ব্যক্তিগত ব্যাপারে আমরা হস্তক্ষেপ করার কে?

0

শ্রাবস্তী লাবণ্য:

“If you are neutral in situations of injustice, you have chosen the side of the oppressor.”

দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী ডেসমন্ড টুটুর এই উদ্ধৃতিটি প্রথম চোখে পড়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের স্মিথ কলেজে ব্যাচেলরস পড়বার সময় আমার পার্ট টাইম কাজ এর হেড এর অফিসে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গিয়েছিল আমার মেয়েবেলায় বহুবার শোনা দুটি কথা। তার একটি হলো, “এটা ওনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমরা এখানে হস্তক্ষেপ করবার কে” এবং অন্যটি “এক হাতে কখনো তালি বাজে না”।

আচ্ছা, আপনার পাশের বাড়িতে যদি একজন স্ত্রীকে পাশবিক ভাবে নির্যাতন করতে করতে তার হাজব্যান্ড (স্বামী শব্দটিতে আমার আপত্তি আছে) মেরেও ফেলে – তাহলেও কি আপনি বলবেন, যে এটা তাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার? কিংবা ধরুন, সতেরো ও আঠারোর দশকে ইউনাইটেড স্টেট্‌স এ আফ্রো-আমেরিকানদের ওপর বর্ণবিদ্বেষী সাদাদের অত্যাচার হয়েছিল – সেই ক্ষেত্রেও কি আপনি বলবেন যে, কালোরা নিশ্চয়ই কিছু করেছিলো, তাই সাদারা তাদের ওপর অত্যাচার করেছে?

আমার “বাবা” – মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় ১৯৯৯ সালে। আমি তখন খুব ছোট। উন্নত দেশগুলোতে Divorce খুব বড় ব্যাপার না হলেও, উন্নয়নশীল অন্ধকারাচ্ছন্ন এই দেশটাতে নারীর জন্য এটি এক বিস্ময়কর অধ্যায়। আর হিন্দু হলে তো কথাই নেই! বাংলাদেশে এখনো হিন্দুদের জন্যে Divorce নেই, শুধু legal separation আছে। হিন্দু আইন “স্বামী” এবং স্ত্রীকে জন্ম জন্মান্তরের জন্যে বেঁধে দেয় যে!

আমার “বাবা” বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির একজন ডাক্তার। সারা বাংলাদেশে তার জয়জয়কার। যারা তার পারিবারিক জীবন সম্পর্কে কিছু না জেনে তার গুণগান করে, তাদের বিরুদ্ধে আমার কোন অভিযোগ নেই। কারণ চিকিৎসক হিসেবে উনি যথোপযুক্তই। স্বভাবতই অর্থনৈতিক দিক থেকেও তিনি সফল। কিন্তু অবাক লাগে তখন, যখন মানুষ বিচারিক মানদণ্ডে তার একটা নিকৃষ্ট পারিবারিক চেহারাকে উপেক্ষা করে শুধু বাইরেরটুকু নিয়েই মেতে থাকে।

“বাবাকে” আমি আমার মা – যিনিও পেশায় একজন ডাক্তার – তো, মাকে চোখের সামনে পাশবিকভাবে নির্যাতন করতে দেখেছি। মাটিতে ফেলে পশুর মতো পারাতে দেখেছি। নিজের মায়ের কথায় যখন তখন আমার মাকে আমার চোখের সামনে কিল – ঘুষি মারতেও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। একটি কাহিনী এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। তখন আমার চার কি পাঁচ বছর বয়স, আর ভাই দুধের শিশু। রাত তখন দশ কি এগারোটা। মা সবে ভাইকে Cerelac খাওয়াতে বসেছেন। বিছানায় শুয়ে আমার চোখটা প্রায় বুঁজে এসেছিল। অমনি “বাবা” কীসের জন্য যেন ছুটে এসে Cerelac এর বাটিটি লাথি মেরে ফেলে দিলেন। মায়ের পেটে লাথি মেরে মাকে ধরাশায়ী করলেন। পশুর মতো মাকে পারালেন। মায়ের আর্ত – চিৎকারে আমি সেদিন ঘুম থেকে উঠে পড়েছিলাম। ভয়ে, সেই ছোট্ট আমি, মাকে বাবার কবল থেকে রক্ষা করবার সাহস পাইনি। আমি কাঁদতে কাঁদতে দৌড়ে গিয়ে লুকিয়েছিলাম আলমারির পাশে, আর হাত জোড় করে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেছিলাম তিনি যেন আমার মাকে বাঁচান।

