আমি কেন নারীবাদী হইলাম! একটি প্রতিক্রিয়া

তৃষ্ণা পাল:

অনলাইন পোর্টাল জাগো নিউজ টুয়েন্টি ফোরে একজন নারী লেখক ‘যে নারী পুরুষের প্রিয় হতে পারে না, সে হয়ে ওঠে নারীবাদী’ শিরোনামে একটি লেখা লিখেছেন। শিরোনামটি পইড়াই আমার রীতিমতো বমি পাইতেসিল। তবুও জোর পুর্বক লিখাটা পড়লাম বিষয়টি কী তা বোঝার জন্য। 
পড়ার পর মনে হইলো এই জাতীয় বুলশিট বহু বছর পড়ি নাই। আর কী কী মনে হইলো তা আর নাই বলি।
তবে কিছু বিষয় না বইলা ঠিক থাকতে পারলাম না।

প্রথমত বলি, আফা, আমি এই দেশের কোন এক জেলা শহরের এক হিন্দু যৌথ পরিবারের এক আদরের কইন্যা। আহ্লাদের কিছু নমুনা দেই আপনারে। এখন ও আমার বালিশে ঘুমানোর অভ্যাস কম। কারন আমি বাপ, জেঠা, বড়মার হাতে, বুকে, পেটে ঘুমাইয়া অভ্যস্ত। ভার্সিটি তে উঠার আগ পর্যন্ত নিজ হাতে খুব একটা ভাত খাই নাই। এবং এখন পর্যন্ত আমার বাপের বিরাট আদরে ‘বাঁদর’ হইয়া দিন যাপন করিতেসি। রাশভারী বড়ভাই (জেঠাতো) আছেন একজন। তিনি এখন ও উৎসব এর দিন গুলি তে আমারে নিজ হাতে খাইতে দেন না। এই বুড়াকালেও আমি তাঁর কাছে বাচ্চা! 

মেয়েবন্ধুর চেয়ে ছেলেবন্ধু বেশি। শুধু বেশি না বড়ই বেশি। এমন কি বয়সে বড় অনেক বন্ধু ও আছেন। তাদের সাথে আমার দারুন আন্ডারস্ট্যান্ডিং। ভালোবাসি। তাদের সাথে আমি আড্ডা দিয়া শান্তি পাই। কখনো ছেলে মেয়ে আলাদা ভাবি নাই। মানুষ ভাবসি সকলরে।

স্বল্প শিক্ষিত বাবারে কখনো দেখি নাই মেয়ে বলে আমারে আলাদা চোখে দেখতে। সবসময় বলেন ‘ও আমার বড় সন্তান’। অনার্স, মাস্টারস শেষ করার পরেও কেবল মাত্র তাঁর আগ্রহে আমি CA করি, ঢাকা ভার্সিটিতে PGD করি। ফলস্বরুপ বিবাহে বাধা! এত পণ্ডিত মেয়ে রে কে বিয়া করে (পাত্রপক্ষের অভিমত)। এরপর ও আমার বাবার মুখে কোন উচ্চবাচ্য নাই। বরং তাঁর অভিমত আমি যেন আরেকটা মাস্টার্স করি। তাঁর মেয়ে হবে ডাবল MA ! 

এই মানুষটারে আমি কোনভাবেই স্বল্প শিক্ষিত বলতে নারাজ। তাঁকে সবসময় আফসোস করতে দেখি কেন হিন্দু আইনে মেয়েরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হয় না। ছেলে যেভাবে দুনিয়ায় আসে মেয়েও ঠিক একই ভাবে পৃথিবীর মুখ দেখে। একই সমমানের পরীক্ষা দিয়া ক্লাস ওয়ান থেইকা বিশ্ববিদ্যালয় পার করে। বাপ দুনিয়া থেকে গেলে ছেলেটা আর মেয়েটা সমান ভাবে কাঁদে, কষ্ট পায়। তাহলে সম্পত্তি কেন শুধু ছেলেটাই পায়? 
এইটা আমার বাবার অভিমত ! 

প্রতি বছর তাঁকে একবার দেশের বাইরে যেতে হয় চিকিৎসার জন্য (খুব অসুস্থ উনি)। তাঁর ২৪ বছর বয়সী এক ছেলে থাকা স্বত্বেও আমাকেই সাথে যেতে হয়। কারন ডাক্তারের চেম্বারে আমি ছাড়া দ্বিতীয় কোন ব্যক্তির উপর ভরসা করতে পারেন না কখনোই (বয়স হলে বাবারা বাচ্চা বাচ্চা হয়ে যায়)।

আমি মনে করি না আমিই দুনিয়ার একমাত্র যে কি না এত আদর সোহাগ পাইসে পরিবার থেইকা। এরকম বহু আদরের সন্তানের কাহিনী আছে এই সমাজে। আবার উলটা চিত্রও আছে ! সেই সংখ্যাটাও বিশাল ! 
তবুও এতো বিতং কইরা পারিবারিক বিষয়গুলা বললাম, নিজের ঢোল পিটাইলাম। কেন পিটাইলাম এবার সেই প্রসংগে আসি!

এতো আদর আহ্লাদ পাওয়ার পরও, কোন নিদারুণ মানসিক নির্যাতন এর আঘাত বুকে না নিয়াও আমি নারীবাদী। ভীষণ নারীবাদী। 
স্বামীর বড় ভালোবাসার স্ত্রী হয়েও বেগম রোকেয়া ছিলেন নারীবাদী! উপমহাদেশীয় সমাজের মেয়েদের বিদ্যাশিক্ষার জন্য শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত যিনি কাজ করে গেছেন, সাথে তার স্বামীও! 

