নারীর যোনি ও জরায়ু; পুরুষের হাজার বছরের নাইটমেয়ার

0
শেখ তাসলিমা মুন:
Being able to make our own decisions about our health, body and sexual life is a basic human right.
কী একটা পোর্টালে আমার একটি লেখার ‘ইচ্ছে শিরোনাম’ করে বেশ গালাগালের বাজার তৈরি করেছে দেখে ব্যাপক হাসলাম। আসলে তারা তাদের নিজেদের অজান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে হাইলাইট করে ফেলেছে, যা আসলে আমারই লেখা উচিত ছিল।
যেহেতু আমার লেখার বিষয়বস্তু ছিল ভিন্ন, সেজন্য এ বিষয়ে আমি দুটি লাইনের বেশি উল্লেখ করিনি। লিখেছিলাম নারী বা পুরুষ কেউই পরস্পরের যৌনাঙ্গ ওউন করে না। তারা বিষয়টি থেকে বিকৃত উল্লাস আনতে নিজেদের অজান্তে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। আর এটাকেই বলে Freudian slip। তবে মন্দ মানসিকতায় একটি পজিটিভ বিষয়কে সামনে আনায় আমার বেশ আনন্দ হচ্ছে।
হাতুড়ে জ্ঞান নিয়ে কিছু লেখা বা প্রতিক্রিয়া জানানো মানুষগুলোকে কিছু বলতে ইচ্ছে করছে না। নারীর ‘যোনি ও জরায়ুর’ উপর নারীর আপন সিদ্ধান্তের বিষয়টি এই অজ্ঞাত অধম শেখ তাসলিমা মুন প্রথমবারের মত ইন্ট্রোডিউস করেনি। এটি একটি অনেক পুরনো স্বীকৃত, প্রতিষ্ঠিত মুভমেন্ট। আর এটি নিয়ে বিশ্বের সকল নারী সোচ্চার হয়েছে আজ নয়, কয়েক দশক ধরে। আজ এ অধিকার বিশ্বের সকল উন্নত রাষ্ট্র, উন্নত সমাজ, পরিবার, আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো সবিনয়ে মেনে নিয়েছে। যে দেশটি শতাব্দী কাল পিছিয়ে আছে সে আমাদের দেশ এবং দেশরত্ন ভ্রাতা- ভগ্নিগণ। আর নিজেদের অজ্ঞানতার শরিক করছে আরও কিছু সবুজ নবীন মানুষদের। তবে এ বিষয়ে আমার কোনো বক্তব্য আসলেই নেই। আমি বিশ্বাস করি, মানুষের ধারণা বদলায় যখন সময় ম্যাচিওর হয়। এটা নিয়ে ধস্তাধস্তির দরকার নেই। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন সময়ের দাবি মাত্র।
‘নারীর যোনি ও জরায়ু’ নিয়ে সমাজের পুরোহিতদের উদ্বেগ মনে হয় একটি অতি প্রাচীন উদ্বেগ। এখানে পুরুষ তাঁদের নিজের অসহায়ত্ব অনুভব করেছে শতভাগ। প্রজনন প্রক্রিয়ার এই মেকানিজম আসলে নারীর হাতে এটা তাদেরকে অসহায় করেছে। ঘায়েল করেছে। তারা এখানে শক্তিহীন অনুভব করার কারণেই নারীর শরীর কুক্ষিগত করেছে বহুবিধ উপায়ে। নারীর শরীর এভাবে শাসক শ্রেণির কাছে চলে গেছে। এবং অবশ্যই পুরুষ শাসিত শাসকশ্রেণীর কথাই আমি বলছি।
মূলত গোত্র ও বংশ চিন্তায় মানুষ বিবাহ ভাবনা ভাবে। আর এই বিবাহ ও গোত্র সামজের প্রথম বলি নারী। নারীর শরীর। আপন শরীরের মালিক হয়েও নারীর প্রজনন প্রক্রিয়ায় সে তার নিজের শরীরের প্রতি ক্ষমতা হারায়। সকল ক্ষমতা চর্চা তার শরীরে কায়েম করে পুরুষ। নারীর এ ঐতিহাসিক পরাজয় নারীর সাধিত হয় পুরুষ এবং সামাজের পেশী শক্তির বলে। হাজার বছর ধরে নারীর যৌন এবং প্রজনন রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, ধর্মিয়ভাবে পোক্ত করা হয় নারীর বিরুদ্ধে।
