আর হিংসা নয়, চাই মানবিক সমাজ

0
মালবিকা শীলা:
আমি যখন এইট নাইনে উঠলাম, তখন আম্মা আমাকে কড়া শাসনের মধ্যে রাখতেন। হাতে গোনা যে কয়জন বান্ধবী ছিলো, তাদের বাড়িও সহজে যেতে দিতেন না। আমাদের ছোট শহরে কেউ প্রেম করলে সেটা নিয়ে প্রচুর গুজগাজ  ফিসফাস হতো। সামাজিকভাবে প্রেম বিষয়টাকে একটা ট্যাবু বানিয়ে ফেলা হয়েছিলো। প্রেম করা মেয়েদের অবস্থা ছেলেদের তুলনায় আরো কয়েকগুণ বেশি খারাপ হতো।
আমার কাছে যেটা বেশি খারাপ লাগতো সেটা হচ্ছে, আমার ওপর আম্মার আস্থাহীনতা। একদিন আমি খুব রেগে গিয়ে আম্মাকে বললাম, তুমি যদি আমাকে বিশ্বাস করো, তাহলে আমি আপ্রাণ চেষ্টা করবো সেই বিশ্বাস রাখার। কিন্তু যদি অকারণে অবিশ্বাস করো তাহলে আমার যা ইচ্ছা আমি করবো। তুমি আটকাতে পারবেনা। আম্মা বুঝতে পেরে আমার ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে দিলেন, আমিও আম্মাকে দেওয়া কথা অনুযায়ী শেরপুরে কোনো প্রেম করিনি। 
আমি বুঝি, আমি আমার যে কোনো বিষয়ে কথা বলতেই পারি। কিন্তু আমি যদি অন্যরা কিভাবে তাদের মেয়েদের শাসন করবেন সেই বিষয়ে উপদেশ দিতে যাই তখন বিষয়টা উভয়পক্ষের জন্যই একটু অস্বস্তিকর হয়ে যায়। দিন শেষে আপনিই আপনার সন্তানদের অভিভাবক, তাদের ভালো খারাপ নিয়ে আপনাকেই থাকতে হবে। তবুও আমি কয়েকটা কথা বলতে চাই।  
বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্নভাবেই অত্যাচার হতে আমরা দেখছি। তার পরেও কেন একটি হিন্দু অথবা আদিবাসী মেয়ে বাঙালি মুসলমান ছেলের প্রতি আকৃষ্ট হবে? এটা একটু দেখি, দেশে বাঙালি মুসলমান সংখ্যাগুরু, কাজেই পড়াশোনা অথবা চাকরি করতে গেলে হিন্দু অথবা পাহাড়ি মেয়েটি খুব স্বাভাবিক ভাবেই বাঙালি ছেলেমেয়েদের সাথে মিশবে। মিশলেই যে মেয়েটি প্রেম অথবা বিয়ে করে ফেলবে, তা তো নয়! কিন্তু এই মেয়েটিকে যখন নিজের ধর্মের, নিজের জাতের লোকেরা নিজেদের জাতি ধর্ম রক্ষার নামে কথা শোনাতে থাকবে, অত্যাচার করবে, তখন সেই মেয়েটি কি করবে! মেয়েটি তার নিজের জাতির লোকেদের ওপর থেকে কি শ্রদ্ধা হারাবে না! 
কয়েকদিন আগে একটা পোস্টে পড়লাম একটি হিন্দু মেয়ে মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করেছিলো, পরে ছেলেটির অত্যাচারে মেয়েটি আত্মহত্যা করেছে। খুবই বেদনাদায়ক ঘটনা সন্দেহ নেই, কিন্তু সেই পোস্টে অনেকের মন্তব্য পড়ে আমি শিউরে উঠেছি। “মরে গিয়ে পৃথিবীর ভার লাঘব করেছে” “খুব ভালো হয়েছে”  “উচিত শিক্ষা হয়েছে” এই জাতীয় মন্তব্য পড়ার পর উদার শিক্ষিত মেয়েগুলো আপনাদের সম্পর্কে কি ভাববে! আপনারা কি এর পরেও নিজেদের ভালোবাসার যোগ্য ভাববেন? আমি তো ভাববোনা! একজন মানুষের চেয়ে যখন ধর্ম বর্ণ বড় হয়ে যায়, তখন তাদের প্রতি কি সুস্থ চিন্তার কারো সহানুভূতি থাকে, নাকি থাকা উচিত! ধর্মান্ধতা কি আপনাকে মানবতা থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে না? 
