ভাবুন না একটু, তারপর না হয়…

0

রামিছা পারভীন প্রধান:

কতজন মেয়েকে বলতে শুনেছি, ‘আমি বলে তোমার সংসার করতেছি, অন্য মেয়ে হলে দুদিনও সংসার করতো না’, তারপর সকাল গড়িয়ে বিকেল হলে আবার সেই মায়ার জালে ধরা পড়া। জীবনটা এই রকমই। সংসারে মান অভিমান, দুঃখ  কষ্ট, ঝড়-ঝাপটা, খুনসুটি থাকেই। যে সংসারটা নিজের হাতে তিলে তিলে গোছানো, সেটা এক মুহূর্তে শেষ হয়ে যাক তা কেউ চায় না।  

এক আপু ফেসবুকে লিখেছিল, বাঙালি মেয়েরা সকালে স্বামী লাথি দিয়ে বের করে দিলে বিকালে চিন্তা করে লোকটা ঠিকমতো ঘরে ফিরলো কিনা, খেলো কিনা, ইত্যাদি। আবার পুরুষতান্ত্রিক সমাজও জেনে গেছে, সংসার নামক যে জালে মেয়েরা ধরা পড়েছে, তা থেকে বের হয়ে আসা অনেক কঠিন। কাউকে যদি বলা হয়, এতো অত্যাচার সহ্য করে সংসারে পড়ে আছেন কেন? তাহলে বলবে, একটা ডিভোর্সি মেয়ের সন্তান নিয়ে একা একা এই সমাজে টিকে থাকা অনেক কঠিন, আবার যে নতুন জীবনে জড়াবো, সেই মানুষটা যে ভালো হবে, তার কোনো গ্যারান্টি আছে? তার চেয়ে অপেক্ষার প্রহর গুণি যদি একদিন সব ঠিক হয়ে যায়, সে আশায়ই তো বেঁচে আছি।

দুজনেই আলাদা পরিবার থেকে আসা, তাই প্রথম থেকে দুজন দুজনকে সম্মান দেখালে শেষ পর্যন্ত ভালো থাকা যায় একেবারে যদি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা সম্ভব না হয়, তখন বিচ্ছেদের পথে হাঁটাই উত্তম। তবে সম্পর্কটা তিক্ত হওয়ার আগে আমাদের একটু সচেতন হতে হবে। খুব যত্ন করে প্রথম থেকে দুজনকে সম্পর্কটা এগিয়ে নিয়ে যেতে হবেযদি বিবাহিত জীবনে ছেলেমেয়ে থাকে, তাদের ভবিষ্যতের কথাটা দুজনের মাথায় রাখতে হবেআপনাদের  জীবনটা  শুধু আপনাদের না, এই জীবনের সাথে আপনাদের ছেলেমেয়েরাও জড়িত

যারা নতুন জীবনে পা দিবেন আগে থেকে নিজেকে সেরকম করে গড়ে তুলুন যাতে ভবিষ্যতে কোনো সমস্যায় পড়তে না হয়। যদি বেশী শিক্ষিত চাকরিজীবী মেয়ে বিয়ে করতে চান, তাহলে ভাবুন আপনার সেই সাহস আছে কিনা বউ অফিস থেকে দেরি করে ফিরলে মুখ অন্ধকার করে রাখা বা হাজারটা প্রশ্নের জবাবদিহিতা চাইবার মনোভাব থাকলে আগেই ভেবে কাজ করবেন।

ছোটখাটো সমস্যাগুলো কাটিয়ে না উঠলে এগুলোই এক সময় মহাসাগরে পরিণত হয়, এবং সেখান থেকে বের হয়ে আসা খুব কঠিন হয়ে পড়ে।  আর তখন  সামনে ডিভোর্স নামক রাস্তাটাই কেবল খোলা থাকে।

একজন মানুষের মধ্যেই দোষ গুণ নিহিত থাকে। অনেক সময় যে মানুষটার সাথে আমরা রেগে আছি সেই মানুষটার ভালো দিকগুলো যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে তার উপর অনেক সময় রাগ কমে যায়, দুজনকে রাগের সময় দুজনার ইতিবাচক দিকগুলো চিন্তা করতে হবে। দুজনের মধ্যে ইগো সমস্যা থাকলে খুব জটিল হয়ে যায় ব্যাপারগুলো। অনেকে আছে সকালে ঝগড়া করলো, বিকালেই ঠিক হয়ে যায়, আবার অনেকে আছে সাত-আটদিন, এমনকি মাস পেরিয়ে গেলেও কথা বলে না। এক্ষেত্রে অবশ্য মেয়েরাই আগে নত হয়। পুরুষ নত হয় না, তাতে তাদের মান চলে যাওয়ার আশংকা থাকে!

