ঋতুস্রাব বা পিরিয়ড নিয়ে বেশি বেশি কথা বলুন, ট্যাবু ভাঙুন

0

প্রমা ইসরাত:

আমার যখন ঋতুস্রাব শুরু হয়, তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। ক্লাস সেভেন এর গার্হস্থ্য বইয়ে ঋতুস্রাব নিয়ে একটি চ্যাপ্টার ছিল, যেটা ক্লাসে ম্যাডামরা বলে দিতো, বাসায় গিয়ে পড়ে নিতে। আমি সেটা বাসায় বসেই পড়ে নিয়েছি। তো আমি ঋতুস্রাব, বা মিন্সট্রুয়েশন নিয়ে জানতাম।

অনেক আগেই আমি নাসরীন জাহানের “নিকুন্তিলা” উপন্যাসটা পড়েছিলাম, তো সেখানেও একটা আইডিয়া পেয়েছিলাম। ছোট বেলায় আমাদের বাসায় যে কয়জন সাহায্যকারী এসেছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই খুব ছোট বয়সে এসেছিল, এবং বয়ো:সন্ধি হলে তারপর আবার বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। এবং বাড়িতে তাদের ফিরিয়ে নেবার কারণ তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া।
ঋতুস্রাব একটি ভয়ানক লজ্জার এবং হাসাহাসির বিষয়, এটা আমি ছোট থেকেই দেখেছি। আমার যেহেতু অন্যান্য অনেক সহপাঠীদের তুলনায় পরে ঋতুস্রাব হয়েছে, আমি এই ব্যাপারটা নিয়ে অনভিজ্ঞ বা বলা চলে তাদের চেয়ে জুনিয়র ছিলাম। কিন্তু ফিসফাস আলাপ কানে আসতো।

লজ্জার, ভয়ের, শুধু মেয়েদের জিনিস, গোপন ব্যাপার, এবং উচ্চারণ করা যাবে না, এইরকম একটা ব্যাপার মিন্সট্রুয়েশন। যাদের এটা হয়, বা যারা এটা নিয়ে কথা বলে তারা খারাপ, তারা পাঁজি।
আমার যেদিন প্রথম পিরিয়ড হয়, সেদিন কোনো একটা ক্লাস টেস্ট চলছিল। আমি শুনেছিলাম পেট ব্যাথা হয় পিরিয়ড হলে, তো সকাল থেকেই আমার অসম্ভব পেট ব্যাথা করছিল, যা ছিল আমার জন্য প্রথম এক অভিজ্ঞতা। আমি তখন স্যানিটারি প্যাড সম্পর্কে জানতাম না। কাপড় ব্যবহার করতো অনেকেই শুনেছিলাম। তো দাদীর কাছ থেকে এক টুকরা কাপড় ব্যাগে নিয়ে গিয়েছিলাম। পরীক্ষা শেষে বাসায় গিয়ে আমার নিজের ঋতুস্রাব দেখলাম। মনে মনে ভাবলাম, ও আচ্ছা, এই তাহলে ঋতুস্রাব, এই সেই পিরিয়ড, এই সেই মাসিক! এটাকে নিয়েই তাহলে এতো লুকোচুরি! তারপর বোধ হয় আমার মা’র কাছে গিয়ে বলেছিলাম, যে “আম্মু আমার তো পিরিয়ড হইছে”।

স্কুলে অনেক মেয়েই প্রস্তুতি নিয়ে আসতো না, বা কিভাবে হিসেব রাখতে হয় এই ব্যাপারে দক্ষ ছিল না। স্কুলে তখন একটা বিব্রতকর পরিস্থিতি হতো। আমি যে স্কুলে পড়েছি, সেই স্কুলে ছেলেদের সাইড, মেয়েদের সাইড আলাদা ছিল। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আপ্রাণ চেষ্টা ছিল, কোনমতেই যেন ছেলেরা মেয়েদের সাথে ‘ইটিশ-পিটিশ’ করতে না পারে। “এন্টি প্রেম স্কোয়াড” ছিল একটা আমাদের স্কুলে, তাদের নজরদারি এড়িয়ে প্রেম করা ছিল মুশকিল। যাই হোক, এই দিকে এতো নজরদারী থাকলেও মেয়েদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে খুব একটা তৎপরতা আমি দেখতাম না। আমার মাঝে মাঝে খারাপ লাগতো, অনেক টিচার, যাদের আমরা মায়ের মতো দেখতাম, কোন মেয়ে ঋতুস্রাব সংক্রান্ত সমস্যা নিয়ে গেলে তারা একই সাথে বিব্রত, এবং বিরক্ত বোধ করতেন।
আমাদের ব্যাচের ছেলেদের অনেকেই, ব্যাচের মেয়েদের কাছে ক্লাস সেভেনের গার্হস্থ্য বই চাইতো। এর ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল। তারা জানার জন্য চাইতো, ব্যাপারটা এমন ছিল না, তাদের উদ্দেশ্য থাকতো, এই ব্যাপারগুলো নিয়ে মেয়েদের বিব্রত করা।

