অবিবাহিত মেয়ে মানে কি ‘গনিমতের মাল’?

0

সেবিকা দেবনাথ:

অবিবাহিত মেয়ে মানে কি ‘গনিমতের মাল’? নাকি এই দেশে মেয়েদের বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নেয়াটা অপরাধের? অবশ্য ‘তবে’ ‘কিন্তু’র মারপ্যাঁচে যে দেশের আইনে বাল্যবিয়ে স্বীকৃত, সেই দেশে ৩৭ বছরেও একটি মেয়ে বিয়ে করছে না, এটি মোটেও স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে না। অপরাধের পর্যায়ে পড়ে কিনা তা আইনের লোকজন ভালো বলতে পারবেন।

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাই বলছি। নিজের অসুস্থতা বা অসুবিধার কথা কারও কাছে বলতে এখন রীতিমতো ভয় করে আমার। যার তার সঙ্গে আগ বাড়িয়ে এই বিষয়ে প্যানপ্যানানির স্বভাব আমার কোনকালেই ছিলো না। এখনও নাই। চিকুনগুনিয়া হবার পর অনেকেই সাক্ষাতে, ফোনে কিংবা ফেসবুকের ইনবক্সে জানতে চান এখন শরীর কেমন! ব্যথা আছে কিনা! এখনও যেহেতু পুরোপুরি সুস্থ হইনি, তাই তাদের প্রশ্নের উত্তরে ‘এইতো আছি’ কিংবা ‘ঠেলে-ঠুলে কোন রকমে চলে যাচ্ছে’ বলে উত্তর দেই। সমবেদনা জানানোর ছলে এই সুযোগে অনেকেই বুঝিয়ে দেন, ‘বিয়ে’ ও ‘বর’-এর উপকারিতা। অসুস্থতা, মন খারাপ কিংবা জীবনের যেকোনো সমস্যার সঙ্গেই তারা ‘বিয়ে’কে জড়িয়ে ফেলেন। শুধু তা-ই নয়, উপদেশের বন্যায় ভাসানোর পাশাপাশি কিছু বাজে ইঙ্গিতও করেন।

আমাদের আশেপাশে এমন অনেক ভাই আছেন যারা মেয়েদের অধিকারের দাবিতে বক্তৃতা দিয়ে বেড়ান। সমস্যার কথা বললে মাথায় হাত দিয়ে স্নেহের পরশ বুলিয়ে (এখন সন্দেহ হয় ওটা আসলে স্নেহের পরশ থাকে কীনা!) সান্ত্বনা দেন কিংবা সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেন। ভদ্রতার সুযোগ নিয়ে তাদেরই কেউ কেউ ফেসবুকের ইনবক্সে কিংবা কথার ঠারে ঠুরে জৈবিক চাহিদার ক্লাস নিতে চান।

সপ্তাহখানেক আগে সিনিয়র এক সাংবাদিক ভাই, সাংবাদিক মহলে যার ভালো ইমেজও রয়েছে এবং আমিও তাকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতাম, তিনি ফেসবুকের ইনবক্সে জানতে চাইলেন কেমন আছি, শরীর কেমন। বললাম, এইতো ভাই চলে যাচ্ছে। তিনি উপদেশের ঝুড়ি খুলে বসলেন। স্বাভাবিক কথার এক পর্যায়ে তিনি বললেন ‘তোমাকে দেখে অনেকেই কন্ট্রোল হারায়। আচ্ছা তোমার সেক্স (উনি যে শব্দটা ব্যবহার করেছেন আমি সেই শব্দটাই রাখলাম) করতে ইচ্ছা করে না?’

এমন প্রশ্নের উত্তরে কী বলা যায়, তাৎক্ষণিকভাবে আমার মাথায় এলো না। শ্রদ্ধার জায়গাটা টলতে লাগলো। চিকুনগুনিয়া হবার পর থেকে আমার বমির সমস্যা বেড়েছে। সিনিয়র ওই ভাইয়ের কথায় অপমানে আমার গা গুলিয়ে বমি এলো। তবুও বললাম, ‘ভাই আপানার আইডি বোধ হয় হ্যাক হইছে। তা না হলে এমন কথা আপনি বলতে পারেন না।’ আমার এ কথায় উনি তখন দুঃখের সাগরে ভাসতে শুরু করলেন। আমি যেন কথাটির অন্য মানে না করি, সেজন্য বহুত অনুনয়-বিনয় করতে লাগলেন।

