বউ মরলে নাকি কাঁদতে নেই!

0

প্রবীর কুমার:

বউ মরলে নাকি কাঁদতে নেই! বউয়ের জন্য কান্না করা পুরুষ জাতির জন্য লজ্জা! কিন্তু স্বামীর সামান্য অসুস্থতায় স্ত্রী’র চোখে জল না এলে সেই নারী অলক্ষ্মী, তার একদম পতিভক্তি নেই! এভাবেই বিভেদ সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে সমাজে, বিভেদ সৃষ্টি করা রাখা হয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজে বসবাস করা মানুষগুলোর মগজে।

পাশের বাড়ির এক জ্যেঠিমা মারা গেছেন। বাড়ির ঘর-উঠোন কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে। খেলার সাথী জ্যাঠাতো ভাইও কাঁদছে। বাকি যারা কান্না করছেন তাদের সবাই নারী। মেয়েরা মারা গেলে পাড়ার কিংবা সমাজের পুরুষদের বুঝি তেমন তেমন দুঃখ হয় না! জ্যাঠা এতো দিনের সঙ্গিনীকে হারিয়ে মাঝে মাঝেই ‘হু হু’ করে কেঁদে উঠছেন। কিন্তু মেয়েদের জন্য কান্না করা লজ্জার। তাই এক কাকা জ্যাঠাকে ধমক দিয়ে বলছেন,‘তুমি কি পাগল হলা? বিটি মানসির জন্যি কেউ কান্দে?’ বুঝতে পারলাম জ্যাঠাকে শান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমার অল্প বয়সের মগজে একটা প্রশ্ন বারবার আছড়ে পড়তে লাগলো- ‘মেয়েদের জন্য কেন কাঁদতে নেই।’

আজ বুঝি, মেয়েদের জন্য কেন কাঁদতে নেই, কেন মেয়েরা মারা গেলে সমাজের চোখে জল আসে না। আজ বুঝি পুরুষ তার শোষণ-শাসন টিকিয়ে রাখতে, প্রভুর আসন না হারাতে মেয়েদের মূল্যহীন করে রাখছে সভ্যতার শুরু থেকে। পুরুষের সুখের জন্য নারীদের যথেচ্ছা ব্যবহার করা এক প্রকার অলিখিত চুক্তি। তাই তো বলা হয়, ‘ বউ মরলে বউয়ের অভাব হয় না!’ অথচ ‘স্বামী মরলে স্বামীর অভাব হয় না’ একথা বলা হয় না। এটা বললেই ‘সমাজ গেলো গেলো’ রব উঠবে।

তাহলে দেখা যায় বিয়ে করা কিংবা করানোর অধিকারও পুরুষের হাতেই। মেয়েদের এখনও বিয়ে ‘দেয়া’ হয়, আর ছেলেরা বিয়ে ‘করে’। আমরা নির্দ্বিধায় এই বৈষম্যমূলক কথাগুলো বলে মেয়েদের অস্তিত্ব আর সামর্থ্যকে অস্বীকার করি,  অবাঞ্ছিত পুরুষতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখি। মেয়ে শিক্ষিত হয়েছে, চাকরি করছে, পরিবারের দেখভাল করছে, তারপরও তাকে বিয়ে ‘দেয়া’ হয়। মনে হয়, অসহায় কাউকে সাহায্য করছে নিজ পরিবার! অথচ একটি অযোগ্য, অকর্মণ্য, নেশাগ্রস্থ ছেলেও বিয়ে ‘করে’। বিয়ে ‘করা’র কথা যদি আসে তবে ছেলে- মেয়ে দুজনেই বিয়ে ‘করবে’। একজন বিয়ে করবে, আর একজনকে বিয়ে করানো হবে-এই বৈষম্যমূলক ধারণা আর প্রচলন থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

ধরেই নেওয়া হয়েছে- দুর্বল মানেই নারী। নিচু স্বরে কথা বললে শুনতে হয় ‘তুই মেয়ে নাকি!’ কোনো মেয়ে উচ্চস্বরে কথা বললে বলা হয় ‘তুই পুরুষ নাকি’! সিগারেট-মদ খাই না বললে বলা হয়, ‘তুই মেয়ে নাকি !’ উচ্চস্বরে কথা বলা কিংবা সিগারেট-মদ খাওয়াও পুরুষের একচ্ছত্র অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বোঝার চেষ্টা করতে হবে-  কোনো মেয়ের ঠোঁটে সিগারেট দেখলে কেন পুরুষের মগজে তার ধোঁয়া ওড়ে! তাহলে কি সিগারেটের আগুনে শোষণ পুড়ে যাওয়ার ভয় আছে?  

এভাবে চলতে থাকলে নারীমুক্তি ঘটবে না। হ্যাঁ, নারীরা আক্ষরিক অর্থেই এখন পর্যন্ত বন্দী। সমাজের বেশ কিছু সংখ্যক নারী তাদের অধিকারে বেশ সোচ্চার। তারা চেষ্টা করছেন পিছিয়ে থাকা কিংবা পিছিয়ে রাখা মানুষগুলোকে সমাজের সামনে নিয়ে আসতে। স্বল্প সংখ্যক পুরুষও বিবেকের তাড়নায় এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলছেন।

তবে সামনে আছে অনেকগুলো বাঁধার দেওয়াল। সমাজের প্রায় সব পুরুষই এই দেওয়ালে সমর্থনের ইট গেঁথেছে, সঙ্গে আছে পুরুষতন্ত্রে আক্রান্ত নারীদের বিশাল অংশ। সব থেকে বড় বাঁধা তথাকথিত শিক্ষিত মানুষগুলো। তারা জেগে ওঠা নারী কিংবা পুরুষগুলোকে দমিয়ে রাখতে বিভিন্ন পন্থায় আপ্রাণ চেষ্টা করেছে যাচ্ছে।

সহজ কথায় নারীবাদ বলতে বৈষম্যের শিকার নারীদের মুক্তির চেষ্টাকে বুঝি। সমাজে যদি বৈষম্য থাকে তবে নারীবাদ কিংবা নারীবাদীদের জন্ম হবেই। বিবেকের পীড়া থেকেই মানুষ নারীবাদ সমর্থন করবে। এটাকে যারা ভিন্ন ধারায় নিতে চায়, অপ্রয়োজনীয় মনে করে , ফ্যাশান হিসেবে দেখে, এর বিরুদ্ধে ট্রল করে  তারা নারীমুক্তির বড় অন্তরায়। তবে কুকুরের ভয়ে পথিকের পথচলা যেমন থেমে থাকার নয়।     

কোনো মেয়ের ঠোঁটে সিগারেট দেখলে বেশ খুশি হই, মনে হয় এই বুঝি শেকল ভাঙ্গার ডাক এলো, এই বুঝি তারা পুরুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলতে শিখলো। কিন্তু সমাজের বাকি মেয়েদের দিকে তাকিয়ে আনন্দ মিলিয়ে যায়। তারপরও আশা বাঁচিয়ে রাখি-  একদিন মুক্তি ঘটবে এই বৈষম্যের, যেসব মেয়েরা এসব বৈষম্যগুলোকে অলংকার হিসেবে পরে আছে তারাও একদিন এগুলোকে শৃঙ্খল মনে করবে। 

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.6K
  •  
  •  
  • 2
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.6K
    Shares

লেখাটি ৩,১৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.