সাম্য থাকুক সংসারে

0
মালবিকা শীলা:
আগে যৌথ পরিবার নিয়ে সুন্দর সুন্দর অনেক মুভি হতো। দিনদিন কমে যাচ্ছে যৌথ পরিবারের সংখ্যা। একক পরিবারে থেকে থেকে একা হয়ে পড়ছে মানুষ। নারীর তুলনায় পুরুষ হয়ে যাচ্ছে আরো বেশি একা। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারে সাধারণত নারীর হাতেই থাকে সংসারের চাবি। সন্তান তার সুবিধা অসুবিধা মায়ের সাথেই শেয়ার করে বেশি। অন্যদিকে জীবিকার তাগিদে বাইরে বাইরে থেকে পুরুষ হয়ে যায় আরো দূরের। নারীদের অপ্রাপ্তি, নির্যাতন নিয়ে তো আমরা প্রতিনিয়ত লিখছি, পড়ছি।

এবার একটু পুরুষের দিকে তাকিয়ে দেখি-

আমি যখন বাড়িতে যাই,  আমাদের আড্ডার জায়গা হয় আম্মার রুমে, আম্মার বিছানায়। আব্বা মাঝেমধ্যে চেয়ার টেনে এনে বসলেও কখনোই বিছানায় আমাদের মতো শুয়ে, বসে, লুটোপুটি করতে পারেন না। অনেক সময় টিভিরুমে একা বসে টিভি দেখতে থাকেন, শীতকাল হলে আম্মা, আপা, ভাবী, ছোটপা, আমি এক কম্বলে পা ঢেকে নিয়ে তুমুল আড্ডায় হাহাহিহি করি, আব্বা এলে আমাদের হাহাহিহিতে লাগাম পরানো হয়, আড্ডাও আর জমে না। 

আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক বিয়ের পর স্ত্রীকে নিয়ে বাবা-মায়ের সংসারে উঠলেন। শ্বশুর নির্বিবাদী ভালোমানুষ, শাশুড়ি কিছুটা খিটখিটে মেজাজের। উচ্চশিক্ষিতা স্ত্রী মানিয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু শাশুড়ির সাথে প্রায়ই টুকটাক লেগে যেতো। ভদ্রলোক অফিস সেরে বাড়ি আসার পর প্রথমেই মায়ের কাছে স্ত্রীর নামে একগাদা কথা শুনতে হতো, বেশ উচ্চস্বরেই। নিজের ঘরে গিয়ে স্ত্রীর কাছে শুনতে হতো মায়ের কৃতকর্মের ফিরিস্তি। স্বল্পবাক ভদ্রলোক চুপচাপ শুনে যেতেন, কিন্তু কিছু করতে পারতেন না। কী করবেন!

এরকম অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে তাঁকে একসময় আলাদা সংসার করতে হলো। তাঁর সন্তানেরা হারালো দাদা দাদুর সার্বক্ষণিক সাহচর্য। ভদ্রলোককে এ নিয়ে কেউ হয়তো সামনাসামনি কিছু বললো না, কিন্তু আড়ালে ঠিকই বলতে লাগলো “বউ পাগলা” “বুড়ো বাপ-মাকে কিভাবে ছেড়ে চলে গেল!” “স্বার্থপর” ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক কথা। বাবা-মা, ভাইবোন ভুল বুঝলো পুরুষটিকেই। স্ত্রী ব্যস্ত হলেন নিজের নতুন সংসার আর সন্তানাদি নিয়ে, পুরুষ হয়ে গেলেন একা!

