BLACKOUT FOR WOMEN ক্যাম্পেইন ও নার্সিসিস্ট এক্টিভিস্টগণ

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

বাংলাদেশের কিছু মানুষ ক্যাম্পেইন বলতে শুধু নির্বাচনি ক্যাম্পেইন বোঝে। ক্ষমতায় যাওয়ার যুদ্ধে ভোটারের সমর্থন আদায়ের উদ্দেশ্যে অংশগ্রহণকারী দলগুলো একটি নির্দিষ্ট সময় ধরে ক্যাম্পেইন করে, ভোট চায়। তারপর ভোটাভুটি শেষ তো, সব শেষ। কেউ জেতে, কেউ হারে। ব্যস।

কিন্তু নির্বাচনি ক্যাম্পেইনের বাইরেও ক্যাম্পেইন শব্দটার ব্যাপ্তি বিশাল। পৃথিবী জুড়ে, বিশেষ করে, অধিকার আদায়ের আন্দোলনে বা কোনো বিষয় সম্পর্কে নিছক জনসচেতনতা তৈরির জন্যও ক্যাম্পেইন একটি এডভোকেসি টুল। কোনো পলিসি তৈরিতে বা নীতি নির্ধারকদের নজরে কোনো বিষয়কে আনতেও ক্যাম্পেইন হয়। ডেভেলপমেন্ট সেক্টরে ক্যাম্পেইন খুব কমন হলেও, অন্যান্য ক্ষেত্রেও সেটি সমানভাবে ব্যবহৃত।

ধান ভানতে শিবের গীত গাইলাম। শুধু এইটুকু বোঝানোর জন্য যে, নগদে ফল পাওয়ার বাইরেও ক্যাম্পেইনের উদ্দেশ্য ও ব্যবহার রয়েছে পৃথিবীব্যাপী এবং ভিন্ন ভিন্ন ক্যাম্পেইনের টার্গেট গ্রুপ ভিন্ন, কৌশলও ভিন্ন। যেমন ধরুন, প্রান্তিক মানুষের জন্য ক্যাম্পেইনের কৌশল আর তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা মানুষদের জন্য কৌশল এক নয়। আবার, শিশুদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল, আর অভিভাবকদের কাছে পৌঁছানোর কৌশল এক নয়। কোনোটার লক্ষ্য থাকে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছানো, কোনোটার টার্গেট দেশের সীমানা ছাড়িয়ে যায়।

এখন আসল কথায় আসি। কাল BLACKOUT FOR WOMEN TODAY নামে ফেসবুকবিত্তিক একটি ক্যাম্পেইন চলেছে পৃথিবীব্যাপী। সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রোফাইলের ছবিটিকে কালো করে রাখা। আহ্বান জানানো হয়েছে শুধুমাত্র নারী ফেসবুক ব্যবহারকারীদের। কোনো জোড়াজুড়ি নেই। যার ইচ্ছা পালন করবে, যার ইচ্ছা করবে না।

এই ক্যাম্পেইন ইভেন্টটির উদ্যোক্তা অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক The RED HEART CAMPAIGN. অস্ট্রেলিয়ান সাংবাদিক এবং ফেমিনিস্ট Sherele Moody এবং কিছু ভলান্টিয়ার, যারা কিনা নানারকম ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স থেকে বেঁচে ফিরেছেন, তারা মিলে এই  ক্যাম্পেইনটা চালায়। The RED HEART CAMPAIGN নারী ও শিশুদের সাথে ঘটা সকল প্রকার সহিংসতা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে কাজ করে। বিশেষ করে স্বামী/পার্টনার কর্তৃক নির্যাতন, গৃহ নির্যাতন এবং পারিবারিক নির্যাতনের বিরুদ্ধেই এদের কাজ। প্রোফাইলের ছবি কালো করার মাধ্যমে নির্যাতনের প্রতিবাদের পাশাপাশি, ৬০০ এরও অধিক নারী ও শিশুকে স্মরণ করা হয়েছে এই ইভেন্টের মাধ্যমে, যাদের ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে। আরো জানতে আগ্রহীদের জন্য নিচে লিংক দেয়া হলো। 