মূলত নারীর যৌন ও প্রজনন পরিচালিত করতে গিয়ে পুরুষ বুঝতে পেরেছে, তারা যত নারীর শরীর, লিঙ্গ কুক্ষিগত করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে, তত তারা ব্যর্থ হয়েছে। তারা শতভাবে, শতভাগ নারীর সেক্সুয়ালিটিতে মালিকানা আরোপ করেও নিশ্চিত হতে পারেনি। সন্তানের পিতৃত্ব বিষয়ে তারা সম্পূর্ণ স্বস্তি পায়নি। ১০০ ভাগ নিশ্চিত হতে পারেনি। সে-ই সন্তানের পিতা এটা নিশ্চিত হতে তাকে নারীর মুখাপেক্ষিই হতে হয়েছে। মুখাপেক্ষি থাকতে হয়েছে। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের দোলাচলে তাকে জীবন যাপন করতে হয়েছে। আর তার অনিশ্চয়তা যতো তাকে অক্ষম করেছে, ততো সে নারীর দেহের মালিকানা চেয়েছে। যত অসহায় বোধ করেছে, অক্ষম বোধ করেছে, ততো সে নারীর দেহের প্রতি আক্রোশে ফেটে পড়েছে।
নারীর দেহের প্রতি ক্ষমতা প্রদর্শনের মানসিকতা সে কারণে সব চাইতে পুরাতন এক সন্ত্রাস যা পুরুষতন্ত্রের পরিচয় নিয়ে আত্মভরে টিকে আছে। নারীকে জৈবিক লিঙ্গের থেকে সামাজিক লিঙ্গেই নারীকে বেড়ে উঠতে হয়। আর এটি নির্ধারণ করেছে মানুষ। নারী তার শরীর হারায় পুরুষ, সমাজ রাষ্ট্র ও ধর্মের বিধানের কাছে। কিন্তু আজকের নারী তার শরীরের প্রতি তার নিজস্ব অধিকার ঘোষণা করেছে। সে বুঝতে শিখেছে তার উপর সে ছাড়া অন্য কেউ অধিকার রাখে না। তার শরীরের প্রতি অধিকার সম্পূর্ণ তার। পুরুষ, সমাজ, রাষ্ট্র বা কোন বায়বীয় ক্ষমতার কাছে কুক্ষিগত নয় তার শরীর। এই বোধোদয়ই পুরুষের পায়ের তলার মাটি সরিয়ে দিয়েছে। আক্রমণের কারণও সেটি।
এমনকি বিবাহ যে একটি প্রাচীন ব্যর্থ প্রতিষ্ঠান, সে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণেও পৃথিবীর অনেক উন্নত রাষ্ট্রে নারী তার শরীরের মালিকানা নিজের দখলে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। যৌন এবং প্রজননের ক্ষমতা তার। তার শরীর শস্যক্ষেত্র নয় যে সেখানে কেবল বীজ রোপণ করা হবে। সন্তান ধারণের যন্ত্র নয় তার শরীর। সে সন্তান ধারণ করবে কি করবে না, সে সিদ্ধান্ত তার ভেতর থেকে আসতে হবে। এবং সে সিদ্ধান্ত সে নেবে। ভুলে গেলে চলবে না, প্রজনন প্রক্রিয়ায় সমস্ত বিষয়টি যে শরীরটির উপর নির্ভরশীল সে শরীর নারীর শরীর। সে শরীরের মালিক নারী নিজে।
নারী শরীর কেবল প্রজনন নয়, তার যৌন জীবন উপভোগের জন্যও। এবং যৌন সিদ্ধান্ত নারীর জন্য পুরুষের মতোই তার নিজস্ব এবং দরকারি সিদ্ধান্ত।
আর তাকেই বলে ‘নারীর যোনি ও জরায়ু তার নিজের, এবং সে বিষয়ে তার সকল সিদ্ধান্ত তার নিজস্ব’।
স্টকহোম, সুইডেন
১১ আগস্ট ২০১৭

লেখাটি ১২,৭১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.