একজন পাহাড়ি ছেলে আমাকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠানোর পর, তার ওয়ালে গিয়ে আমি একটি ভিডিও দেখি। একটি পাহাড়ি মেয়ে একটি বাঙালি ছেলের সাথে প্রেম করার অপরাধে তাকে ধরে এনে উঠোনে ফেলে বাঁশ দিয়ে পেটানো হচ্ছে। সেই ছেলে এই বর্বরতাকে সমর্থন করছে। সেখানে সেই অত্যাচারের পক্ষে অনেক পাহাড়ি ছেলেদের মন্তব্য দেখে আমি খুবই কষ্ট পেয়েছি। বলাবাহুল্য, তাকে আমি বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করিনি। 
বুঝতে পারছি, আপনার ঘরের মেয়ে যদি অন্য ধর্মের, অন্য জাতের ছেলের সাথে প্রেম অথবা বিয়ে করে, তাহলে তার প্রতি আপনার কোনো সমর্থন থাকবেনা। কিন্তু মানবতার কথা ভুলে গিয়ে আপনারা কোন দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন! হিংসা দিয়ে ভালো কিছু  অর্জন করা কি সম্ভব! নিজের মেয়ে অথবা বোনের ওপর সমর্থন সরিয়ে নিয়ে আপনি নিজেও কি মেয়েটির দুর্ভাগ্যের কারণ হচ্ছেন না! প্রেম করে বিয়ে করে মেয়েটি হয়তো সুখী না-ও হতে পারে, তাকে ত্যাজ্য করে আপনিও কি কেড়ে নিচ্ছেন না তার শেষ আশ্রয়! ধর্ম বর্ণ একপাশে সরিয়ে একজন মানুষ হিসেবে এটা একটু ভেবে দেখুন। 
উচ্চশিক্ষার্থে অথবা জীবিকার প্রয়োজনে পাহাড়ি মেয়েরা ঘর ছেড়ে বাইরে যাচ্ছে, এদেরকে মেইনস্ট্রিমের লোকের সাথে মিশতে হবেই। বাঙালি বন্ধুদের সাথে কোথাও গেলে, ছবি দিলে এই মেয়েগুলোকে যেভাবে আক্রমণ করা হয়, তাতে মেয়েরা যদি আপনাদের অপছন্দ করে, তাতে কি আপনি ওদের দোষ দিতে পারেন? 
আমি ক্যানাডায় সাদা লোকের মধ্যে থেকেও কি বাংলা ভাষায়, বাংলাদেশের অত্যাচারিত মানুষের সুবিধা অসুবিধা নিয়ে কাজ করার, লেখার চেষ্টা করছিনা? আমার লেখায় ইতিবাচক কোনো পরিবর্তন হচ্ছে কিনা তা আমি জানি না। কিন্তু মানবতার পক্ষে ঘৃণার বিপক্ষে আমি কাজ করে যেতে চাই। 
আমি বিশ্বাস করি, ভালোবাসার মাধ্যমে যেখানে জয়ী হওয়া সম্ভব, সেখানে হিংসা ত্যাগ করাই উত্তম। আপনাদের মেয়েদের ভালোবেসে বোঝান, বিশ্বাস রাখুন, তাহলে যে পজিটিভ রেজাল্ট আপনি পাবেন সেটা কিছুতেই হিংসা অথবা ঘৃণা ছড়িয়ে পাবেন না। আপনি আমাকে ঘৃণা করবেন, আর আমি আপনাকে প্রেম বিলাবো তাতো হয় না! অন্যের সমালোচনা না করে নিজেদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করুন, নিজেকে যোগ্য করে তুলুন। মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল থাকুন। মনে রাখবেন, ধর্ম, বর্ণ, জাতির অনেক ঊর্ধ্বে হচ্ছে মানবতাবাদ।

লেখাটি ৪৩৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.