পুরুষ-মুক্তির এই মিছিলের পা হোন আপনিও

ইশরাত জাহান ঊর্মি:

এ পৃথিবীতে কিছু কিছু মানুষ থাকেন-জীবন তাদের দিকে যতই বিষ্ঠা ছুঁড়ে দিক, তারা তা হীরায় রূপান্তরিত করেন।
তাঁর এক বন্ধু সম্পর্কে বলেছিলেন আমার একজন প্রিয় মানুষ।

প্রতিদিন অব্যাহত নারীবাদের বিরোধিতা আর নারীদের সমানে দম রেখে আক্রমণ প্রতিহত করা দেখে আমার এই কথাটা মনে পড়ে। গত কয়েক বছরে যা কিছু লেখালেখি অনলাইনে, যা কিছু ফয়সালা রাস্তায়, যত নারী ধর্ষণ আর খুনের বিরুদ্ধে রুখে ওঠা, সংসার আর সমাজের যত অবিচারের জবাব দিতে চেষ্টা করা-তার সবকিছুকে প্রবল প্রতাপে দুমড়ে মুচড়ে ফেলার পুরুষতান্ত্রিক কায়দা-কানুনকে সাধ্য অনুযায়ী চ্যালেঞ্জ করে চলেছেন গুটিকয়েক নারী। তাদেরকে “পরকীয়া করা বেশ্যা” “মাগী” “মাসিক বন্ধ হওয়া যৌনপল্লীর মাসী”, “পুরুষের সোহাগ না পাওয়ায় মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া” কুৎসিত চেহারা, কিটিপার্টি, লিপিস্টিকবাদী, চ্যাপ্টারয়েড, অবলা অধ্যায়-এরকম হাজারও বিশেষণেও দমানো যাচ্ছে না।

যতোকিছুই বলা হোক, প্রাথমিক ঘোর কাটিয়ে আবারও তেড়েফুঁড়ে উঠছেন নারীরা, গুছিয়ে উত্তর দিচ্ছেন আক্রমণের।এইটাও হয়তো সহ্য করা পুরুষদের পক্ষে খুবই কষ্টকর। কত কত ইনোভেটিভ আইডিয়ায় যে আক্রান্ত করা হচ্ছে তাদের। এইসব ইনোভেশন যদি নারীর মুক্তির জন্য কাজে লাগাতেন তারা, তবে এদেশের চেহারাটা পাল্টে যেত। এইসব সৃষ্টিশীল পুরুষ এবং নারী শরীর আর চেহারার পুরুষতন্ত্রের দারুণ ধারক-বাহক কিছু নারীর কাছেও আমাদের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু সম্ভবত বাংলা অনলাইনে ফয়সালা আরও আগেই হয়ে গিয়েছে। নারীর জীবন আর নারীবাদ প্রসংগে অবিশ্বাসীরা মুমিনদের মতোই গভীর অথবা নিজের প্রয়োজন বুঝে বিশ্বাসী। এইখানে নাস্তিক-আস্তিক এর সকল ব্যবধান-বিভেদ ঘুচে গেছে। এইখানে তাদের ব্রাদারহুড বিস্ময় জাগানীয়া।

তো স্যাম রহমান অথবা নয়ন চ্যাটার্জী অথবা আরও আরও সুশিক্ষিত, নীতিবান, রসিক, যুক্তিবাদী পুরুষ অথবা নিরীহ পুরুষ, যারা নারীকে একটা নির্দিষ্ট ফর্মে ফেলে সম্মান করে, এর বাইরে গেলেই নারী এভয়ডেবল হয়ে যায়-এদের কারো কোন বক্তব্যেই আমি অন্তত অবাক হই না। কখনও সখনও সিক ফিল করি। আবার ঠিকও হয়ে যায়।
তবে একটা অদ্ভুত ফিলিং হয়। নারীবাদ আন্দোলনের তো একটা ইতিহাস আছে।

