বিতর্কিত বিষয়, তবু হোক অনাবৃত

0

রাখি আক্তার:

আবারও ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে চার বছরের এক শিশুকে।

প্রিয় পিতৃতান্ত্রিক সমাজ, এখন আপনি কী বলবেন? এখনও কি বলবেন ধর্ষণের জন্য নারীই দায়ী, দায়ী তার পোশাক, তার চলাফেরা? ধর্ষণ, সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্ট, এগুলোর জন্য যারা নারীর পোশাক আর অবয়বকে দায়ী করছেন, লেখাটা তাদের জন্য। আবারও বলছি লেখাটা তাদের জন্য।

প্রিয় পুরুষ, রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন আপনি, আর পাশ থেকে অল্প বয়সী, মাঝ বয়সী, নিজধর্মী, ভিন্ন ধর্মী, বেপর্দা, পর্দানশীন যে কোনো নারী হেঁটে গেলে আপনার পুরুষাঙ্গের সাথে সাথে আপনার হাতটাও চুম্বকের মতো উপরে উঠে যায়, আর নারীটির স্পর্শকাতর জায়গা ছুঁয়ে দেয়, তখন আপনার মাথায় নারীর পোশাক, ধর্ম-অধর্ম, ছোট, বড় এসব কিছু থাকে না।তাহলে আপনাদের মাথায় কী থাকে তখন? কী সুখ পেলেন একটু ছুঁয়ে দিয়ে?

চার-পাঁচ বছরের শিশুর সাথে খেলছেন, হঠাৎ আপনার জৈবিক চাহিদা জেগে উঠলো। শিশু তো কী হয়েছে, ছোটো হোক আর বড় হোক, আপনার চাহিদা মেটানোর রাস্তা তো ওর আছে। যেন নাই মামার চাইতে কানা মামা ভালো, ব্যস চুম্বকের মতো উঠে গেল আপনার পুরুষাঙ্গ। আপনার আর কী দোষ, দোষ তো সব আপনার পুরুষাঙ্গের, যে যখন তখন চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে।

যে শিশুটির বক্ষে মাংসপিণ্ডের অস্তিত্ব নেই, তার নিষ্পাপ নরম বুক খামচে কী তৃপ্তি পেলেন? তাকে ধর্ষণ  করে প্রমাণ করলেন পোশাক নয়,  বয়সও নয়, আপনার বেহুদা নিয়ন্ত্রণহীন পুরুষাঙ্গটি ধর্ষণের জন্য দায়ী,  সাথে দায়ী আপনার মানসিকতা।

শিক্ষক হয়ে কাউকে পড়াচ্ছেন, দিলেন ছাত্রীর পিঠে হাত বুলিয়ে। ক্লাসে বেতের বদলে ছাত্রীর পিঠে বারবার নিজের হাতখানি মালিশ করলেন, আসলে শাসন করলেন? না  নিজের চাহিদা মেটালেন? কী সুখ পেলেন? বাড়ির গৃহকর্মিরাও হয় আপনাদের শিকার। তাদের আদা-রসুনের গন্ধটাও আপনাদের কাছে মাঝে মাঝেই যখন আবেদনময়ী পারফিউমের গন্ধ হয়ে ওঠে, অমনি জেগে ওঠে আপনার পুরুষাঙ্গটি। দোষ তো আপনার না, দোষ আদা রসুনের গন্ধ ছড়ানো মেয়েটির।

প্রিয় পুরুষ, আপনি কি জানেন, আপনার একটু স্পর্শ ছুঁয়ে দেওয়া নারীটিকে কতোটা মানসিক যন্ত্রণা দেয়? সারাজীবন পুরুষের প্রতি ভয় আর বিতৃষ্ণার জন্ম দেয়।

প্রিয় পুরুষ, আপনি কি জানেন ভূত হিসেবে নারী যাকে কল্পনা করে, সে কিন্তু একটা পুরুষের অবয়ব। ওটা আসলে ছেলেবেলা থেকে লালন করা পুরুষের ভয়ের অবয়ব, যাকে নারী ভূত মনে করে ভয় পায়। এজন্য তো আপনারা নারীকে দুর্বল আর ভীতু ভাবেন।ঈশ্বর আপনাদের অনেক ক্ষমতা দিয়েছেন, তা না হলে কারো মনে এভাবে ছাপ ফেলতে পারেন!

প্রিয় পুরুষ, নিজেকে বাঁচানোর জন্য এসব অযৌক্তিক যুক্তি দাঁড় করানো বন্ধ করেন। ধর্ষণ করলেন, নারীর শরীরে খামচি কাটলেন, মাংসের স্বাদ নিলেন, সব তৃপ্তি আপনিই নিলেন, তারপর ও  বেচারা নারীটির পোশাককে কেন দোষ দিলেন? একটু তো ইনসাফ করেন। চক্ষুলজ্জা বলে কিছু তো একটা আছে, তাকে আর বিসর্জন দিয়েন না। পাপ সব সময় পাপ।তাকে ঢাকতে গিয়ে শাক দিতে আর মাছ ঢাকা দিয়েন না। তার চেয়ে বরং নিজের  মানসিকতার পরিবর্তন করুন, নিজের জৈবিক চাহিদার লাগাম টেনে ধরুন।

কিছু নারীকে বলছি, নিজেরা সচেতন হোন। আপনার সমাজ এখনও আপনাকে নিরাপত্তা দিতে শেখেনি। তাই নিজের দায়িত্ব নিজেই নিন। রাত বিরাতে কারও ডাকে (হোক সে যতোই আপনজন) অনিরাপদ স্থানে না গিয়ে নিজের নিরাপত্তা নিজে দিতে শিখুন।

তা না হলে এ সমাজের কিছু পুরুষ আপনাকে রাত বিরাতে ঘরেবাইরে ধর্ষণ করবে, আর সে দোষ আপনার পোশাক আর চলাফেরার উপর চাপাবে। সতর্ক হোন। পুরুষের উপর নয়, আস্থাটা নিজের উপর রাখুন।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও পাবলিক হেলথ গবেষক।

লেখাটি ২,৫৯৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.