আচ্ছা এইটা তো আমরা সবাই জানি। আরেকটা গল্প বলি আপনারে! যতদুর জানি আপনি বিশাল নামকরা এর বিশ্ববিদ্যালয় এ আছেন। আইচ্ছা আপনি কি জানেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর প্রথম নারী শিক্ষার্থী ছিলেন আরেক নারীবাদী। নাম তাঁর লীলাদেবী। কেউ আদর কইরা, সরকারি ভাবে আইন কইরা নিয়া তাঁরে ভর্তি করান নাই। সারা পুর্ব বাংলার শিক্ষিত সমাজ এর সাথে যৌক্তিক তর্ক করে, সমাজকে চ্যালেঞ্জ করে জয়ী হয়ে তবে তাঁকে সেখানে যায়গা করে নিতে হয়। শত শত ছেলের সাথে কেবল একজন মাত্র মেয়ে ছিলেন তিনি। কতটা সাহস আর শক্তির প্রয়োজন ওই যুগে এরকম সিদ্ধান্ত নিতে বুঝতে পারছেন? তাঁর শারিরীক শক্তির কিছু নমুনা দেই আপনারে……… . লাঠিখেলা, সাইকেল চালানো এমন অনেক কিছুই পারতেন তিনি …….

এরকম আরো বহু কাহিনী আছে তাঁর। আর এই কথা গুলি আমি কই থেইকা জানলাম জানেন ? আরেক কট্টর নারীবাদী তসলিমার (আপনাদের ভাষায় বেদ্দপ) বই ‘নষ্ট নারীর নষ্ট গদ্য’ থেকে ।

ও আইচ্ছা ……… আপনের ব্যাংক একাউন্ট আছে তো, না? না ……. আপনের টেকাটুকার হিসাব চাই নাই।

আরেক পশ্চিমা নারীবাদী গো গল্প শুনাইতে চাই। তারা আন্দোলন করেছিলেন, রাজপথে সোচ্চার হয়ছিলেন নারীদেরও ব্যাংক এ হিসাব খোলার অধিকার নিয়ে। জানেন নিশ্চয়ই একসময় মেয়েদের ব্যাংক একাউন্ট খোলার ও অধিকার ছিল না। ছিল না ভোটাধিকার। এই যে বাংলাদেশের অর্থনীতি…… যা দাঁড়িয়ে আছে অনেকাংশে পোষাক শিল্পের উপর ভর করে সেই পোষাক শিল্পও দাঁড়িয়ে আছে লক্ষ লক্ষ নারী শ্রমিকদের উপর ভর করে। এই কল কারখানায় কাজ করার অধিকার ও তো ছিল না নারীদের ! 

এগুলা যে নারীদেরও অধিকার এই কথাও তো প্রথমে উদয় হয়েছে নারীবাদীদেরই মনে !
এরকম আরো বহু উদাহরণ আছে, যা লেইখা শেষ করা যাইবো নাহ……… গুগোল মামা আছেন ………মন চাইলে সার্চ দিয়ে কিছু পড়ালেখা কইরেন।

বলেন আফা নারী হইয়া নারীবাদী গো আর কোন কোন অবদান আপনে অস্বীকার করবেন? 
আরে ৭১ এর যুদ্ধে যত মা-বোন নির্যাতিত হয়েছে, দিনের পর দিন পাশবিক নির্যাতনে যারা পাগল হয়ে গেছিলেন, উন্মাদ হয়ে গেছিলেন, দিনের পর দিন নোংরা বাংকারে থাইকা যাদের চামড়ায় ঘা হইয়া সাদা সাদা উকুন হইয়া গেছিলো (আহারে, কী কষ্ট! তাদের সুস্থ করতে পশ্চিমা দেশগুলা থেইকা কারা আগাইয়া আসছিলো জানেন? ওই মেয়েদের, মা দের , যুদ্ধশিশুদের বাঁচাইতে বঙ্গবন্ধু রে কারা সাহায্যের হাত বাড়াইয়া দিসিলো জানেন? ওই মায়েদের, মেয়েদের দেইখা বঙ্গবন্ধুর গগন বিদারী কান্নায় কারা এগিয়ে এসেছিল জানেন? 
আরেক নারীবাদী মা ডঃ নিলীমা ইব্রাহিম এর ‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি ‘ এই একটা বই পইড়েন অন্তত!

আরো বহুত আজেবাজে কথা আপনে বলসেন!
বৃহন্নলাদের গালি হিসেবে ব্যবহার করার মত নোংরামি আপনে করসেন। কিছুই আর কইতাসি না এখন সেগুলি নিয়া, কারণ বীরাঙ্গনাদের কাহিনীগুলা মনে পড়ে গেলে আমি আর স্থির থাকতে পারি না। আমার যন্ত্রণা হয় খুব। ক্রোধান্বিত হয়ে যাই খুব ! তাই আজকের মতো ইস্তফা দিলাম !

পরিশেষে : উপরওয়ালা য্যান দুনিয়ায় এই রকম ছাগলচরিতম আর একখানও না পাঠায় !

শেয়ার করুন:
  • 619
  •  
  •  
  •  
  •  
    619
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.