আমি তার কথার আর কোনো উত্তর দেইনি। অপমানে বমির মাত্রা বেড়ে গেলো। সেই থেকে এখনও ওই কথাটা মনে হলে গা গুলায়। পরে দেখলাম উনি আমাকে ব্লক করেছেন। হাই প্রোফাইলের ওই সিনিয়র ভাই ব্লক করায় আমি কষ্টের সাগরে ভাসছি এমনটা নয়। কেননা তার এবং আমার মধ্যকার কথপোকথনের স্ক্রিনশট আমি রেখেছি। ভবিষ্যতে যদি কখনও দেখা হয় (যেহেতু একই পেশায় আছি, দেখা হবেই) ইচ্ছা আছে তার সঙ্গে দুই’একটা কথা বলার। বলবো, ‘একা থাকার সিদ্ধান্ত নিতে সাহস লাগে ভাই। আর জৈবিক চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করতে পারাটাও যোগ্যতার ব্যাপার। আপনার সেই সাহস বা যোগ্যতা কোনটাই নাই। অন্তত আমার তাই মনে হয়।’

তিন দিন আগে আরেকজন সাংবাদিক বড় ভাইয়ের সঙ্গে বাসে দেখা। আমার পাশের সিট ফাঁকা পেয়ে তিনি বসলেন। কুশল বিনিময়সহ আমাদের কমিউনিটির নানা বিষয়ে কথা হচ্ছিলো। এক সময় তিনি বহু মূল্যমানের সেই প্রশ্ন করলেন। জানতে চাইলেন, কেন বিয়ে করছি না। বাসা থেকে এ বিষয়ে কোনো চাপ নেই নাকি, আমাদের সমাজে এভাবে থাকা যায় না, ইত্যাদি ইত্যাদি এবং ইত্যাদি।

সর্বশেষে তিনি বললেন, ‘তুমি কি জানো, আমি যখন বিয়ের পাত্রী খুঁজছিলাম কয়েকজন তোমার কথা বলেছিলো। তুমি নারীবাদী, প্রতিবাদী তাই তোমাকে বলার সাহস হয়নি।’ এটুকু ঠিক ছিলো। কিন্তু পরে উনি বললেন, ‘আচ্ছা তোমার কি কোনো চাহিদা নাই?’ যোগান-চাহিদা অর্থনীতির বিষয়। কিন্তু তিনি কোন চাহিদার কথা জানতে চেয়েছেন, তা বুঝতে একটু সময় লাগলো আমার। যখন বুঝলাম তখন বাস ব্রেক করেনি, কিন্তু আমি ঝাঁকুনি খেলাম। আমি শক্ত হয়ে বসে থেকে গন্তব্যের আগেই নেমে গেলাম। এ কথা শোনার পর বাসভর্তি মানুষের সামনে ওই লোকটিকে হয়তো ঠাস করে চড় মারা উচিত ছিলো আমার। কিন্তু সেই কাজটি আমি করতে পারিনি। এটি আমার ব্যর্থতা। অথচ অন্যকে লাঞ্ছিত হতে দেখে রাস্তাঘাটে প্রতিবাদ বা মারপিটের রেকর্ড আমার আছে। কিন্তু সেদিন আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। মনে পড়লো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা। তিনি বলেছিলেন, ‘যে কাজের জন্য অন্যকে বাহবা দেয়া যায়, তা যখন নিজের বেলায় ঘটে তখন যেন মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়ে’। বাস থেকে নেমে কাঁদতে কাঁদতে আমি অফিস এলাম।

যারা সচেতন সমাজের অংশ বলে নিজেদের দাবি করেন, সেই সাংবাদিক সমাজেও আছে নিকৃষ্ট কীট। আর তাদের খালি চোখেই দেখা যায়। ছোটবেলায় একটা প্রবাদ শুনতাম, ‘যার বিয়া তার খবর নাই; পাড়া পড়শির ঘুম নাই’। এই পাড়া পড়শির সংজ্ঞার বিস্তৃতি বেড়েছে। আমি বিয়ে করবো কী করবো না, সেটি সম্পূর্ণই আমার ব্যক্তিগত বিষয়। আমি তো এমন কোনো কাজ করি না, যাতে সমাজ কলুষিত হয়; বিয়ে করছি না বলে কারও কাছে কাঁদুনেও গাইছি না; তাহলে তাদের এতো গাত্রদাহ কেন? কেন এতো কৌতুহল? মেয়ে দেখলে যারা নিজের ইন্দ্রিয়কে সংযত রাখতে পারে না, হামলে পড়তে চায়, তাদের উচিত বানপ্রস্থে যাওয়া কিংবা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া। তারা আর যাই হোক, সুস্থ মানুষ হতে পারে না। অন্তত আমার তাই মনে হয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.7K
  •  
  •  
  • 4
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.7K
    Shares

লেখাটি ৪,৩৯৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.