“বাবার” অত্যাচারে সংসারে সাঙ্গ দিয়ে মা খুলনা থেকে চলে আসে চাঁদপুরে, বাবার বাড়িতে। সেখানেই নতুন করে শুরু হলো আমি, ভাই আর মায়ের নতুন পৃথিবী। আমাদের সংসার চলতে থাকলো একটু একটু করে মায়ের রোগী দেখার উপার্জনেই। আমাকেও ভর্তি করা হলো স্থানীয় একটি স্কুলে। অনেক প্রতিকূলতা সত্বেও দিনগুলো কাটছিল ভালোই। কিন্তু বাদ সাধে ছোট্ট জেলা শহরের পড়াশোনার মান। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার প্রতি ভীষণ আগ্রহ এবং উচ্চাশা ছিল আমার। তাই স্কুলে শিক্ষক শিক্ষিকাদের চরম অনান্তরিকতা এবং প্রহসন দেখে, ধৈর্য হারিয়ে মাকে বললাম “আমি কলকাতায় একটি ভালো ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়তে চাই”। মাও চাঁদপুরের স্কুল এর শিক্ষার মান নিয়ে সন্তুষ্ট ছিলেন না। তাই যারপরনাই চেষ্টা করে আমায় কলকাতায় খুব ভালো একটি স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন।

কলকাতায় দু বছর পড়বার পর আমায় বাংলাদেশে ফিরে আসতে হয়, কারণ আমায় কলকাতায় দেখাশোনা করবার মতো তেমন কেউ ছিল না। কলকাতায় পড়াতে পারলেও, বাংলাদেশের ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের খরচ চালিয়ে যাবার মতো সাধ্য মায়ের হবে কিনা, এ নিয়ে মা দুশ্চিন্তায় ছিলেন। শুধুমাত্র আমার ও আমার ভাইয়ের উন্নতমানের পড়াশুনোর ধারাবাহিকতা বজায় রাখবার জন্যে, একদিন যেই নরপিশাচটি মাকে নির্দয়ভাবে মেরেছিল, তার সাথেই মা একটি সমঝোতায় আসার চেষ্টা করে।

ফলে “বাবা” আমার ও আমার ভাইয়ের সামনে একটি শর্ত রাখে: “যদি আমি তোমাদের পড়াশুনোর খরচ বহন করি তবে তোমাদের আমার সাথে থাকতে হবে, কিন্তু তোমাদের মা তোমাদের সাথে এই বাড়িতে থাকতে পারবে না। যদি তোমরা তোমাদের মায়ের সাথে থাকতে চাও, তবে নির্দ্বিধায় থাকতে পারো, কিন্তু সেক্ষেত্রে তোমাদের পড়াশুনোর যাবতীয় খরচ আমি বহন করবো না।”

এক বুক আশা নিয়ে সেই ছোট্ট আমি ফিরে এসেছিলাম কলকাতা থেকে। ভেবেছিলাম এবার বুঝি মায়ের সাথে থেকেই ঢাকায় একটি ভালো স্কুলে আমি পড়তে পারবো। কিন্তু “বাবার” এই কথাতে মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল। পাশে থেকে আমাদের বড় করবার জন্যে মা বাবাকে এও বলেছিলেন যে দরকার হলে “বাবার” বাড়িতে তিনি ভাড়া দিয়ে থাকবেন, বাইরে খাবেন। তবুও “বাবাকে” মানানো যায়নি।

