‘যে ব্যবস্থায় একজন দাসও আমার প্রভু’

0

শেখ তাসলিমা মুন:

একটি কথা প্রায়ই শুনি, আমি ‘নারীবাদী’ না আমি ‘মানুষবাদী’। বিষয়টি নারীরাই বেশি বলেন। এ ধরনের যত কমেন্টস আসে আমি খেয়াল করে দেখেছি পুরুষের ‘লাইক’ পড়ে ঝপাঝপ। পুরুষতন্ত্র আশ্বস্ত বোধ করে ‘নারীবাদ’ থেকে ‘মানুষবাদে’।

বিষয়টি মজার। ‘নারীবাদ’ এবং ‘পুরুষতন্ত্র’ দুটি শব্দ সমার্থক নয়। ‘বাদ’ এবং ‘তন্ত্র’ শব্দ দুটির অর্থ বিশ্লেষণ করলে বুঝবেন এটি একটি ‘সিস্টেমের’ বন্দিত্ব থেকে ‘বন্দিত্ব মোচনের’ বা এমানসিপেশনের যুদ্ধ। এ যুদ্ধে সামিল হতে নারীকে ‘মানুষ’ হয়ে বা ‘নারী’ হয়ে কোনটা হয়ে সামিল হতে হবে সেটি কোন অর্থ বহন করে না। এটি একটি একটি সিস্টেমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। একইভাবে একজন পুরুষও এ যুদ্ধে সামিল হতে পারেন ‘পুরুষ’ বা ‘মানুষ’ হয়ে। সেজন্য ‘নারীবাদ’
‘অ্যাজ অ্যা ডক্ট্রিন’কে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। এটি এখন একটি বড় প্রতিষ্ঠান।

নারী এবং পুরুষ উভয়কে আলোকিত হতে নলেজের এ শাখাটিকে অবশ্যই জানতে হবে। শিক্ষায় এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করাও জরুরি। আমাদের দেশের কিশোর ছেলেদের এ বিষয়টি জেনে বড় হওইয়া সব থেকে দরকারি। এর ইতিবাচক ভূমিকা সব থেকে বেশি।

সমাজের অসঙ্গতি অনেকেই অনুভব করছেন। সেটি তুলেও ধরছেন। সমস্যাটি উপলোব্ধ হওয়াটা দরকারি। সেটি একটি সমস্যাকে আইডেন্টিফাই করার প্রথম ধাপ। সেটিকে তুলে ধরা আরেকটি ধাপ। সেটির কারনকে জানা আরও একটি ধাপ। এবং তার সমাধানের জন্য কাজ করা আরও একটি ধাপ। এখন অনেকে অসঙ্গতির বিষয়টি বলছেন। সোচ্চার হচ্ছেন। এটি খুবই আশার কথা। একটি সমস্যা এক্সিস্ট করে এটি যত তুলে ধরা হবে, তত সমস্যাগুলো সমাধানের ধাপগুলোর কাছাকাছি আসবে।

‘নারীবাদী’ কোন নেগেটিভ শব্দ নয়। বরং স্ত্যকার ভাবে ভাব্লে দেখবো নারীবাদী না হয়ে আমরা একটি পা ও রাখতে সক্ষম নই। সেটি জ্ঞাতে বা অজ্ঞাতে দুভাবেই হতে পারে। এটি আমাদের একটি র‍্যাশনাল জীবন যাপনের সাথে জড়িত। একটি সচেতন জীবন যাপনের সাথে সম্পর্কিত। আমি নিজে আমার তারুন্যে দুটি বড় বড় সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে বড় হয়ে উঠেছি। স্বৈরাচারের কাছে বন্দী ছিল আমার তারুণ্যে দুহাত। আমার হাতে হাতকড়া ছিল। এটি একটি সচেতনতার বিষয়। আর আমার বন্দী হাত দুটি মুক্ত করা ছিল আমার একমাত্র কাজ। এসময় যখন আমরা কাজ করতাম, তখন অনেককে বলতে শুনতাম ‘আমি রাজনীতি করি না, রাজনীতি আমি ঘৃণা করি।’ তখন আমাকে অনেকবার বলতে হয়েছে, এইযে তুমি রাজনীতি করোনা বললে, এটি তুমি না জেনে বললে। তোমার মাথার উপর একটি কঠিন সামরিক স্বৈরাচার। তুমি বন্দী। এ বন্দী অবস্থায় তুমি রাজনীতি পছন্দ করো কি করো না, সেটি কিছু ম্যাটার করে না। এ বন্দিত্বে তোমার জীবন। সেটা থেকে যুদ্ধ তুমি নিয়ত করছো, জেনে বা না জেনে। সেটি থেকে মুক্তির যুদ্ধ করতে ‘রাজনীতি’ করার যেমন দরকার নেই আবার ‘রাজনীতি’ থেকে বাইরে থাকারও কোন সুযোগ নেই। ২৪ বছর আমরা পাকিস্তানের কাছে বন্দী ছিলাম। আমরা এ ২৪ বছরের প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের অস্তিত্বের যুদ্ধ করেছি। একটি বন্দী জাতি কখনও রাজনীতির বাইরে নয়।

