মায়ের বুকজুড়ে এখনো পুত্রশোক

আশীষ-উর-রহমান: একটি বছর পার হয়ে গেল। সময় নাকি সব শোক ও বেদনার উপশম করে, কিন্তু ছেলে হারানোর শোক ঘোচাতে পারেনি মায়ের বুক থেকে। ছেলের কথা বলতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে আয়েশা ফয়েজ বলছিলেন, ‘আমার ৮৩ বছর বয়স। আমি বেঁচে আছি। অথচ ৬৪ বছর বয়সে আমার ছেলে আমাকে ছেড়ে গেল। শেষ জীবনে কত কষ্ট পেয়ে গেল। এই বয়সে ছেলে হারানোর শোক যে কত কঠিন, তা বলা যায় না। জীবনে তো আমি ঝড়ঝাপটা কম সহ্য করিনি। কিন্তু এখন আর আগের মতো শক্তি-সামর্থ্য নাই।’ কথা বলতে বলতে কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছিল তাঁর।
গত বছরের এই দিনে পৃথিবীর আলো-ছায়া, মায়া-মমতার বন্ধন ছেড়ে চিরতরে চলে গেছেন বাংলা সাহিত্যের জননন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ। আজ তাঁর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১১ সালে তাঁর অন্ত্রে ক্যানসার ধরা পড়লে পরের বছরের মাঝামাঝি সময় যুক্তরাষ্ট্রের একটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি আর ফেরেননি। ২০১২ সালের ১৯ জুলাই শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে মরদেহ ঢাকায় আনার পর ২৪ জুলাই গাজীপুরের পিরুজালী গ্রামে তাঁর প্রিয় নুহাশপল্লীর লিচুতলায় চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় তাঁকে। নেত্রকোনার কেন্দুয়া গ্রামে তিনি ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্মগ্রহণ করেন।

বৃহস্পতিবার বিকেলে মিরপুরের বাড়িতে কথা হচ্ছিল হুমায়ূন আহমেদের মায়ের সঙ্গে। ছোট ছেলে আহসান হাবীবের সঙ্গে তিনি এই বাড়িতে থাকেন। ঘরে হুমায়ূন আহমেদের একটি বাঁধানো ছবি। ছেলের ছবির দিকে তাকিয়ে তিনি বলছিলেন গত একটি বছর তাঁর পুত্র হারানোর শোক-দুঃখের কথা। শরীর খুবই দুর্বল। কিডনির সমস্যায় ভুগছেন। তার পরও গত একটি বছর প্রতি মাসেই অন্তত একবার তিনি নুহাশপল্লীতে গেছেন, কোনো কোনো মাসে একাধিকবারও। বলছিলেন ‘মন খুব অস্থির হলে নুহাশপল্লীতে যাই। নিজে তো এখন আর একা একা চলাফেরা করতে পারি না। শাহিন (আহসান হাবীব) সঙ্গে নিয়ে যায়। কখনো কখনো মেয়েরাও নিয়ে যায়। আল্লাহর কাছে ছেলের জন্য দোয়া করি। এ ছাড়া আর কী করব।’

কথায় কথায় আয়েশা ফয়েজ জানালেন, নুহাশ ও তাঁর বড় দুই বোন, তাদের মা গুলতেকিন খান তাঁকে দেখতে আসেন। নিনিত, নিষাদকে নিয়ে মা মেহের আফরোজ শাওন আসেন। বাচ্চা দুটোর কাছে তাঁর থাকতে ইচ্ছা হয়। কিন্তু অসুস্থতার জন্য পারেন না। বলছিলেন ‘ওরা ছোট মানুষ, একা আসতে পারে না। আমিই কারও সাথে গিয়ে মাঝে মাঝে ওদের দেখে আসি। তবে থাকি না। আমি তো জানি এই বাচ্চা দুটোকে মানুষ করা কত কঠিন। তার ওপর অসুস্থ শরীর নিয়ে ওদের কাছে গিয়ে বোঝা হয়ে থাকতে ইচ্ছা হয় না।’ ছেলের প্রতিষ্ঠিত শহীদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠটি যদি সরকারিকরণ করা হতো তাহলে একটু স্বস্তি পেতেন বলে জানালেন।

ছেলে নেই, তাঁর লেখা বইয়ের মধ্য দিয়ে ছেলের উপস্থিতি অনুভব করার চেষ্টা করেন। সব শেষে পড়েছেন হুমায়ূনের শেষ উপন্যাস ‘দেয়াল’। বইয়ের প্রসঙ্গ উঠতেই বললেন, ‘আগে ভারতীয় লেখকদের বই পড়তাম। ছেলে লেখক হওয়ার পর ছেলের বই-ই বেশি পড়েছি। ওর কোনো নতুন বই বের হলেই আমাকে এসে দিয়ে যেত। কখনো ব্যস্ত থাকলে কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দিত। ও বলত—আম্মা আমার বই না পড়লে আমার ঘুম আসবে না।’

আজ শুক্রবার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে নুহাশপল্লীতে যাবেন না তিনি। বাদ আসর বাড়িতে মিলাদ মাহফিলে আয়োজন করেছেন। বলছিলেন ‘কাল (আজ) তো অনেক লোকের ভিড় হবে। ভিড়ের মধ্যে যেতে আমার ভালো লাগে না। কয়েক দিন পরে যাব। দেশের অনেক মানুষ আমার ছেলের জন্য দোয়া করছেন। আমি তাদের সবার কাছে কৃতজ্ঞ। আমার ছেলের জন্য সবাই আপনারা আল্লাহর কাছে দোয়া করবেন।’

( দৈনিক প্রথম আলো থেকে নেয়া)

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.