ওড়নাটা ফেলে দিলে কি খুব খারাপ হবে?

0

শান্তা মারিয়া:

মাত্র সেদিনের ঘটনা। বাস থেকে নামতে যাচ্ছিলাম। স্টপেজ বলে কিছু নেই। দৌড়ে বাসে উঠতে হয়, লাফিয়ে নামতে হয়। সবটাই চলন্ত অবস্থায়। বাস স্টপেজে থামেও না, দাঁড়ায়ও না, শুধু একটু শ্লথ হয়। এরই মধ্যে প্রাণ হাতে করে চলাফেরা। নামতে যাচ্ছি ওড়না আটকে গেল দরজার ভাঙা অংশে। হ্যাঁচকা টান দিয়ে ছুটিয়ে নিলাম। জর্জেট, তাই ভাগ্যক্রমে ছিঁড়ে চলে এলো। না ছিঁড়লে প্রাণটাই যেত।

মনে পড়লো আমারই এক ছোটবেলার বান্ধবীর কথা। মেয়েটি আজ বেঁচে নেই। রিকশার চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস লেগে মৃত্যু হয়েছিল তার। বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন পড়ি, তখন আমি ওড়না পরতাম পিনআপ করে। সেটাও কম বিপদজনক ছিল না। মনে আছে একবার রাস্তা পার হতে গিয়ে আইল্যান্ডের কাঁটাতারে আটকে গিয়েছিল এক প্রান্ত। অনেক কষ্টে যখন ওড়নাটা ছাড়িয়েছি, ততক্ষণে সিগন্যাল পড়ে গাড়ি চলাচল শুরু হয়ে গেছে। আমি দাঁড়িয়ে আছি রাস্তার মাঝখানে। মোটর বাইক, রিকশা এমনকি গাড়ির চাকাতেও ওড়না আটকে গিয়ে মৃত্যুর ঘটনা কম ঘটেনি এদেশে।

আরো একটি ঘটনা মনে পড়ছে এই প্রসঙ্গে। মতিঝিলে একজন ব্যাংকার তরুণীকে উত্যক্ত করছিল মোটর বাইকে কয়েকজন বখাটে। তরুণী তার বোনের সাথে দাঁড়িয়েছিলেন আইল্যান্ডে। এই সময় তার ওড়না ধরে টান দেয় মোটরবাইক চালক। ওড়নাটি আটকে যায় চাকায়। তরুণী রাস্তায় পড়ে যান। ওই অবস্থায় বখাটেরা মোটরবাইক টান দিলে তরুণীটি রাস্তায় বেশ কিছুদূর হিঁচড়ে নিয়ে যায়। মাথায় আঘাত পেয়ে মৃত্যু হয় ওই তরুণীর।

আমি নিজে উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণী পর্যন্ত ইউরোপীয় ধাঁচের পোশাক পরতাম। ক্লাসে তো ইউনিফর্মই পরতে হতো। কিন্তু যখন কোচিংয়ে যেতাম তখন ওই পোশাক।  যদিও কো-এডুকেশন স্কুল-কলেজ। তবু কোন সমস্যা হয়নি। কারণ আমার বন্ধুরা আমাকে ওই পোষাকে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। প্রথম কয়েকদিন গেলাম। পরে সহপাঠীরা বেজায় হাসাহাসি করাতে বাধ্য হয়ে সালোয়ার-কামিজ ধরতে হলো। বাবা এই পোশাকটি খুব অপছন্দ করতেন। কারণ তার চোখে এটা ছিল অসুবিধাজনক পোশাক। তিনি বলতেন, উৎসবে অনুষ্ঠানে শাড়ি পরো। সেটা আমাদের বাঙালির পোশাক। আর স্কুল-কলেজ বা কর্মক্ষেত্রে ফতুয়া জিন্স, শার্ট-প্যান্ট বা একেবারে ফর্মাল কোট প্যান্ট পরো। সেগুলো চলাফেরায় অনেক স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। সালোয়ার কামিজ একে তো পাকিস্তানিদের কথা মনে পড়ায়, দ্বিতীয়ত এটার কাটিং এমন যে ওড়না ছাড়া পরলে বিশ্রী দেখায়। তিনি চীনা মেয়েদের ঢিলে ফতুয়া ও ঢিলে প্যান্টের পোশাকটি সবচেয়ে উপযোগী বলে মনে করতেন চলাফেরার জন্য।

আমি যদি তর্ক করার জন্য বলতাম যে ‘লোকে তাকিয়ে থাকবে, মন্দ বলবে’, তিনি মৃদু হেসে বলতেন, ‘লোকে তাকিয়ে থাকবে, তাকাতে দাও। কয়েকদিন পর আর তাকাবে না। অভ্যস্ত হয়ে যাবে’। বাড়িতে আমি বহুদিন হলো ওড়না ও সালোয়ার কামিজ বর্জন করেছি। কারণ রান্নাঘরে ওড়না ও শাড়ি আমার কাছে বড়ই বিপদের বস্তু বলে মনে হয়। টিশার্ট আর পাজামা। এর চেয়ে আরামদায়ক কিছু নেই।

