ধর্ষকদের মিছিল কি জিতেই যাবে শেষপর্যন্ত?

0

সালমা লুনা:

সৎ বাপ থেকে শুরু করে চাচা- মামা, ফুপা- খালু, দুলাভাই- বিভিন্ন পদের ভাই, প্রাক্তন -বর্তমান স্বামী হয়ে বাপে এসে ঠেকেছে । রাজনৈতিক দলের ক্ষমতাবান থেকে শুরু করে শিক্ষক, বস, সহপাঠী সহকর্মী হয়ে বন্ধু – কে নেই এই মিছিলে?

ধর্ষকের এই মিছিলই তাহলে জিতে যাবে শেষ পর্যন্ত? 
তারাই শেষ দৃশ্য ঠোঁটের কোণে তীর্যক হাসি নিয়ে ফটোসেশন করবে?
কেউবা আবার পুলিশালয়ে সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকবে। 
পুলিশের সামনে চেয়ারে বসে থাকবে – যেন সম্মানিত অতিথি। পাশে ধর্ষিতা করজোরে দণ্ডায়মান।
কোথাও পাথরে রক্তাক্ত কোথাও জরিমানা দেয় ধর্ষিতাই ! কোথাও ন্যাড়ামাথা নত মস্তক। 
হবেই তো!
সে যে অপরাধী! 
তার অনুমতি ছাড়া তাকে স্পর্শ করার স্পর্ধা দেখিয়েছে যে অমানুষ সে ক্যামেরায় তাকিয়ে ছবি তোলে। সে নত মস্তকে বসে থাকে – অপরাধী ।

রাগে ফেটে পড়তে চাই । ঠিক জুত হয়না ।
দুঃখ নিয়ে ভাবি কেন আমার এমন হলো ?
কারণটাও বুঝি । 

ধর্ষণ তো হচ্ছে রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায়ই । রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতায় থাকা নারীদের প্ররোচনায় অথবা ঔদাসীন্যে । 
জ্বি ঠিক বুঝেছেন। ঠিকই দেখেছেন । যা লিখেছি তা আমি বিশ্বাস করি ।

ওই তুফানের বউ শ্বাশুড়ি আর বউয়ের বড় বোনের মতো মানসিকতার নারীরাই রাষ্ট্রের উচ্চ উচ্চ পদে আসীন আজ। 
কেননা এই ধর্ষণ বিষয়ে আজ অবধি কাউকে, কোন ক্ষমতাবান নারীকে মুখ খুলতে দেখলাম না। উদ্বেগ প্রকাশ করতে দেখলাম না। যন্ত্রণায় অস্থির হতে দেখলাম না। ছুটে গিয়ে বুকে জড়িয়ে আশ্বাস দিতে দেখলাম না – হবে রে মা , হবে। তোর এই অপরাধীর শাস্তি হবে। হতেই হবে। আমি এবং আমরা থাকতে তোর দুঃখ নেই। যা হয়েছে তা বদলে দিতে পারবো না, কিন্তু দেশটাকে বদলে দিতে পারবো। এই দেশ ধর্ষকের নয়, কিছুতেই হতে পারে না।

আহ্! আমি দিবাস্বপ্ন দেখি কেন যে!

ঘুম ভেঙে সেই কদর্য চেহারা সকলের। মানুষগুলো বলাবলি করে পোষাক কেমন পরেছিলো। রাতে বাইরে যাবে আবার ঢঙ। বন্ধুর জন্মদিনে যাবেই কেন! সবকিছুই আসলে ধর্ষিত হতে। জানে না পুরুষ কেমন হয়!
হ্যাঁ জানে তো! কিন্তু পুরুষরা যে আবার বলে সব পুরুষ এক নয় – তাই বিশ্বাস করে। বাপকে চাচাকে শিক্ষককে কলিগকে বন্ধুকে ধর্ষক ভাবতে চায় না। 
তাই কাছে যায়। হাত ধরে। কাঁধে মাথা রাখে।

তবুও বাঁচতে পারে কই?

