সমান অধিকার চাই না, বরং এক কাজ করুন!

0
সুচিত্রা সরকার:
পরম্পরায় এই চলে আসছে। ছেলে বা মেয়ের বিয়ে হলেই গুরুজনের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। তখনও আরও কিছু বাকি। সেটাই বড় দায়িত্ব সকলের। পরিবারে আনতে হবে নতুন অতিথি। নতুন দম্পতির কোল জুড়ে আসতে হবে সন্তান!
নতুন দম্পতি, নিজেদের চিনে নেবার আগেই ওই গুরুদায়িত্ব মাথায় চেপে বসে। অথবা নিজেদেরই স্বপ্ন থাকে, কোলজুড়ে ফুটফুটে এক সন্তান! যাকে কেন্দ্র করে তৈরি হবে নতুন একটি পরিবার! যে হবে বংশরক্ষার বাতি! বুড়ো বয়সের লাঠি!
তো, যে মেয়েটিকে কেন্দ্র করে, এই স্বপ্নটা দেখা শুরু হয়েছে, সে এই সমাজেরই বাসিন্দা। সে তার আশপাশে দেখেছে, শুনেছে, প্রমাণ পেয়েছে- সন্তান হিসেবে পুত্রসন্তানই ভাল। পুত্রসন্তানের মায়ের আদর বেশি। সম্মান বেশি। পুত্রসন্তান, মা বাবার অনেক দায়িত্ব নেয়- ইত্যাদি ইত্যাদি!
অতঃপর ঘর আলো করে এলো কাঙ্খিত পুত্রসন্তান! মায়ের মুখ হলো উজ্জ্বল! আত্মীয়- স্বজন সকলেই খুশি!
অথবা ঘর কালো করে এলো অনাকাঙ্খিত কন্যাসন্তান! এবার!
কন্যাসন্তানের মা, পলকে নিজের লাঞ্ছিত ভবিষ্যৎ দেখতে পায়! শ্বশুর- শাশুড়ি, বর, পাড়া, পড়শি- সকলের কটু বাক্য। গাল-মন্দ! কন্যা সন্তানের প্রতি ভালবাসা তৈরির আগেই হোঁচট খেয়ে যায় মা (মায়ের কন্যাসন্তানের প্রতি ভালবাসা কম থাকে, ব্যাপারটা এমন নয়। ভালবাসা বিদ্যমান। শঙ্কাও) !
আর বাড়ির বাকি সকলে? চুপ করে বসে থাকে না। সংসার এ যাত্রায় রসাতলে গেল বলে ঝাঁপিয়ে পড়ে! যে মাত্রায় শিশুটি জন্মের আগে উৎসাহ দেখিয়েছিল, তার চেয়ে দ্বিগুণ- তিনগুন মাত্রায় নিরুৎসাহী হয়! বংশের বাতির ব্যবস্থা রইলো না! এবার পরের বাড়ির লোককে পেলেপুষে বড় করে সেই বাড়ি পাঠাবার ব্যবস্থা করো!
সকলের এই সম্মিলিত প্রয়াসে, গাল-মন্দের ভারে, দিনে দিনে বেড়ে ওঠে কন্যাসন্তানটি! নিজের মধ্যে হয়তো গুটিয়ে যায়। অথবা সকলে মেয়েদের ভাগ্য সম্পর্কে যা বলে, তাই বিশ্বাস করতে শুরু করে। এই মেয়েটির প্রতি অবিচারের মাত্রা কতটা, এটা বোঝাতে হলে, একটা পুত্রসন্তানের সঙ্গে তুলনা করা চাই। পুত্রটিকে সবচে নামকরা স্কুলে পড়ানো চাই! নামকরা শিক্ষক। তাকে পাশ করাতে সকলের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা! কতো বড় বড় ডিগ্রি নেবে সুপুত্র! বংশের নাম হবে!
আর পরিবারের মেয়েটি? পাড়ার কোনো একটা স্কুল হলেই চলবে! কী আর পড়বে সে! যাবে তো সেই পরের ঘরেই! তারপর সেই ঘরকন্না! এ বংশের তাতে লাভ কী?
ছেলেটির বেশি বেশি পুষ্টিকর খাবার চাই। ছেলেদের কত পরিশ্রম! কত দায়িত্ব! ছেলেদের ‘জীবনের’ অনেক দাম! সেটাকে সুস্থ রাখা চাই। নইলে বুড়ো বয়সে দেখবে কে! 
আর মেয়েকে? যেকোনো কিছু খাওয়ালেই চলে! মেয়েদের অতো খেতে নেই। পুরোটাই লস প্রোজেক্ট! ক’দিন পর, যাবে তো সেই পরের ঘরেই। মনে কি আর রাখবে! রেখেই বা কি করবে! শেষকালে তো দেখবে, পরের বাপ-মাকে!
দামি জামা- জুতো, জীবন যাপনের সেরা সুবিধা- সেও ছেলেরই প্রাপ্য! মেয়েদের ‘যা কিছু একটা’ হলেই চলে! মেয়েদের অতো দিয়ে কাজ কি!
মেয়েটি, চুপটি করে সব মাথা পেতে নেয়! আর ‘পরিবারের ভাল হোক’ এই প্রতিজ্ঞায় অবিচল থাকে! 