আমার পরিচিত জনেরা জানেন, সেমিনার বা সাংবাদিকদের কোনো অনুষ্ঠান হলে আমি সাধারণত একটু সেজেগুজে যাই। তো, তিন বছর আগে পিআইবির একটা ওয়ার্কশপে গেছি আমার নিজস্ব অফিস থেকে। সেসময় আমি চাকরির পাশাপাশি ছোটখাটো একটা ব্যবসা করতাম, পল্টনে নিজস্ব অফিস নিয়ে। সেদিন বিদেশ থেকে কিছু প্রডাক্ট এসেছে। আমার রীতিমতো গলদঘর্ম অবস্থা। পরনে শ্রমিকের পোশাক। মানে জিন্স, টিশার্ট ও কেডস। সেই অবস্থাতেই ওয়ার্কশপে গেলাম, কারণ বেশ জরুরি ছিল সেটাও। আমাকে জিন্স ও টিশার্টে দেখে বিএনএসকের কয়েকজন সদস্য আড়ালে হাসাহাসি করতে লাগলেন। আবার একজন একটু শুনিয়েই মন্তব্য করলেন, ‘এই বয়সে শান্তা আপা ছুঁড়ি সাজার জন্য প্যান্ট পরে এসেছেন’। প্রগতিশীল একটি পেশার সদস্যের মনোভাব যদি এমন হয় তাহলে সমাজটা বদলাবে কীভাবে?

আমি ভালো-মন্দ সব কথা এখনও বাবার সঙ্গে শেয়ার করি। একথাটা উনাকে বলতে তিনি বললেন, ‘কে কী ভাবলো বা বললো সেটা ধরে যদি পড়ে থাকো তাহলে কখনও সামনে এগোতে পারবে না। তোমার যেভাবে সুবিধা সেইভাবে চলবে। তুমি তো কোনো অন্যায় করছ না। যার যা ইচ্ছা বলুক, তোমার গায়ে কি তাতে ফোস্কা পড়বে?’

তিনি আমাকে ইউরোপের উদাহরণ শোনালেন। ঊনবিংশ শতকে ইউরোপের অভিজাত নারীরা বেজায় বড়, ফোলানো গাউন পরতো। তাদের পোশাক পরতেই লাগতো এক ঘন্টার বেশি। কর্সেট পরে তাদের দম আটকে আসতো। তিন চার পরত পোশাকের উপর বিশাল একটি গাউন। দেখতে বেশ সুন্দর লাগতো তাদের। তবে তাদের পোশাক ছিল শ্রমের অনুপযোগী।  প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাদের পোশাক পাল্টে যায়। কারণ তখন অভিজাত-অনভিজাত সকলকেই পরিশ্রম করতে হয়। নারীরা ব্যাপক হারে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে। তারা সেনাবাহিনীতেও কাজ করতে থাকে। যুদ্ধে নারীরা অংশ নেয়। সবকিছু মিলিয়ে ইউরোপের ও আমেরিকার নারীর পোশাক পুরো পাল্টে যায় বিংশ শতাব্দিতে। চীন, জাপানেও একই অবস্থা। তারা তাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকগুলো তুলে রাখে উৎসবের জন্য। কাজের বেলায় বেছে নেয় স্বাচ্ছন্দ্যকে।

বৃষ্টির মধ্যে রিকশায় উঠতে গিয়ে যখন পাদানির পেরেকে ওড়নাটা আটকে গেল তখন বাবার কথাটা মনে পড়লো। সত্যিই আমাদের বাঙালি মেয়েদের পোশাক নিয়ে একটু ভাবার দরকার।

আমি বিপ্লবী কোন চিন্তাধারার কথা বলছি না। বলছি সুবিধা-অসুবিধার কথা। আজকাল টিন এজ অনেক মেয়েকে দেখি শার্ট প্যান্ট পরতে। বেশ ভালো লাগে। আমাদের গার্মেন্টস কর্মীরাও যদি এ পোশাকটি বেছে নেন তাহলে তাদের চলাফেরায় আরও অনেক গতি আসবে। গতি আসবে অফিসে, ব্যাংকে, হাসপাতালে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, আদালতসহ সকল কর্মক্ষেত্রে পেশাজীবী নারীর চলাফেরায়।  

কলে কারখানায় কাজের সময় নিরাপত্তার স্বার্থেই শাড়ি, সালোয়ার কামিজ ও ওড়না একেবারে বর্জন করা দরকার। যাতায়াতের সময়ও। লঞ্চডুবিতে দেখা গেছে পুরুষের তুলনায় নারী বেশি মৃত্যুবরণ করে। কারণ শাড়ি ও সালোয়ার কামিজ ওড়না পেঁচিয়ে যায়। ফলে নারী ডুবন্ত লঞ্চ থেকে সহজে বের হতে পারে না, সাঁতারও কাটা যায় না, অসুবিধা হয়। একই সমস্যা হয় বাস বা ট্রেন দুর্ঘটনাতেও। ভাঙা জানালা দিয়ে যত সহজে পুরুষ বের হয়ে আসতে পারে, নারী পারে না তার পোশাকের কারণে।

ফতুয়া, লম্বা কাটের কুর্তি, ঢিলে শার্ট বা টিশার্ট সঙ্গে প্যান্ট। এই হোক আমাদের দৈনন্দিন চলাফেরার পোশাক। শাড়ি চলুক উৎসবে। আর সালোয়ার কামিজ ওড়নাটা একান্ত পছন্দের পোশাক হলে না হয় তোলা থাকুক উৎসবে, অনুষ্ঠানে পরার জন্য, সুন্দর দেখানোর জন্য।

লেখাটি ২৭,২৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.