বয়ো:সন্ধিকালীন সেনসেটিভ সময়গুলোতে ছেলে-মেয়ে উভয়ই কাটায় কাল্পনিক সব জল্পনা-কল্পনায়। ছেলেদের বয়ো:সন্ধিকালীন বীর্যপাত হওয়া যতোটা পুরুষালি, “মার্দ কা বাচ্চা” টাইপ, মেয়েদের ঋতুস্রাব হওয়া ততোটাই লজ্জাজনক দুর্বল ব্যাপার। তারপরও একটা ছেলের শারীরিক পরিবর্তনের সময়, ছেলেটিও একাকি বোধ করে। তার ভেতরেও নানান প্রশ্ন, নানান চিন্তা শুরু হয়, সেটা সেই ছেলেটির জন্যও প্রথম অভিজ্ঞতা, তার জন্যও বিব্রতকর।

মেয়েদের ঋতুস্রাব নিয়ে কথা বলা, বা ট্যাবু ভাঙা মোটেই সহজ কোনো ব্যাপার না। কিন্তু এই ট্যাবু ভাঙা খুব জরুরী, কারণ এই ব্যাপারটা কে অবহেলা করা মানে, একটা মেয়ের জীবনের নানান স্বাস্থ্যঝুঁকিকে অবহেলা করা। যেমন অনেকেরই পিসিওএস থাকে। পিসিওএস (পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম), নারীদের এমন এক সমস্যা যার সাথে ঋতুস্রাবের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আছে। শারীরিক আরো কিছু সমস্যা হয় এই পিসিওএস থাকলে। অনিয়মিত ঋতুস্রাব কিংবা অতিমাত্রায় রক্তক্ষরণ, শারীরিক ওজন বৃদ্ধি, গর্ভধারণে সমস্যা, মুড ডিজঅর্ডার, চুল পড়া, বা অতিরিক্ত লোম গজানো ইত্যাদি বেশকিছু সমস্যা হয় এই পিসিওএস থাকলে। কিন্তু এইগুলো নিয়ে অনেকের ধারণাও থাকে না, আর হয়ত অবিবাহিত অবস্থায় আলাপও করে না।

ঋতুস্রাব নিয়মিত হওয়া মানে সেই নারীদেহ সুস্থ। শরীরের সুস্থতাও অনেক সময় জানা যায়, ঋতুস্রাবের সময় রক্তের রঙ এর ধরন দেখে। কিন্তু এই মিন্সট্রুয়েশন বলেন, মাসিক বলেন, কিংবা ঋতুস্রাব বলেন এতোটাই ঘৃণার ব্যাপার যে অনেক মেয়ে নিজের প্যাডের দিকে ভালো করে তাকায়ও না। আবার অনেকে অত্যন্ত অসচেতন হয়ে, অবিবেচকের মতো প্যাড কমোডে ফেলে, “ইহা লইয়া আমরা কী করিবো” এই হচ্ছে ভাবখানা।

ব্যক্তিগত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা প্রতিটা মানুষের স্বাস্থ্যগত প্রয়োজনের মধ্যেই পড়ে, আর মেয়েদের জন্য সেটা আরো বেশি দরকার কারণ, তাদের ইনফেকশন হবার সম্ভাবনা বেশি থাকে। আমাদের দেশ নারীবান্ধব না, প্রয়োজন অনুযায়ী টয়লেট ব্যবস্থা নেই, পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা নেই, সাবানও থাকে না, আবার একটা মেয়ে বাথরুমে যাচ্ছে এই দৃশ্য তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখা লোকেরও অভাব নেই আমাদের দেশে।