উনিশ শতকের শুরু থেকে বিশ শতকের শুরুর সময়টা ধরেন। এইসময় নারীবাদ আর শ্রমজীবী আন্দোলন হাত ধরাধরি করে চলেছে। নারীদের সম স্বার্থ আর মানুষের সম অধিকারের শ্লোগান একসাথে উচ্চারিত হয়েছে। ভোট দেয়ার অধিকার থেকে শুরু করে বিয়ে আর বিয়ে বিচ্ছেদ, উত্তরাধিকার, সম্পত্তির অধিকার এইসব নিয়ে আন্দোলন চলেছে সমানতালে। আর এই আন্দোলনে শুধু নারীরা সামিল হয়েছিলেন কি? না তো। পুরুষরাও ছিলেন মিছিলের পা। জন স্টুয়ার্ট মিল, উইলিয়াম টমসন, মার্কস-এ্যাঙ্গেলস, অগাস্ট বেবেল অথবা হেনরিক ইবসেন। আর এই উপমহাদেশে রাজা রামমোহন রায়,ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তারা তবে কীভাবে নারীমুক্তি চেয়েছিলেন? কেন চেয়েছিলেন?

তারা নারীর মুক্তি যেভাবে চেয়েছিলেন, যাদের থেকে চেয়েছিলেন- তাদের থেকে, সেই সময় আর সমাজ থেকে এখনকার সমাজ আর নির্যাতন করা পুরুষেরা কি খুব আলাদা? নারীবাদ কী এবং কেন, পুরুষতন্ত্র কাহাকে বলে, এইসব আমরা প্রতিদিন লিখছি। লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে যাচ্ছে, বলতে বলতে চোয়াল ধরে আসছে, তারপরও প্রতিদিন যেন নতুন করে শুরু করতে হয়। নারীবাদ কোন একক ধারণা নয়। পৃথিবীর আরও অনেক আদর্শের মতো এই তত্ত্বেরও নানান ধারা উপধারা আছে।

তবে মূল কথা তো একই- নারীর উপর থেকে পুরুষের কর্তৃত্ব আধিপত্য, শোষণ-শাসন এবং নিয়ন্ত্রণের অবসান। শুধু নারীর উপর থেকে কেন, নারীবাদ তো একথাও বলে যে, পুরুষেরাও মুক্ত হোক যেকোনো অত্যাচারী ক্ষমতার কাঠামো থেকে। পুরুষরা কাঁদতে পারবে না, নাচতে পারবে না, তাদেরকে বাধ্যতামূলক আয় করতে হবে, সংসার চালাতে হবে, দায়-দায়িত্ব নিতে বাধ্য হতে হবে-এইসব থেকে পুরুষকেও মুক্ত করতে চায় নারীবাদ।

কিন্তু এইসব কথা, এইসব লেখা কেন সমাজের পুরুষদের পছন্দ হয় না সেটা বিস্ময়। অথচ নারীর মুক্ত হওয়ার এই আন্দোলনে পুরুষদের অংশগ্রহণ দরকার। যে যেভাবে পারেন। কারোর হয়তো উইম্যান চ্যাপ্টারের “সুখী নারীবাদী”দের পছন্দ নয়, কারোর হয়তো স্বামীর সংসার করা নারীবাদী পছন্দ নয়, কারোর হয়তো পরকীয়া করা নারীবাদী পছন্দ নয়, কারোর হয়তো অসুন্দর নারীবাদী পছন্দ নয়, কারো হয়তো ধারালো কথাবার্তা বলা নারীবাদী পছন্দ নয়,কারোর হয়তো হাতকাটা ব্লাউজ পরা নারীবাদী পছন্দ নয়, কিন্তু ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ সরিয়ে রেখে এইটা যখন আন্দোলন, তখন পুরুষ- সেখানে মানুষ হিসেবে যুক্ত হোন আপনি।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.