যদি মেয়েটি নিজে আর্থিক দিক দিয়ে সচ্ছল হয়, তাহলে তার পক্ষে যে কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়া সহজ। কিন্তু অনেকে আছে, তাদের পক্ষে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়াই সম্ভব হয় না। তারা নিজেদের জীবনকে বলী দিয়ে দেয় সমাজ, আত্মীয়-স্বজন ও ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করে। ডিভোর্সের জন্য আসলে আর্থিক নিরাপত্তার পাশাপাশি সাহসেরও প্রয়োজন।  বেশির ভাগ মেয়ে যারা হাজব্যান্ডের উপর নির্ভরশীল, তারা অনেক কষ্ট হলেও সংসারে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে।  

আমার এক কলিগ মানে আমার আগের অফিসের একজন সিনিযর আপা ছিলেন তখন আপা ডিভোর্সি ছিল বেশ কয়েক বছর আগের কথাতার ছোট ছেলে দুটো তখন হাজব্যান্ডের কাছে থাকতো ‍আপাকে সবসময় দেখতাম মানসিকভাবে খুব অসিথর যতটুকু জেনেছি তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন ভালো ছিল না বলে ডিভোর্স হয়েছে। হাজব্যান্ড তেমন খারাপ ছিল না অনেকদিন পর কিছুদিন আগে বাসে আপার সাথে আমার দেখা। গল্পের ফাঁকে এক সময় ‍আপাকে বললাম আপনার ছেলে দুটো তো বড় হয়ে গেছে, এখন কার কাছে থাকে? আপা বললো, তার কাছে থাকে। এক বছর আগে ওদের বাবা মারা গেছে খুব মলিনভাবে কথাটা বললো আপা দ্বিতীয় বিয়ে করেননি এখানে দুজনের মধ্যে তৃতীয় পক্ষই তাদের জীবনটা বিষিয়ে তুলেছিল, যার জন্য তারা বিচ্ছেদ বেছে নিয়েছিলেন সেদিন যদি দুজনই তৃতীয় পক্ষকে গুরুত্ব না দিত, তাহলে হয়তো তাদের জীবনটা আজকে অন্যরকম হতো

ফেসবুকে দেখেছিলাম বিবাহ বার্ষিকীতে একজন লিখেছেন, ’সবার প্রার্থনায় এইটুকু থাকুক, এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় বিপন্ন সংসার টিকে থাকুক, তবুও এক জ্বলজ্বলে দুপুরের (সন্তানের) মায়ায়।’  এই কথাটাও তো চরম সত্য, উনার মতো অনেকে আছে সন্তানের মুখের দিকে চেয়ে, বিপন্ন সংসারটা যদি আবার ঠিক হয়ে যায় সন্তান হচ্ছে সেতু, যা দুজনের মধ্যে সম্পর্কটাকে মজবুত করে।

দুটি মানুষ দুই প্রান্তের, দুজনের চিন্তা, ভাবনা, সংস্কৃতি আলাদা, কিন্তু সব পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো হচ্ছে মানুষের একটা বড় গুণ দুজনের দুজনার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাবোধ থাকা খুব প্রয়োজন। আপনার সংসারে আপনি অনেক কিছু মানতে পারছেন না, কিন্তু আপনাদের মধ্যে ভালোবাসার আলোটুকু এখনও শেষ হয়নি, তাহলে ভাবুন না যেখানে ভালোবাসা আছে সেখানে অনেক কিছু জয় করা সম্ভব, ক্ষেত্রবিশেষে মানিয়ে নেওয়াও সম্ভব!

লেখাটি ১,৫৫১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.