শাশুড়ি বউয়ের যে চিরন্তন সমস্যা, তা আসে মূলত, অধিকার ছেড়ে না দেওয়ার মানসিকতা থেকে। মায়ের মনে হতে থাকে ছানাটা ননীটা খাইয়ে বড় করা ছেলেটির স্বত্ত্ব, উড়ে এসে জুড়ে বসা বউ কেন নেবে! কিন্তু মায়ের জায়গা যে বউ নিতে পারে না এটা তাদের মাথায় ঢোকে না। বউ তো এসেছে সংসার করতে। এখানে পদে পদে শাশুড়ির নিষেধাজ্ঞা আর অপমান সহ্য করে তার পক্ষে এই সংসারকে কি নিজের সংসার বলে ভাবা সম্ভব! আসল চাপটা এলো পুরুষের ওপর। নিজের সংসারে শান্তি বজায় রাখতে গিয়ে আলাদা হলেও, পুরুষ ভুগতে লাগলো আত্মগ্লানিতে, বাবা-মাকে ছেড়ে আসার অপরাধবোধে। 

এই দীর্ঘ যাত্রায় পুরুষ বড়ই একা! নিজের স্ত্রীও অনেকসময় সহানুভূতি নিয়ে এগিয়ে আসতে ব্যর্থ হন। নিজের সীমাবদ্ধতার কথা লজ্জায় প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকে না অধিকাংশ পুরুষেরই। কষ্ট পুষে রেখে, মুখ ফুটে এসব বলতে না পারার কারণেই কি পুরুষ তুলনামূলকভাবে নারীর আগে মৃত্যুবরণ করেন! কে জানে! 

বিয়ে করে ভালো ছেলেগুলো পড়ে মহাবিপদে! বাপের বাড়ির জন্য বেশি টান থাকলে বউয়ের মুড অফ। বউয়ের জন্য কিছু করলেই “বউ ন্যাওটা” খেতাব পেতে হয়! বিয়ে একটি ধর্মীয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠান। কিন্তু মানবতার দিক দিয়ে এই সম্পর্কটার খুব একটা উন্নতি হয়নি। হলে দুই পরিবারে অসম অবস্থা থাকতো না। শাশুড়ি ছেলের বউকে নিজের সন্তানের মতোই দেখতেন। ছেলের বউ শাশুড়িকে নিজের মা বলে ভাবতেন। এই অসাম্যের বলী হোন দুইদলের মধ্যে দাঁড়ানো ত্রিভঙ্গমুরারি পুরুষটিই।

স্ত্রীর কাছে আদর্শ স্বামী, মায়ের কাছে আদর্শ পুত্র, কন্যার কাছে আদর্শ পিতা হতে গিয়ে, পুরুষ হারিয়ে ফেলে নিজের জীবন যাপনের আনন্দ। অনেক পুরুষকে বাবা-মা, ভাইবোন, স্ত্রী, স্ত্রীর পরিবার, সন্তানাদি সবার সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে একাই ভাবতে হয়। কলুর বলদের মতো খেটে এরা পরিবারের দরকারি সদস্য হলেও সবচেয়ে প্রিয় হয়তো হয়ে উঠতে পারেন না।

পুরুষ মানুষের কাঁদতে নেই। পুরুষের সব বিষয়ে মাথা ঘামাতে নেই, পুরুষের ঝগড়া করতে নেই- এরকম অনেক বিধিনিষেধের বেড়া তুলে দিয়ে আমরা পুরুষকে পর করে দিয়েছি। কিন্তু এই পুরুষই যখন আমাদের না বোঝেন, তখন আমরা তার চৌদ্দপুরুষ উদ্ধার করে ছাড়ছি। তাকে এই বিষয়গুলো বুঝতে পারার সুযোগটা আমরা দিচ্ছি কোথায়! 

সমাজকে ইতিবাচক লক্ষ্যে এগিয়ে নিতে হলে নারী পুরুষকে এক হয়ে কাজ করতে হবে। একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে নয়, একে অন্যের পরিপূরক হতে হবে। পুরুষের শুকনো ভূমিতে শান্তির বৃষ্টি হয়ে ঝরতে হবে নারীকে, তবেই সমতার ফসল ফলতে পারে, অন্যথায় নয়।

লেখাটি ৭৫২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.