অথচ পুরুষগুলো যাদের নামের আগে বিশেষণ আছে ‘সেনসিবল’ তারা বলাবলি করবে পয়সার বখরা পায়নি বুঝি ঠিকমতো। খ্যাঁ খ্যাঁক করে লোভের থুতু ছিটানো হাসি। ফেসবুকে এগুলো দেখা যায় না, তবে দিব্যি বোঝা যায়। 
ফেসবুকের সেনসিবল পুরুষরা খুশি হতে পারে না নারীর ধর্ষণের প্রতিবাদে, অত্যাচারের প্রতিবাদে, পৃথিবী জুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রতিবাদে নারীরা বারো ঘন্টা নিজের চেহারা ঢেকে রাখলে। 
টিটকারি দেয়। যৌক্তিকতা কপচায়।

পৃথিবী নরনারীর মিলিত সৌন্দর্যের প্রতিরূপই যদি হবে তবে একজনের জন্য আরেজনের বেঁচে থাকাটাই মুশকিল হয়ে গেলে সে প্রতিবাদ বা অভিমানে নিজের চেহারাটা লুকিয়ে যদি বুঝতে বলে, দেখো, আমি যদি নাইই থাকি তবে কেমন হবে তোমার একার পৃথিবী ” – তবে ব্যঙ্গবিদ্রুপে ফেটে পড়ে কেন তারা?

যারা এমন করে তাদের স্বজাতিরাই তো ধর্ষণ করবে ! বুক ফুলিয়ে , কাঁধ উঁচিয়ে বুকে থাবা মেরে নিজেকে ধর্ষক বলতেও লজ্জা পাবে না।

যে নারী নারীদের সচেতন করার জন্য অনলাইনে তোলপাড় করে, পত্রিকা পোর্টাল চালিয়ে ফেসবুকে প্রতিদিন লেখালেখি করে কিংবা কোন ইভেন্ট করে সক্রিয় থাকে। ‘সেনসিবল’ মানুষরা সবার আগে তার ঘরের খোঁজ নেয়। 

কী? না , তার ভালোবাসা (দুই পদেরই) নাই, সে বঞ্চিত বলে আজ তার এই দশা। সে নিধর্মী কীনা – ইটস আ ভাইটাল ইস্যু। 
অহো! সে ঘরভাঙা নারী? তবে তো হয়েই গেলো!

চরিত্র! ওই একটি জিনিস বটে নারীর! যে কেউ চাইলেই ওটি খসিয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ধর্ষক বনে যেতে পারে।

এসব দেখেশুনে তাই নিস্পৃহ থাকার চেষ্টা করি, ধর্ষকের মানসিকতা খুবলে খেয়েছে এবং খাচ্ছে যে জাতিকে নিরন্তর তার ধর্ষণ থেকে মুক্তি অতি সহসাই আসবে বলে মনে হয় না।

এই সব পরোক্ষ বা ধর্ষক বা ধর্ষকের উষ্কানিদাতাদের মদদদাতা এদের হৃদয়হীন পুরুষালী মস্তিষ্ক আর প্রত্যক্ষ ধর্ষকদের মদদদাতা এই রাষ্ট্র, যাদের সক্রিয় সহযোগীতায় তিনমাসের শিশু থেকে ষাট বছরের নারীও ধর্ষিত হচ্ছে । 
এই রাষ্ট্র যেদিন উদ্যোগ নেবে সেদিনই কেবল সম্ভব এটি বন্ধ হওয়া ।

কেবল একটামাত্র আইন, আর তার একটা দুটার তড়িৎ বাস্তবায়ন তাহলেই সুড়সুড় করে পুরুষগুলো ধর্ষক থেকে মানুষ হয়ে যাবে। অথবা একযোগে আইন ও শাসনের তোয়াক্কা না করে পিটিয়ে মেরে ফেলা। ঘরবাড়ি আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া। ধরা পড়ার সাথে সাথে ক্রসফায়ারে নেয়া।

বড় পরিতাপের বিষয় , এরচেয়েও কম জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন। মন্ত্রীরা কথা বলেন । ফেসবুকে তাদের খ্যাংড়াকাঠি চামচগুলা খেকুড়ে হয়ে চেঁচায় অথচ এই বিষয়ে কেউ কার্যকরী পদক্ষেপ তো দূর, উঁহুটি পর্যন্ত করে না ।

প্রধানমন্ত্রী, আপনার কাছে অন্তত এই উমিদ ছিলো না! আপনি ষোলো কোটির অভিভাবক ঠিক আছে, কিন্তু একপাল ধর্ষকেরও অভিভাবক এটি কিছুতেই মানতে পারবো না ।

মাননীয়া, যা করার তাড়াতাড়ি করুন প্লিজ! চারিদিকে ধর্ষক এবং তাদের ভাই বেরাদরের অট্টহাসিতে আমরা বধির হবার আগেই কিছু একটা করুন।

লেখাটি ৬৮৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.