কারণ মেয়েটি জানেই না, ওর আসলে প্রাপ্য কতটুকু! ও আরো কী কী পেতে পারতো! কারণ ওকে ওই স্বপ্নগুলো দেখতে শেখানোই হয় না! সমানাধিকার শব্দটা মেয়েটার অভিধান থেকে ছেঁটে ফেলা হয় নিঃশব্দে! মেয়েটি বড় হতে থাকে। মেয়েটি চিনতে শুরু করে! সত্য খুব কাছাকাছি চলে আসে ওর! সত্যটি এই যে- যে ঘরে মেয়েটি জন্ম নিয়েছে, এটি আসলে তার ঘর নয়। যাদেরকে ওর পরিবার ভেবেছে, এটা তার পরিবার নয়। বিয়ের পর একটি পরিবার তার জন্য অপেক্ষা করছে। তার নিজস্ব বাড়ি। নতুন মা-বাবা!
এটা ঠিক সত্যও নয়। এটা তার পরিবার মেয়েটির সঙ্গে করা অবিচারের এক ধরনের ‘কারণ দর্শানো’! তবু মেয়েদের দেখেছি, পরিবারের শত অন্যায়ের পরেই, পরিবারের পাশেই থাকে। ছেড়ে যায় না। শত হোক, জন্মের একটা ঋণ আছে তো!
আমি একটা মেয়েকে চিনি! বড়লোক বাবা যাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছে। তবু ফিরে ফিরে বাবার বাড়ি যায়! ভাইদের গঞ্জনা সহ্য করে, শ্বশুর বাড়িতে ফিরে আসে! আবার ভাইয়েরা সম্পত্তি নিয়ে বিপদে পড়লে অস্থির হয়ে ছুটে যায় তাদের বাঁচাতে! কেঁদে কেটে একাকার! আহা কন্যাজন্ম!
আরও একটা বিবাহিত মেয়েকে চিনি। বাবাকে মেরে ওর এক ভাই বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্য তিন ভাই তখন ‘সাত চড়ে রা’ করে না! মেয়েটির সে কী আকুল দশা! প্রতিবাদ করে! রুখে দাঁড়ায়! আর প্রতি উত্তরে ভাইয়ের গর্জন শোনে, ‘তোরে এসব বলার অধিকার কে দিয়েছে!’ পরে আরেকটি ঘটনায় সব ভাই একজোট হয়ে এই সিদ্ধান্ত দেয় যে, মেয়েটি আর বাপের বাড়ি যেতে পারবে না।
মেয়েটির বাবা তখন সেই ‘সুপুত্র’দের সঙ্গে গলা মেলায়, ‘এই সংসারের ব্যাপারে তোর নাক গলানোর দরকারটা কী!’
মেয়েটার বেহায়া মন তাতেও কিছু মনে করে না। হায় নারীজন্ম!
আচ্ছা, বলুন তো, যে মেয়েটা জন্ম নিল পৃথিবীতে, সে কি জানতো যে, সে জন্মাবে? সে কি ইচ্ছে করে পৃথিবীতে এসেছে? সে কি জন্মের আগেই ‘পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্য’ জেনে বসে আছে?
তাহলে কেন সে ‘নারীজন্মের’ দায় বহন করবে? কেন তার প্রতি  অবিচার চলবে, লিঙ্গবৈষ্যমের কারণে?
আমার তো মনে হয়, মেয়েটিকে বঞ্চিত করার মানে, তাকে জন্মটাকে অস্বীকার করা! পৃথিবীতে তার আগমনকে, অপমান করা! নারীজন্মের অপমান! পৃথিবীর সৃষ্টি রহস্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করা! অথচ জন্মের আগে লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষমতা তার হাতে ছিলই না।
এরকম বঞ্চনা আর অপমান কতকাল চলবে? সেই তো কত যুগ ধরে নারীবাদীরা চিৎকার করেই যাচ্ছে। অনুনয় করেই যাচ্ছে। বিনয় দেখাচ্ছে। যুক্তি দিয়ে বোঝাচ্ছে! 
তাতে হচ্ছে কি কোনো গুণগত পরিবর্তন? 
এদিকে যারা বৈষম্যটাকে স্বাভাবিক ভাবছে, তারাও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ‘নারীবাদ’, ‘পুরুষতন্ত্র’, ‘বৈষম্য’, ‘সমানাধিকার’, ‘নারী নিপীড়ন’- প্রতিনিয়ত ‘ভাঙা রেকর্ড’ এর মত এসব শোনার ধৈর্য্য আর কত থাকে? তারচে’ বরং এক কাজ করা যাক। আর তাতে করে এসব অধিকার- টধিকারের বালাই থাকবে না। কোনো নারী আর বঞ্চনার শিকার হবে না। জগতেও শান্তি বজায় থাকবে!
আসুন সকলে মিলে পৃথিবীতে কন্যা শিশু জন্মানোর প্রক্রিয়াটাকে আটকে দেই। এমন একটা পদ্ধতি বের করি, কোনো মা আর কন্যাসন্তান জন্ম দেবে না! কন্যা শিশুও ভ্রুণ অবস্থায় ‘নিজের পৃথিবীতে আগমনটা’ আটকে দিতে পারবে!
ঠাণ্ডা মাথায় একটিবার ভাবুন সমাধানটা!
৩০.০৭.২০১৭
রাত ১০.১৭ মিনিট
লালবাগ, ঢাকা

লেখাটি ১,০৮৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.