শহরজুড়ে আজ আমার ফিউনারেলের প্রস্তুতি

0

বিথী হক:

শহরজুড়ে আমার ফিউনারেলের প্রস্তুতি। লাল জামা পরে হাসিমুখের শান্ত-সৌম্য মানুষগুলো পেছনে হাত বেঁধে একে অপরের সাথে কথা বলছে। সকল রাস্তায় লালচে হলুদ শিখায় জ্বলছে ধুপকাঠি। একজনকে ডেকে বললাম, ধূপকাঠির গন্ধে মাথাব্যথা হয় আমার। গোলাপ জলের গন্ধও সহ্য করতে পারি না। কপাল কুঁচকে তিনি জানালেন, এসব নিয়ে নাকি আমার মাথা ঘামাতে নেই। নাকে,কানে তুলো দিয়ে আমার নাকি আজ কফিনে শোয়ার দিন। আজ নাকি আমার না পেরেশান হবার দিন। আজ নাকি আমার কথা বলবার দিন নয়। আমার খুব রাগ হল। জীবনে কি কখনো কারো কথায় আমি কিছু করেছি? কারো কথা চুপচাপ মুখবন্ধ করে শুনেছি। কেউ কিছু বললে তার উত্তর না দেওয়া পর্যন্ত আমার তো পেট ব্যথা করে।

আমি ইতিউতি তাকিয়ে বুঝলাম, আজ সবার আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু স্বয়ং আমি। বিষয়টা অনেকটা বিয়ের মতো। যার বিয়ে তাকে নিয়েই সবার মাতামাতি। উফ কি বিরক্তিকর ব্যাপার, ভাবতেই কেমন গা গুলাচ্ছে। বিয়ের মঞ্চের সাথে কাঠের কফিনের মিল নেই যদিও, সাজগোজেরও মিল নেই। আমি যে সাদা সেলাইবিহীন কাপড় পরে আছি তা কি রাওয়া ক্লাব বা গলফ গার্ডেনে পুতুলের মতো সেজেগুজে বসে থাকা বউয়ের মতো! মনে হয়না তো। একজনকে ডেকে বললাম ‘এই যে ভাই শুনছেন? আমাকে একটা লাল কাপড় দেন। সাথে শাহবাগ থেকে কেনা সবচেয়ে বড় টিপটা, ওটা আমার ব্যাগের পকেটে আছে।’ কেউ আমার কথায় কোন পাত্তা দিচ্ছে না। আস্তে আস্তে জ্বলে উঠছে নতুন সাদা রঙের আলোগুলো, নতুন করে জ্বলে উঠল ধূপকাঠিও। এখানে ওখানে আমার বাঁধাই করা ছবি।

অমলকে দেখলাম মন খারাপ করে আমার শাড়ি পরা, বড় টিপ পরা একটা ছবিতে বেলিফুলের মালা পরিয়ে দিল। অমলকে আমি কোনদিন দেখিনি, আজই প্রথম দেখলাম। লাল পাঞ্জাবিতে দারুণ মানাচ্ছে ওকে। কিছু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সোমরাজ, একজনের থেকে লাইটার নিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়ে একমনে কোনদিকে যেন তাকিয়ে আছে। আমি অমলের দিকে তাকালাম, ওর সঙ্গে সোমের কিছুটা মিল আছে। তবে অমলের চোখ ছলছল করছে। আমার ইচ্ছে করছে অমলের হাত ছুঁয়ে বলি ‘কত বছর তোমার পথ চেয়ে ছিলাম, আজ বুঝি সময় হল তোমার!’

