কন্যা, তোমায় দিলেম খোলা চিঠি

0

উপমা মাহবুব:

প্রিয় প্রমিতি,

জুলাই মাসের ২৪ তারিখ তোমার বছর পূর্ণ হলো এই বিশেষ দিনটিকে কেন্দ্র করে তোমাকে একটা গোপন কথা বলবো এই যে তোমার ভালো থাকার জন্য প্রতিদিন নিরন্তর আয়োজন করে চলেছি, এই তোমাকে কিন্তু আমি চাইনি আমি চেয়েছিলাম পুত্রসন্তান

না, অন্য সবার মতো আমি মোটেও মেয়ে সন্তানকে বোঝা মনে করি না আমি বিশ্বাস করি সব সন্তানই সমান যদি তারা মানুষ হয়ে বড় হয় কিন্তু কন্যাসন্তানকে নিরাপদে বড় করা এই সমাজে খুব কঠিন আমাদের, মানে মেয়েদের সামনেপেছনে, ডানেবামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নেকড়ের দল একজন মেয়েশিশুর যে শারীরিক এবং মানসিক নিরাপত্তার দরকার, সেই নিরাপত্তা আমি কীভাবে নিশ্চিত করবো এই ভয়েই আমি পুত্র সন্তান চাইতাম

কিন্তু যেদিন জানতে পারলাম আমার শরীরে কন্যা হয়ে তুমি বেড়ে উঠছো, আশ্চর্যজনকভাবে আমার ভীষণ ভালো লাগল

সেই দিনটার কথা আমার পরিষ্কার মনে আছে আল্ট্রাসনোগ্রাম করার পর ডাক্তার কোনভাবেই তোমার জেন্ডার বলতে রাজি হচ্ছিলেন না যে সমাজে পুত্রসন্তানকে বংশের বাতি আর কন্যাকে বোঝা মনে করা হয়, সেখানে এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা তোমার আব্বু ডাক্তারকে বোঝাতে সক্ষম হলো যে, বাচ্চা ছেলে হোক বা মেয়ে হোক যেকোন সন্তানেই সে খুশি অবশেষে ডাক্তার তোমার কথা বললেন তোমার আব্বুতো আনন্দে আটখানা তার যে একটা ফুটফুটে মেয়ে শিশুর বড় শখ!  সেতো আর জানে না মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়ার কত জ্বালা!

যাই হোক, সেদিনই আমি সিন্ধান্ত নিলাম আমি তোমাকে নারী জীবনের সবকিছু শেখাবো, যা আমি নিজে শিখেছি আর বছর বয়স হলো সঠিক মুহুর্ত নিজেকে বৈরি সমাজের বিরুদ্ধে সম্মান নিয়ে টিকে থাকার শিক্ষা শুরু করার আমার টিনএজ বয়সে কখনো রাতে একা থাকতে হলে সারা রাত ভাল ঘুম হতো না, বার বার মনে হতো ঘরের কোণার অন্ধকারে কোন পুরুষ লুকিয়ে আছে, অপেক্ষা করছে সবার ঘুমিয়ে পড়ার! আমি জনতাম এটা মনের ভুল, তারপরও একটা ভয় আমাকে তাড়া করতো রাতের বেলা অথবা কোন একলা মুহুর্তে এলিয়েন অথবা ভূত কখনো ক্ষতি করতে আসে না, আদতে তাদের কোন অস্তিত্বই নেই সেই সুযোগের সুযোগ নেয় নোংরা মনের পুরুষ অতএব, তোমাকে নিজের চারপাশ সম্পর্কে সবসময় সচেতন থাকতে হবে

জানি, এখন তুমি প্রশ্ন করবে, সব পুরুষই কি খারাপ? না, মোটেই তা নয় আমার টিএনএজ বয়সের সেই ভয় ভেঙ্গে গেছে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে হলে থাকতে শুরু করার পর কত ছেলে বন্ধু হতে চাইতো, তারা অজানাকে জানার, জীবনকে উপভোগ করার লোভ দেখাতো! আমি কিন্তু বন্ধু বাছাই করতে শিখে নিয়েছিলাম আর কারা আমাকে সেই কাজে সাহায্য করতো জানো?

আমার ছেলেবন্ধুরা! কেননা তারাই সবচেয়ে ভাল জানতো কোন ছেলে মেয়েদের কীভাবে দেখে, কার মনে কী লুকিয়ে আছে অতএব বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে পহেলা বৈশাখের উৎসবে অথবা বিতর্ক প্রতিযোগিতা শেষে অনেক রাতে হলে ফিরতে ছোটবড়সমবয়সী প্রিয় পুরুষরা ছিল আমার নিত্যসহচর, সবচেয়ে বিশ্বাসী মানুষ অথচ চোখের সামনে কত মেয়েকে দেখেছি ভুল পুরুষের মোহে পড়ে নিজের অনেক বড় ক্ষতি করে ফেলতে!

প্রিয় কন্যা, আমি জানি এসব কথা তুমি কিছুই বুঝতে পারবে না এগুলো বোঝার মতো বয়সও তোমার হয়নি আসলে এতোক্ষণ ধরে যে কথাগুলো লিখলাম সেগুলো তোমার জন্য লিখিনি, লিখেছি আমার নিজেকে মনে করিয়ে দেয়ার জন্য যে, তোমাকে আত্মনির্ভরশীল হয়ে সম্মানের সঙ্গে জীবনের পথে হাঁটতে সাহায্য করার যে গুরু দায়িত্ব আমি স্বেচ্ছায় কাঁধে নিয়েছি, তা এখন থেকেই শুরু করতে হবে তোমার জন্মদিনের সকাল তোমার বদলে তাই নিজেকেই শুভকামনা জানিয়ে শুরু করেছি যেন সেই কঠিন দায়িত্ব আমি ঠিকভাবে পালন করতে পারি

ইতি,

আম্মু

উপমা মাহবুব, উন্নয়ন কর্মী এবং কলাম লেখক

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 691
  •  
  •  
  • 1
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    692
    Shares

লেখাটি ১,৫৬২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.