সমস্ত বিদ্বেষের সূতিকাগার কি আমাদেরই পরিবার?

0

জান্নাতুল ফেরদৌস নৌজুলা:

আমার পরিচিত এক ভদ্রলোকের দুই ছেলে| বড় ছেলে’র বয়স আট| ছোটটির বয়স সাড়ে চারের মতো হবে| বড়জন সুস্বাস্থের অধিকারী হলেও, ছোটটিকে নিয়ে মা-বাবাকে বেশ ভূগতে হয় দেখেছি| জন্ম থেকেই অসুখ-বিসুখ লেগে থাকে বলেই হয়তো বেশ রোগা ছেলেটি| মা-বাবাও একটু কোলে-পিঠে আদর করে বড় করছেন ছোট ছেলেটিকে|

খেয়াল করেছি, ছোট ছেলেটি বেশ একটু নরম ধরনের| যদিও অতি ভদ্র এবং শান্ত প্রকৃতির এই প্যারেন্টের দুই ছেলেই আসলে দারুণ রিজনেবল আর আন্ডারস্ট্যান্ডেবল| এই দুই ভাই এর কারোর মাঝেই কখনো কোনো এগ্রেশন বা উচ্ছৃঙ্খলতা দেখা যায়নি| অন্তত আমি দেখিনি!

…. আজ লিখতে বসেছি মূলত এই ফ্যামিলির একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করেই!

যা বলছিলাম — ঐ ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা নাকি কিছুদিন আগে সপরিবারে তাদের এক ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডের বাসায় গিয়েছিলেন| ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডের নিউবর্ন বেবি দেখতে| গিয়ে দ্যাখেন, আরো অনেক পরিচিত-অপরিচিত ফ্যামিলি সেখানে| তাদের বড় ছেলেটি (কারোর নাম উল্লেখ করতে চাইছি না) তার বয়সী আরও কয়েকটি ছেলে-মেয়ে সেখানে পেয়ে খেলাধুলায় মেতে উঠেছে| আর ছোট ছেলেটি বেশির ভাগ সময়েই ঘুরঘুর করছে মায়ের কোলের কাছে| শুধু মাঝে মাঝে কোথাও গিয়ে একটা করে খেলনা নিয়ে আসছে| কিছুক্ষণ সেটা নিয়ে খেলে, খেলনা আবার বদলে নিচ্ছে| উনাদের পাশে সুদর্শন এবং অপেক্ষাকৃত এক তরুণ দম্পতি বসেছিলেন| তাদের একটিই ছেলে (৬/৭ বছরের) সম্ভবত আইপ্যাড-এ গোলাগুলির কী এক গেইম খেলছে, আর সুযোগ পেলেই উনাদের ছোট ছেলেটির দিকে চোখ মোটা করে তাকিয়ে ভয় দেখাচ্ছে| আর তাতে ছোট ছেলেটি ভয়ে মায়ের গায়ের সাথে লেপ্টে যেতে চেষ্টা করছে মাঝে মাঝে|

কিছুক্ষণ পরে বাচ্চা দেখতে আসা উপলক্ষ্যে পিৎজা-মিষ্টিসহ হরেক নাস্তা সাজিয়ে অতিথিদের ডাইনিং এ খেতে ডেকেছেন বাড়ির কর্ত্রী| আমার পরিচিত ঐ ভদ্রলোক এবং তাঁর ওয়াইফও গিয়েছেন খেতে| হঠাৎ শোনেন চিৎকার করে কাঁদছে তাঁদের ছোট ছেলেটি| প্যাসেজ পেরিয়ে বেশ একটু এগিয়ে লিভিং রুমের দিকে যেতে যেতে ভদ্রলোক এর কানে কিছু কথা ভেসে এলো| 

তিনি শুনলেন- একটু আগে তাঁদের পাশে বসা ইয়াং সেই বাবাটি (তাঁর নিজের ছেলেকে হেসে হেসে) বলছেন, “একি আব্বুজি, তুমি একজন মুসলমান হয়েও আরেকজন মুসলমানকে লাথি মেরেছো! আর মেরো না|”  তারপর ঘুরে কান্নারত তাঁদের ছোট ছেলেটিকে বললেন, “এই ছেলে, তুমি কাঁদছো কেন? ছিঃ…তুমি না পুরুষ মানুষ? পুরুষেরা কাঁদে না|”