এখন এই যে দেশে লক্ষ লক্ষ মানুষ বন্যায় পানিবন্দী হয়ে জীবন কাটাচ্ছে, এদের মধ্যে নারী এবং কিশোরীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে সবচেয়ে বেশি। এখন পরিস্থিতি এতোটাই খারাপ যে, এই সময়ে পরিষ্কার থাকাটা, শুকনো থাকাটা অসম্ভব। তার উপর পরিষ্কার পানিও নেই। মানুষের মাথা গোঁজারই ঠাই নাই, খাদ্য সঙ্কট, পানি সংকট, যেকোনো সময় ডুবে গিয়ে প্রাণনাশের আশংকায় কাটছে দুর্গত এলাকার মানুষের। সেখানে মেয়েদের বিষয়গুলো আলাদা করে দেখার সময় কোথায়!
ঋতুস্রাব নিয়ে বেশকিছু মানুষকে মশকরামূলক ট্রল করতে দেখলাম। তাদের দৃষ্টিতে ঋতুস্রাব হয় নারীবাদীদের। অথচ কী আশ্চর্য দেখুন, ঋতুস্রাব শুধু নারীবাদীদের কিংবা শুধু “চ্যাপ্টারবাদীদের” হয় না, যে জঙ্গী নারী জিহাদে সুইসাইডাল ভেস্ট পরে তার সন্তানসহ বোমব্লাস্ট করলো, তারও ঋতুস্রাব হতো। ঋতুস্রাব হয় আওয়ামী লীগ করা নারীদের, ঋতুস্রাব হয় জামায়াত করা নারীদের, বিএনপি করা নারীদেরও ঋতুস্রাব হয়। এবং মেনোপজও সব নারীদেরই হয়। যারা মশকরা করছে তাদের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যা সবারই একই নিয়মের মধ্য দিয়েই যেতে হয়। বয়ো:সন্ধি থেকে মেনোপজ হওয়ার আগ পর্যন্ত, সুস্থ নারী মাত্রই ঋতুস্রাব হবে।

ভারতে একজন মেয়ে নাকি তার প্যাডের ছবি সোশ্যাল সাইটে পোস্ট দিয়েছিল। ট্যাবু ভাঙতেই সে এমন স্টেপ নিয়েছিল। হ্যাঁ ব্যাপারটা ট্যাবু, যেমন সেক্স একটি ট্যাবু। ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বিয়ে করা হয়, অনেকটা ঘোষণার মতো, আমরা সবাই জানি, ফ্রম টুডে দে আর লিগ্যালি হ্যাভিং সেক্স। কিন্তু আমরা এই ব্যাপার নিয়ে মুখ টিপে হাসি, বন্ধুরা ফাইজলামি করে কন্ডম কিনে দেয়। আরো যাবতীয় লজ্জা লজ্জা একটা এডভেঞ্চার কাজ করে অবিবাহিত ছেলেমেয়েদের। তেমনি মেয়েদের ঋতুস্রাব হয় এটা সবাই জানে। কিন্তু ব্যাপারটা এতোটাই নিগৃহীত যে, নারীরা নানান স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়লেও মুখ খুলতে চায় না। লুকিয়ে রেখে অসুখ বাড়ায়।

ট্যাবু ভাঙতে সব মেয়েকে তার প্যাডের ছবি সোশ্যাল সাইটে দিতে হবে না। কোনো প্রয়োজনও নাই। আর দিলেও মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। ব্যাপারটা ন্যাচারাল। তবে এটা যে ন্যাচারাল এবং লজ্জার কোনো ব্যাপার না, এটা অনেকেই মানতে চায় না। এই না মানার দলে নারীরা নিজেরাও আছে, আর পুরুষরা তো আছেই।

এবং এইজন্য একজন নারীকে মানুষের কাতার থেকে সরিয়ে দ্বিতীয় লিঙ্গ বানিয়ে পেছনের সারিতে রাখার যে প্রবণতা এটা থেকে বের হয়ে আসতে পারছে না, আমাদের সমাজ। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের নিয়ে লেখা, নারীর জন্য লেখা, এবং সমতা অর্জনের লড়াই তাই কঠিন, অসম্ভব কঠিন। এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় পুরুষতন্ত্রের ভাইরাসের শিকার হওয়া পুরুষরাও তাই পুরুষতান্ত্রিক, নারীরাও পুরুষতান্ত্রিক। তাই কবি লেখকের কলমে নারীর স্তন, নাভি, নিতম্ব, চোখ চুল কাব্যিক আর ঋতুস্রাব একটা ঘৃণ্য, মশকরার বিষয়। এটাকে মুখ টিপে হেসে, চোখ টিপে, গায়ে গুঁতো দিয়ে বলাটাতেই অনেকের আদিম আনন্দ।
ব্যাপারটা অসম্ভব লজ্জার, আর লজ্জা হইল নারীর ভূষণ। হায় লজ্জা, হায় লজ্জা।

শুধু স্বাস্থ্য সমস্যা তো আছেই, পিরিয়ড হলে একজন নারী নাকি অপবিত্র হয়ে যায়, এটা নিয়ে তর্ক করলে তো মুণ্ডুপাত করা হবে আমার। বাদ দিই। এইসব অচ্ছুৎ, অপবিত্র নারী আমরা, আমাদের স্পর্শেও অকল্যাণ হয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2
    Shares

লেখাটি ২,৮৭৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.