্পর্ক বলে মনে করারই যথেষ্ট কারণ রয়েছে এ কারণে যে, এ সম্পর্কে কনভেনশনাল সকল বিষয়ের বাইরে গিয়ে দুজন মানুষ তাদের মেধা, বুদ্ধিবৃত্তি এবং অনুভব শক্তিবলে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভালবাসা ও নিডকে পরখ করতে বাধ্যবাধকতামুক্ত হয়ে একটি সম্পর্ক চর্চা করে। অর্থাৎ এক্সটারনাল বিষয়গুলো থেকে মুক্ত হয়ে বা এক্সটারনাল কোনো চুক্তি ছাড়াই একে অপরের প্রতি যে আকর্ষণ ও ভালবাসা অনুভব করে এবং যে সম্পর্ক অনুভবে টিকে থাকে, সেটাই ওপেন রিলেশন।

ওপেন রিলেশন বহুগামি হতে পারে, আবার নাও পারে। এটি নির্ভর করে সে ভালবাসার পাত্র-পাত্রীর উপর। মূল কনসেপ্ট, মানসিক বা শারীরিকভাবে তাদের সামাজিক, আইনি, পারিবারিক, ধর্মীয় বা অর্পিত এবং প্রবর্তিত মূল্যবোধজনিত যেকোনো কন্ট্রাক্টে না জড়িয়ে দুজন মানুষের ‘স্বেচ্ছা সম্পর্ক’ এবং সেই স্বেচ্ছা সম্পর্কে দুজন মানুষের সাক্ষাৎ বা মিলন।

সিমোন দ্য বোভোয়া এবং জা পল সার্ত্রের সম্পর্কে আমরা এ ধরনের একটি সম্পর্ক বিষয়ে জানতে পারি। সেটি সার্বজনীন কিনা সে বিষয়ে সিমোন দ্য বোভোয়া নিজে বলেন, সার্ত্রে এবং আমার সম্পর্ক একটি স্বতন্ত্র সম্পর্ক, যা আমাদের দুজন মানুষের ব্যক্তিত্ব এবং নিডের সাথে খাপ খেয়েছে। আর তাছাড়াও আমরা দুজন এমন একটি বয়সে মিট করেছিলাম, যখন সমাজ ধর্ম এসব বিষয়গুলো আমাদের ফর্ম করতে পারেনি।

মানুষের টানাপোড়েনের ভেতর সম্পর্ক একটি বড় টানাপোড়েন। সম্পর্ক মানুষের এক্সিস্টেনসিয়াল টানাপোড়নের সাথে সম্পর্কিত। ঈশ্বর ভাবনা মানুষের একটি নিড থেকে এসেছে। একাকিত্বের ভীতি থেকে। প্রেমও এমন একটি টানাপোড়েন। যতটা সে পায়, তার থেকে সে না পায়। কোনো ফর্মেই মানুষ আসলে তার এ টানাপোড়েনকে অতিক্রম করতে পারেনি।

সিমোন দ্য বোভোয়া নিজেও বলেছেন, তাদের একে অপরের সাথে সম্পৃক্ততায় কোথাও একটি অভাব থেকে যেতো। সেটি জানতে তাদের নিজেদের থেকে নিজেদের পৃথক হতে হতো। একে অপরকে ঠকিয়ে বা অভিনয় করার অপশন তাদের জন্য ছিল না। তারা স্বেচ্ছায় তাদের সে সত্ত্বাগুলো জানার জন্য তারা সাময়িক সম্পর্ক মুক্ত থাকতো। আর এ সম্পর্কমুক্ততাও ছিল উভয়ের নিড এবং সমঝোতার ভেতর। অনেক প্রশ্ন এবং অনেক উত্তর তাদের জমা হয়ে যেতো, তখন তারা আবার দুজনকে খুঁজতো। একসাথে ঝালাই করতো তাদের অন্তর্জগতকে। এভাবেই তারা নিজের কাছে নিজেদের একটি সম্পর্ক হয়ে ওঠে। এ সম্পর্ক এমন একটি সম্পর্ক হয়ে ওঠে যা যেমন ‘টেক ইট ফর গ্রান্টেড’ ছিল না, অথচ ছিল দুজন দুজনের জন্য একটি নিড। ঠিক এ সম্পর্কটিকে আমি বলি, ওপেন সম্পর্ক, যা বাধার জন্য দড়ি ফিতে শেকল লাগে না। সম্পর্ক আপন মহিমায় থাকে।

‘প্রেম’ না ‘পরকীয়া’?

‘পরকীয়া’র মতো একটি শব্দ তৈরি করে তার উপর সব দোষ চাপিয়ে আমরা মূল সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম হবো না। একটি রুগ্ন সম্পর্ক কেবল নীতি কথার উপর ভিত্তি করে টিকে থাকেনি। প্রেম একটি নিড। মানুষ প্রেমের কাছে আসবে। একটি সামাজিক কন্ট্রাক্ট প্রেমকে আটকে রাখতে সক্ষম হয়নি। সামাজিক, আইনি বা ধর্মীয় কন্ট্রাক্ট প্রেম সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়নি।

প্রেম দুজন মানুষের হৃদয় থেকে উৎসারিত। প্রেম একদিন শেষ হয়ে যেতে পারে, সেটিও অনুভব থেকে উৎসারিত। ‘পরকীয়া’ নাম দিয়েছে মানুষ। যে সম্পর্কটিকে আইনি বা ধর্মীয়ভাবে লিগ্যাল করা হয়েছে সেটি যদি ওয়ার্ক না করে, সেটি কেবল সামাজিক, আইনি বা ধর্মীয় বলে প্রেমময় হবে সেটি চাপিয়ে দিয়ে প্রেম সফল করা সম্ভব হয়নি। কন্ট্রাক্ট সম্পর্কগুলোর আইনি ভ্যালু আছে ততোটুকুন, আইন যেটুকুন দিয়েছে সেটুকুন। কিন্তু তাকে প্রেম বলে দাবি করা যায় না। কন্ট্রাক্টের বাইরে যদি কেউ প্রেমে পড়ে, সে প্রেম প্রেম নয়, এমন বলার যুক্তি যুক্তিবাদী মানুষের থাকে না। সেজন্য সমস্যা যেমন ভিন্ন জায়গায় খুঁজতে হবে, তার সমাধানও ভিন্নভাবে। নির্মোহভাবে বিষয়বস্তুর ভেতরে না ঢুকতে পারলে বিষয়টির প্রতি সুবিচারও করতে সক্ষম হবো না।
প্রেম হোক দুজন সবল ব্যক্তিত্ববান মানুষের ভেতর। তারা তাদের প্রেম তাদেরই হৃদয়ে প্রতিফলিত করুক আপন সুষমা ও সম্মোহনে।

চাপিয়ে দেওয়া চুক্তিভিত্তিক সম্পর্কগুলো টিকছে কিনা সেটি আলোচনার বিষয় হয়ে উঠুক। তাহলেই এর পজিটিভ এবং নেগেটিভ দিকগুলো স্বীকার করতে পারবো। স্বীকার না করলে তার সমস্যাগুলো অতিক্রম করা সম্ভব নয়। আমি নিজে কি চাই সেটি এখানে বড় নয়। আমার মতামতও বড় নয়। একটি মানব সমাজ এটি নিয়ে কেমন আছে সেটি এখানে বড় বিষয়।

স্টকহোম, সুইডেন
২০ আগস্ট ২০১৭

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1
    Share

লেখাটি ৬৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.