পৃথিবীতে মানুষের কল্যাণে রাষ্ট্রীয় কাঠামো তৈরি হয়েছে। আইন, বিচার বিষয়গুলো এসেছে। সেগুলো কেবল মানুষের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়নি। মানুষের তৈরি আইন মানুষেরা দখল করে নিজেদের সুবিধায় কুক্ষিগত করেছে। মানুষকেই সেটি ভাঙতে হয়েছে। আমরা আমেরিকার সিভিল রাইটস মুভমেন্টের দিকে তাকালেও দেখতে পাব কেবল গায়ের রঙ কালো সেজন্য একটি কালো মানুষ সমাজকে কি ভীষণ অত্যাচার করা হয়েছে। শত বছর চেপে থেকেছে সে বন্দিত্ব। সাউথ আফ্রিকায়ও Apartheid এ প্রাতিষ্ঠানিক রেসিয়াল সিস্টেম দেখতে পেয়েছি যা প্রতিটি কালো মানুষের নেকে চেপে থেকেছে ১৯৪৮ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। এ মুভমেন্টগুলো আমাদের চোখের সামনে আমরা দেখেছি। সিস্টেমের বিরুদ্ধে জয়লাভ করার ইতিহাসের সাথে আমরা অংশ নিয়েছি। নারীর নেকে যে ‘সিস্টেম’ চেপে আছে তাকে ভাঙার যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার সময়ই ‘মানুষ’বাদী পরিচয়টি জরুরি হয়ে পড়ে এবং বিষয়টিকে ঘোলা করার জন্য আরও একটু সময় ক্ষেপণ করা হয়।

একজন কৃষ্ণবর্ণের নারী একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন নারীর যুদ্ধ মন্থর হয় অনেকগুলো কারণে। সিভিল মুভমেন্টের কংক্রিট উদাহরণ দিয়ে তিনি বলছিলেন, ‘আমার কৃষ্ণবর্ণের স্বামীর দাসত্ব ‘সাদা বর্ণের শাসকদের’ কাছে। সে যুদ্ধ করছে সে শাসকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু আমার প্রভু অনেক। শাসক, শাসকদের প্রণীত আইন ও বিবিধ তন্ত্রের বিরুদ্ধে। যে ‘সাদা শাসকদের দাস’ আমার কালো বর্ণের ‘স্বামী’, আমি সেই নিপীড়িত মানুষটির কাছে নিপীড়িত। সারাদিনের নিপীড়ন শেষে যখন সে ঘরে ফেরে, নিপীড়ন করার জন্য সেও একজন ‘কৃষ্ণ বর্ণের’ নারী পায়। সে আমি। সেও প্রভুত্ব করে আরেক নিপীড়িতের উপর। নারীর উপর। অর্থাৎ একজন নারী দাসেরও দাস। একজন দাসও আমার প্রভু’, আমার যুদ্ধ তাই অনেক বড়। আমার শাসক এভাবেই অনেক এবং অনেকে। আমার যুদ্ধ তাই অনেকগুলো ইন্সট্যান্সের বিরুদ্ধে।

স্টকহোম, সুইডেন
১৯ আগস্ট, ২০১৭

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ৬৭০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.