শুধুমাত্র পড়াশুনোর জন্য বাধ্য হয়েছিলাম এই অন্যায় আবদার মেনে নিতে। “বাবার” বাড়িতে তার ভাই – বোনদের, বোনের জামাইদের, ভাইবোনদের ছেলেমেয়েদের, বন্ধুদের, বান্ধবীদের অবাধ যাতায়াত ছিল। শুধু সেই বাড়িতে যাবার অনুমতি ছিল না আমার মায়ের। মায়ের সাথে যাতে যোগাযোগ না করতে পারি সেজন্যে বাসায় একটি ল্যান্ডফোনও লাগাননি “বাবা”। রাতের পর রাত না ঘুমিয়ে, মায়ের দেয়া ছোট্ট একটি Nokia ফোন দিয়ে মাকে ফোন করে সারারাত কাঁদতাম (সেই ফোনটিও একদিন ছুঁড়ে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন “বাবা”)। কিন্তু আমার সেই কান্না, একটি নিষ্পাপ শিশুর সেই আকুতি পৌঁছায়নি আমার “বাবার” কানে।

আমার কান্না সহ্য করতে না পেরে মা সব ছেড়ে চাঁদপুর থেকে চলে আসলেন ঢাকায়। আজিমপুরে বাসা নিলেন যাতে অন্তত উইকেন্ড এ মায়ের সাথে থাকাটা সম্ভব হয়। যা হবার হবে – বলে অবশেষে চলে এসেছিলাম মায়ের কাছে। চক্ষুলজ্জার ভয়ে “বাবা” স্কুলের বেতনটা বন্ধ করতে পারেননি। কিন্তু আমাদের থাকা খাওয়ার যাবতীয় খরচ মাকেই বহন করতে হতো। প্রতি সপ্তাহের শেষে চাঁদপুর যেতে হতো মাকে রোগী দেখতে। আজিমপুর থেকে সাত নম্বর বাস এ ঝুলে ঝুলে স্কুলে যেতাম, আসতাম আর আমাদের “বাবা” স্যুট-প্যান্ট পরে নিজের গাড়িতে চড়ে অ্যাপোলো হাসপাতালে যেতেন।
এভাবে চাঁদপুর-ঢাকা করা আর সম্ভব হলো না মায়ের পক্ষে। তাই ভাইকে ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজে ভর্তি করে মা চলে গেলেন চাঁদপুরে । স্কুল জীবনের শেষ প্রান্তে থাকার কারণে ভাইয়ের মতো ট্র্যাক বদলানো সম্ভব হয়নি আমার পক্ষে। পড়ে রইলাম আমি…….. “বাবার” সেই ঐশ্বর্যমণ্ডিত শ্মশানপুরীতে।

একা একা ওই বিশাল বাসাটাতে বিত্ত আর বৈভবের মাঝে আমার দম বন্ধ হয়ে আসতো। ঘরে একজন মহিলা সহায়তাকারী ছাড়া আর কেউ কথা বলার ছিল না। কতকিছুরই তো শরণাপন্ন হতে পারতাম নিজের দুঃখ ভুলবার জন্যে। সিগারেট খেতে পারতাম, মদ খেতে পারতাম, নেশা করতে পারতাম। কিন্তু আমার নিঃসঙ্গতার দিনগুলোতে আমায় বাঁচিয়েছিল আমার রবী ঠাকুর। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিলাম রবীর উপন্যাস, গান ও কবিতা। আমি হৃদয়ের কথা বলতে ব্যাকুল ছিলাম কিন্তু কেউ শুধাতে আসেনি।

আগের মতোই “বাবার” আত্মীয় – স্বজন, বন্ধু – বান্ধবরা প্রায়ই আসতো, মদের আড্ডায় মাততো, আর মাঝে মধ্যে এসে আমাকে দুই-এক কথা জিজ্ঞেস করবার পর বলে যেতো, আমার “বাবা” আমাকে কতোটা ভালবাসেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ একবারও আমায় আন্তরিকভাবে জিজ্ঞেস করেনি, আমি কেমন আছি, আমার মায়ের কথা মনে পড়ে কিনা! কেউ একবারও সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়নি। আমার “বাবা” দ্বিতীয় বিয়ে করবার পর সেই একই মানুষগুলো আমাকে বলেছে, আমার “বাবার” দ্বিতীয় স্ত্রী আমায় কতোটা ভালবাসে!!!