সব শুনে ভদ্রলোক প্রথমে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন| সাথে সাথেই অবশ্য সামলে নিলেন নিজেকে| তারপর কাছে গিয়ে পকেট থেকে টিস্যু বের করে ছেলের চোখ মুছে, কোলে তুলে নিলেন| তারপর ঐ মার্ দেয়া ছেলেটির বাবাকে বললেন, “ভাই, আপনার সাথে আগে কোনো পরিচয় ছিল না| অপরিচিত কাউকে হয়তো এসব বলা ঠিকও না! তবু আজ না বলে পারছি না —

” ‘কান্না’ পুরুষ-নারী-বাচ্চা ~সকলেরই থাকতে পারে| …এবং আমরা আমাদের দুই ছেলেকেই ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করছি| শুধু ‘পুরুষ মানুষ’ হিসেবে নয়| আমরা সব প্যারেন্টসই যদি সেই একই চেষ্টা করতাম, তাহলে ‘এমন কান্না-পরিস্থিতি’র উদ্ভবই হয়তো হতো না! এনিওয়ে, আপনার ছেলে অনেকক্ষণ থেকেই আমার ছেলেকে ‘আই-বুলিং’ করছিলো| ভদ্রতা-বশত: কিছু বলিনি এতোক্ষণ| এসব যে ভালো না তা ছেলেকে বুঝিয়ে বলবেন|

…. আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা~ আমরা কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বী; অর্থাৎ মুসলমান না! আমার ছেলেকে লাথি মারাটা তাহলে কি ঠিকই আছে, বলে ভাবছেন? …. শুনুন, খেলতে খেলতে বাচ্চারা মারামারি করে| সেটা ঠিক আছে| কিন্তু সম্পূর্ণ বিনা কারণে এবং বিনা উস্কানিতে দূরে বসে খেলতে থাকা কাউকে গিয়ে মেরে এলে তাকে তিরস্কার করা উচিত| সেটা অবশ্য নিজের ছেলেকে অনেকেই করে না! আপনিও না করতে পারেন! তাই বলে এমন অদ্ভুত ধর্মভিত্তিক লজিক দিয়ে নিবৃত করার চেষ্টা করা যায়-এটা আমার জানা ছিল না!”

ঐ লোককে আর কোনো কথাবার্তার সুযোগ না দিয়ে আমার পরিচিত এই ফ্যামিলি অল্প কিছুক্ষণ পরে বাসায় ফিরে যান| বাসায় ফিরেও নাকি তাদের খুব খারাপ লাগছিল! এর কয়েকদিন বাদে আমাকে ফোন করে ছিলেন| হয়তো সান্ত্বনা খুঁজতে! আমি কোনো সান্ত্বনা দিতে পারিনি| শুধু বলেছি ~ “ভাই, সবাই সামনে এগিয়ে যায়; ‘আরো ভালো কিছু’কে পেতে| আমরা পেছাচ্ছি, অন্ধকারের দিকে!”

যতবার ঘটনাটা মনে পড়ে বিষণ্ণ হই| আর ভাবি- কত শত মানুষের এই যে এতো লেখালেখি, এতো চেষ্টা~ নষ্ট দিন বদলে দেবার! সব কি ব্যর্থ তাহলে? তবে চারপাশ ঠিকই বদলে যাচ্ছে! বদলে যাচ্ছে অন্যভাবে! যে ‘বদলে যাবার’ অর্থ আমাদের জানা নেই|

সন্তানের ‘ভবিষ্যৎ সুখের পৃথিবী’ তৈরির সুযোগ আমাদের মতো বাবা-মায়েদের হাতেই ছিল| আমরা বেশিরভাগই সে সুযোগ নিচ্ছি না! জাতি-ধর্ম-লিঙ্গ বৈচিত্র্যকে সাথে নিয়েই একটি সুখময় পৃথিবী গড়ার খুব সহজ উপায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছি কি অবলীলায়!!

লেখাটি ১,৪২৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.