সমতাবাদী নারীর সঙ্গে ‘সমাজের’ দ্বৈত আচরণ

সুচিত্রা সরকার:

পৃথিবী, রাষ্ট্র, সমাজ। তোমার-আমার, আমাদের, সকলের। সকলের বলতে, একেবারে সবার! বুড়ো, ছোকরা, জোয়ান, শিশু, পুত্র, কন্যা- সক্কলের! এটাই ভবিতব্য! নইলে প্রকৃতিতে এত বৈচিত্র্য কেন! কাউকে ছাড়া যদি কারো চলতো, তবে তো চলেই যেত। ছক্কা গাড়ির মতো!

না, এরকম চলবার নিয়ম নেই! জো নেই! তাই নারী-পুরুষকে মিলেই সমাজ গড়তে হয়! সমান নিষ্ঠা দিয়ে। সমান পরিশ্রম দিয়ে। আর সকলের মিলিত প্রচেষ্টাতেই একটা সুন্দর সমাজ গড়ে ওঠে। আদর্শ সমাজ গড়ে ওঠে।

তবু এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বৈষম্যটাই যেন স্বাভাবিক চিত্র। সমাজের নিয়ম। এ দেখে দেখে, সকলের গা সয়ে গেছে। এই ‘তাসের দেশ’ই যেন ভবিতব্য!

‘চলো নিয়ম মতে। দূরে তাকিয়ো নাকো, ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো’!

তবু সকলে এই নিয়মগুলো মানতে পারে না। আটকে যায় মাঝপথে! দূরে তাকায়! প্রশ্ন তোলে। তর্ক করে ঘাড় বাঁকিয়ে! মার খায়। লড়াই করে! বঞ্চিত হয়!

লিঙ্গবৈষ্যমের লড়াইয়ের লড়াকু মানুষগুলোর মধ্যে পুরুষের সঙ্গে আছেন হাজার হাজার নারী!
নারীরাই এই লড়াইয়ে অগ্রগামী, কারণ তারাই বঞ্চিতশ্রৈণি! বৈষম্যের শিকার! পুরুষদের চেয়ে তারা এটা আরো কাছ থেকে দেখেন। অনুভব করেন! বোঝেন।

আজ কথা বলি, এই নারীদের নিয়ে! যারা কূল হারায়, আবার মানও! সমতাবাদী নারীদের কথা।
কী হয় তাদের সঙ্গে?

পরিবারের কথা যদি ধরি!
পরিবারে মেয়েটি, বৈষম্যটাকে আঙ্গুল তুলে দেখালে, পরিবার ভুল বোঝে। কারণ ‘তাসের পরিবারে’ এটাই হয়ে এসেছে আজ অবধি!
মেয়েটিকে কেটে দেয়া গণ্ডি পেরোতে চাইলে মেয়েটি হয়ে যায় নির্লজ্জ! বেহায়া! পরিবারের নাক কাটা যায় আরকি!

আবার এই মেয়েটিই পরিবারের বিপদে এগিয়ে আসে সবার আগে। বুকে টেনে নেয়! সমাজের চারপাশের মানুষের ভালো-মন্দ দেখে বেড়ায়! শুধু লিঙ্গ প্রশ্নে নয়, যেকোনো অন্যায় অবিচারে, মেয়েটি সামনের কাতারে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে! কারণ সে ‘নিয়ম মানা সমাজ’ এর চেয়ে বেশি অগ্রসর!

তো, এই প্রতিবাদের ফলে হয়তো কখনো কোনো সুফল আসে! আর তাতে, যে মানুষটি গতকাল মেয়েটিকে গালি দিয়েছিল, আজ তার ‘প্রতিবাদ’কে সাধুবাদ জানায়! কারণ তাতে মানুষটির লাভ হয়েছে। হয়তো কোন বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছে!

এটা কি সমাজের, ডাবল স্ট্যান্ড নয়?

পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেম দেখতে দেখতে অনেক নারী এটাকেই স্বাভাবিক মনে করে। ‘সমতা চাওয়া নারী’ তখন পিতৃতান্ত্রিক নিয়ম রক্ষা করে যে নারী, তার শত্রু হয়ে ওঠে।
তারপর যখন কোনো একদিন, নারীপুরুষের বৈষম্য দূর হয়ে যায় সমাজ থেকে (অগ্রসর চিন্তাই করলাম), সেই ‘পুরুষতান্ত্রিক নারী’টি কি ওই সাফল্য ভোগ করবে না? বৈষম্যকে একাই বহন করে নিয়ে যাবে? হলফ করে বলতে পারি, সেই নারী খুশি হবে। আনন্দে নাচবে! সমতার ভাগীদার হবে!
তবে? তখন কেমন করে, সমতাবাদী নারীটিকে মেনে নেবে! ‘কনের ঘরে পিসি আর বরের ঘরের মাসি’ প্রবাদটা কি পুরুষতান্ত্রিক নারীর জন্যই?

সমতাবাদী নারীর প্রেমিক, সে কেমন? নারীর সংগ্রামটা বোঝে? নাকি, নারীটি যেহেতু অন্য মেয়েদের চেয়ে আলাদা, সেটা উপভোগ করে? আনকোরা যেকোনো জিনিসের মতো? কখনো সখনো কি প্রচলিত নিয়মে, সেই পুরুষও নারীটিকে আটকে ফেলে না?

এটা কি দ্বৈত আচরণ নয়?

সেই ‘সমতাবাদী’ নারীর বর কেমন? নারীটির সঙ্গে একই কাতারে দাঁড়িয়ে লড়াই করে? পাশে থেকে? নাকি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখে! আর পিতৃতান্ত্রিক সিস্টেমের কূটনীতি নারীটির উপর প্রয়োগ করে! আর মুখে বলে, তুমি তো এসবের তোয়াক্কা করো না!

দ্বৈত আচরণ একে বলে কি?

উত্তরটি দিতে হবে না। উত্তর জানা আছে। এর নাম সুবিধাবাদ।

দেশের কথাই ধরি! দেশে দুর্যোগ হয়, মুক্তিযুদ্ধের ফসল সংকটে পড়ে। বিদেশি বেনিয়া তেল গ্যাস লুটে নেয়। ধর্মের ধ্বজায় মানুষের ত্রাহিরব! তখন এই ‘সমতাবাদী’ নারীটিই অন্যদের সঙ্গে লড়াইগুলোতে শামিল হয়! রুখে দাঁড়ায়!

মিছিলে, আন্দোলনে, সংগ্রামে এই নারীরা শুধু- সংখ্যাই বাড়ায়! ওদের আর কোনো উপযোগিতা নেই! যদি থাকতো, তবে ওই মিছিলের, আন্দোলনের, সংগ্রামের পুরুষ সাথীরা ‘নারী কোটা’য় তাকে ফেলতো না!

যদি থাকতো, নারী বঞ্চনার প্রশ্নে, অন্তত এই মিছিলের মানুষগুলো দ্বিধাবিভক্ত হতো না!

যদি থাকতো, তবে পদবন্টনের সময়, নারীটির ‘নারী’ পরিচয় মুখ্য হয়ে দাঁড়াতো না!
আর নারীটির জন্য সাংস্কৃতিক সম্পাদক, ত্রাণ সম্পাদক, কোষাদক্ষ, সহ সম্পাদক, সহ সভাপতির পদ তার জন্য বরাদ্দ হতো না! কারণ পিতৃতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলগুলো জানে, এই নারীদের মিছিল করা ছাড়া, শ্রম দেয়া ছাড়া আর কোনো উপযোগিতা নেই। তাই প্রধান প্রধান পদের সিলেকশনের সময় পুরুষ সদস্যদের মুখোশটা খসে পড়ে! বেরিয়ে আসে তাদের জলজ্যান্ত ‘পুরুষ’ মুখ! কীভাবে সেই নারীটিকে দমিয়ে রাখা যাবে, চলে তার পাঁয়তারা! চিরকালের শত্রুও তখন ‘আদা কাঁচকলা’!

আর অতীতে যে নারীটি দলের জন্য গর্বের ছিল, দেশের জন্য গর্বের ছিল, সেই নারীটিই দৌড়ে পালায় (‘সুবোধ তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না)!

কারণ ‘সমাজের’ দ্বৈত আচরণ দেখে দেখে সে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে!

১৪.৮.২০১৭
লালবাগ, ঢাকা
সন্ধ্যা ৭.৩৬ মিনিট

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.