এতোকিছু হবার পরেও আমার মামার বাড়ির মানুষ এবং শুধুমাত্র একজন ডাক্তার (ডা. গুলশান আরা) ছাড়া একজন মানুষও এগিয়ে আসেননি আমাদের সহযোগিতায়। অনেককেই বলতে শুনেছি, “এটা ওনাদের পারিবারিক ব্যাপার, আমরা হস্তক্ষেপ করার কে?” আচ্ছা, যখন বিষয় একজন নারীকে শারীরিক অত্যাচার বা একটি শিশুকে মানসিকভাবে নির্যাতন করার কথায় পৌঁছায়, তখনও কি সেটা ব্যক্তিগত কথাতেই আটকে থাকে? তখন কি সেটা মানবাধিকার লঙ্ঘন এর আওতায় পৌঁছায় না?একজন নারীকে সাহায্য করার দায়িত্ব কি শুধুই তার পরিবারের বা একজন শিশুকে ভালোভাবে বড় করে তোলার দায়িত্ব কি শুধুই তার বাবা – মায়ের? এই সমাজের কি কোন দায়িত্ব নেই?

ধরুন, এই আমিই যদি নেশাগ্রস্থ হয়ে যেতাম বা নিজের হতাশার সাথে লড়াই করতে না পেরে একজন জঙ্গি হয়ে যেতাম, তখন কি আমি শুধু আমার পরিবারেরই ক্ষতি করতাম? এই সমাজের অসংখ্য ঘূণপোকার মাঝে কি আমিও বিলীন হয়ে যেতাম না? কিন্তু তখন সবাই শুধু আমাকে এবং আমার পরিবারকেই দোষারোপ করতো। নিজেরা যে একদিন “এটা ওনাদের ব্যক্তিগত ব্যাপার” বলে দায়িত্ব এড়িয়ে গিয়েছিল, সেটা কারো মনেও থাকতো না।

এদেশের আইন এবং এদেশের সমাজ যে শুধু দায়িত্বই এড়িয়েছে তা নয়, আমার “বাবাকে” পুরস্কৃতও করেছে আমার মাকে অত্যাচার করার জন্যে – আমার “বাবার” টাকার কাছে বিক্রি হয়ে, তাকে সোনার সিংহাসনে বসিয়ে, তার পা চেটে, আর আমার মাকে তিরস্কার করে। “একি তুমি শাঁখা সিঁদুর পরো না কেন?” – এ কথাও শুনতে হয়েছে মা’কে।

নিজের জীবন দিয়ে এই-ই শিখলাম যে, অন্যায়ের সাথে কখনো আপোস করতে নেই। সে যত গুরুত্বপূর্ণ কারণেই হোক না কেন। সেদিন যদি “বাবার” কথা না মেনে, নির্ভীক চিত্তে আমার মা আমাকে পড়াতে পারে এমন কোন একটি স্কুলে ভর্তি হয়ে যেতাম, তাহলেও আমি আজ যেখানে পৌঁছাতে পেরেছি, সেখানেই পৌঁছাতাম। ওপরে ওঠার জন্যে শুধু মনের জোরটাই যথেষ্ট। একটু উন্নতমানের শিক্ষার জন্যে নিজে কষ্ট পেয়েছি, মাকেও কষ্ট দিয়েছি।

নিজের স্ত্রীদের ওপর শারীরিক অত্যাচার শুধু রিকশাওয়ালারাই করে না। এ সমাজের অনেক বড় বড় ব্যক্তিরাও করে থাকেন। তফাত শুধু এই যে রিকশাওয়ালাদের কাহিনীগুলো সংবাদপত্রে ওঠে, বড় বড় ব্যক্তিদেরটা ওঠে না।

খারাপ স্মৃতিগুলোকে চাইলেই উপড়ে ফেলে দেয়া যায় না! সেই স্মৃতিগুলো তাড়িয়ে বেড়ায় কখনো স্বপ্নের মধ্যে, কখনো অজান্তেই চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরা জলের মধ্যে বা কখনো অযথাই মন খারাপ হবার মাধ্যমে। কতবার কেঁদে বালিশ ভিজিয়েছি, কতবার মাঝরাতে খারাপ স্বপ্ন দেখে আঁতকে উঠেছি।

আজও বালিশ ভেজাই, আজও খারাপ স্বপ্ন দেখে মাঝরাতে আঁতকে উঠি……।

লেখাটি ৩,৮০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.