বাসার পুরো পথটা পরিচিত মানুষে ভরা, কার সাথে কথা বলব বুঝতে পারছি না। একরাতে এত মানুষের সাথে কথা বলব কিভাবে আমি? সকলকেই এত সুন্দর দেখাচ্ছে যে আমার ইচ্ছে করছে জন্মজন্মান্তর ধরে আমার ফিউনারেল প্রস্তুতি যেন শেষ না হয়! লাল রঙের জামায় হঠাৎ করে একসঙ্গে এত মানুষ দেখলে মনে হয় রক্ত জমাট বেঁধে আছে পথে পথে। মাকে কোথাও দেখতে পাচ্ছি না। বাবাকে দেখলাম কনফেকশনারি দোকানটার পাশে আমগাছটায় হেলান দিয়ে ফোনে কথা বলছে। বাবাকে জিজ্ঞেস করব মা কোথায়?

হঠাৎ তাকিয়ে দেখলাম, মা হাসিমুখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। মায়ের হাতে ডালের বড়ি আর ঘিয়ন বেগুন দিয়ে ঝোল ঝোল করে রাঁধা পাবদা মাছের তরকারি। আজ তো আমার ফিউনারেল, মা এই পাবদা মাছের তরকারি নিয়ে কি করছে? কয়েকজন মহিলা মাকে আমার কাছ থেকে টেনে সরিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু মায়ের গায়ে আজ ঐশ্বরিক শক্তি। মা বোধহয় নিজেই ঈশ্বর হয়ে গেছে আজ। সেদিনের মতো, যেদিন আমি জন্মেছিলাম আর মা সৃষ্টি করেছিল প্রাণ!

বাতাসে ভ্যাপসা গরম। ভেসে ভেসে যাচ্ছে গোলাপজল, কর্পূর, ধূপকাঠির গন্ধ। আমার মাইগ্রেনের ব্যাথায় নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। এখানের অনেকেই জানে এসব গন্ধে আমার সমস্যা। অথচ কী আশ্চর্য কেউ নিষেধ করছে না এসব না জ্বালাতে।

আমার বন্ধুরা কাশ্মীর যাওয়ার প্ল্যান করছে। খুব রাগ হচ্ছে আমার। ওরা আমাকে বাদ দিয়েই লিস্ট করে ফেলেছে কে কে যাবে! একটিবারের জন্যও আমাকে জিজ্ঞেস করল না আমি যাব কি না! কয়েকজন ম্যারাথন নিয়ে কথা বলছে। এবার ৫০ কিলোমিটার।

হায় ঈশ্বর! আমার ডায়েরি! ভাই আমার ডায়েরি বুকে চেপে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। সব জেনে গেছে বোধ হয়, আমার ক্যান্সারের খবরটাও। ডাক্তারি রিপোর্টটাও ওর ভেতরেই ছিল। শেষ মাসের টাকাটা পুরোটা মাকে দিয়েছিলাম। আমার ল্যাপটপ কিনতে মায়ের স্বর্ণের কানের দুল বেচতে হয়েছিল অনেক আগে। আমি টাকা জমিয়ে মাকে স্বর্ণের একটা পুরো গয়নার সেট কিনে দিয়েছি। এই যে মা ঝলমল করছে। লাল শাড়ি আর কোঁকড়া চুলে মাকে পরীর মতো লাগছে। বাবাকে কখনো পাঞ্জাবি পরতে দেখিনি। আজ বাবাকেও দেখলাম পাঞ্জাবি পরতে। আমার আর কিছু দেখতে বাকি নেই।

এদিকে আজ পূর্ণচন্দ্র। আকাশের দিকে তাকালেই নিজেকে বিলীন করে দিতে ইচ্ছে করে। সবার লাল জামা, শান্ত-সাবলীল চেহারা, শহরের মোড়ে মোড়ে মৃত গন্ধে ম ম করা হাওয়া সব মিলিয়ে যাচ্ছে। আমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দখিনা বাতাস। পেছনে তাকালেই চোখে পড়ছে জমাট বাঁধা রক্ত। বিপ্লব হয়ে গেছে, ফুরিয়ে গেছে সব দেনা-পাওনার হিসেব-নিকেশ। আমার ফিউনারেল, ফিউনারেল!

অমল, ফিরে তাকাও। আমাদের কি আর কখনো দেখা হবে?

লেখাটি ২,৯১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.