অনেকেই এই ক্যাম্পেইনে বিরক্ত হয়েছেন। কারো কাছে হাস্যকর লেগেছে। কেউ ফেসবুকের নারীবাদিদের ম্যাচিউর হতে বলেছেন। কেউ আবার তিনমাস মুখ দেখাতে নিষেধ করেছেন। আমি অবাক হয়ে এসব চেতনার আধারদের অসংবেদনশীলতা, পরমত অসহিষ্ণুতা, অন্যের কাজকে অসম্মান করার প্রবণতা  এবং মগজ ভর্তি অন্ধকার দেখলাম।

এই উনারাই জীবনে বহুবার ফেসবুকে তাদের প্রোপিক বদলেছেন বিভিন্ন দাবীতে। কখনো সুন্দরবনকে বাঁচানোর দাবীতে, কখনো যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবীতে, কখনো বাক স্বাধীনতার দাবীতে। Muzzle me not প্রোপিক এখনও অনেকের প্রোফাইলে ঝুলতে দেখা যায়। অথবা ধরুন, ২০১৩ তে শাহাবাগে একসাথে মোমবাতি জ্বেলে বা বেলুনে চিঠি বেঁধে উড়িয়ে দিয়ে কী লাভ হয়েছিল?  তখন কি উনাদের একবারও মনে হয়েছিলে যে, উনাদের এইসব কাজ ইমম্যাচিউর, হাস্যকর বা শহুরে স্ট্যানবাজী? না মনে হয়নি। কারণ উনারা নারসিসিস্ট, আত্মপ্রেমী। নিজেরা করলে উনাদের কাছে সব ঠিক আছে। শুধু গোল বাঁধে যদি নারীবাদিরা কিছু করে।

ফেসবুকে উনারা সব করতে পারেন। রাজনীতি থেকে অর্থনীতি, পরচর্চা থেকে সাহিত্যচর্চা, গলাগলি থেকে গালাগালি, পরিবেশবাদ থেকে মৌলবাদ, ডাক্তারী থেকে মোক্তারি, আস্তিকতা থেকে নাস্তিকতা অব্দি। অশ্লীল কৌতুক বলতে পারেন, ট্রল করতে পারেন,  খেলাধুলা করতে পারেন, চাই কি প্রেম-বিয়েও করতে পারেন। কোনো অসুবিধা নাই।

শুধু নারীর প্রতি বৈষম্য নিয়ে কেউ কিছু বলতে পারবে না। সহিংসতা নিয়ে কিছু বলতে পারবে না, জেন্ডার সমতার কথা বলতে পারবে না। তাহলে এক্টিভিস্টরা তাকে গালি দেবে। তার গায়ে ফেসবুক নারীবাদি, শহুরে নারীবাদির তকমা লাগাবে। বলবে, এইসব নারীবাদির বাস্তবতা সম্পর্কে কোন ধারণা নাই। এরা কিট্টিপার্টি করে, অচ্ছুত। সংসারে মা, বোন, ননদ, শাশুড়ী ইত্যাদি নারী চরিত্রররা কত খারাপ সেইটা নিয়ে স্ট্যটাস দেবে (যেনো এই চরিত্রগুলা পুরুষতন্ত্রের বাইরে বাস করে!!)। অথবা রায় দেবে যে, এই নারীবাদিরা অসুখী, স্বামীর/ পুরুষের সোহাগ এদের কপালে জোটে না, এরা ফ্রাস্টেটেট। ফেসবুকে লেখালেখি করা সকল নারীবাদীর জীবন এইসব ভালো পুরুষ ও নারীদের মুখস্ত।

উনারা সব জানেন। কেউ কেউ এককাঠি সরেস হয়ে এইসব নারীবাদিদের মুখে মুত্র ত্যাগ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করবে। কেউ আবার অনলাইনে বসেই আপনার চৌদ্দগুষ্ঠিকে ধর্ষণ করবে।

যাহোক, আপনারা জনপ্রিয় মানুষ। আপনাদের অনেকের কাজই আমি মুগ্ধ হয় দেখি। আপনাদের একেকটি কথায় অনেক ইমপ্যাক্ট তৈরি হয় সমাজে। নারী ও শিশুর প্রতি অন্যায়, নির্যাতনের বিরুদ্ধে সেই পজিটিভ এনার্জিটাকে কাজে লাগাবেন আশা করি। অন্যের দিকে চট করে আঙ্গুল তোলার আগে একটু ভাবুন দয়া করে। মাঝে মাঝে নিজেকেও প্রশ্ন করুন।

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1422620727775307&id=910789112291807

লেখাটি ১,৪৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.