নারীকে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো পুরুষতন্ত্রেরই চাল

প্রমা ইসরাত: 

নারীই নারীর শত্রু- অনেকেই একথা বলে থাকে। আসলে কথাটার মানে হবে, “পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা ভাবনায় ঠাসা একটি মগজ সমাজের শত্রু“।

নারী পুরুষ নিয়ে এই সমাজের বাস তৃতীয় লিঙ্গের মানুষেরাও রয়েছে, কিন্তু সমাজের চোখে এখনো তারা অস্বীকৃত
পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো মানে পুরুষের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়, পুরুষতন্ত্রকে ধারণ করা সকল কিছুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সমাজে নারীরা এই পুরুষতন্ত্র নামক ভাইরাসের শিকার এই ভাইরাস শুধু পুরুষ বহন করে না, নারীরাও বহন করে যে নারীটি শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি ননদের সামনে গুটি-সুটি মেরে থাকে, সেই নারী আসলে গুটি-সুটি মেরে থাকে পুরুষতন্ত্রের কাছে 

বারবার বলতে শুনি নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে নারী প্রধানমন্ত্রী, নারী স্পিকার, নারী মন্ত্রী, নারী ডাক্তার, নারী আইনজীবী, নারী ইঞ্জিনিয়ার, নারী জাজ, নারী পুলিশ নারী আজ সর্বক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে 

কিন্তু আমি ভাবি, যে নারীটি পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার ভাইরাস বহন করে, সেই নারী সমাজের এইসব মান্যগণ্য জায়গায় গেলেও কি সমাজের আদৌ কোনো অগ্রগতি হবে?

জেন্ডার সমতা নিয়ে আমরা যারা ভাবি, বা কথা বলি, নানান বৈষম্যের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলি, আমরা জানি যে এই সমতা বা বৈষম্যের অবসান একদিনে হবে না। সামাজিক, মানসিক, রাষ্ট্রীয় সব ক্ষেত্রেই এর বাস্তবায়ন থাকতে হবে, চর্চা করতে হবে তবেই বৈষম্যের বিলুপ্তি ঘটবে।

একজন কর্মজীবী নারী আয় রোজগার করেন, একদিকে আমরা বলতে পারি, বাহ, নারী এগিয়ে যাচ্ছে। স্বামী কতোই না প্রগতিশীল(!), স্ত্রীকে বাইরে কাজ করার “অনুমতি” দিচ্ছে। নারী আজ এগিয়ে যাচ্ছে। এখন ভাবনার বিষয় হচ্ছে, সেই নারীর উপার্জন করা অর্থ কি সে নিজের সিদ্ধান্তে ব্যয় করতে পারছে?

এমন অনেক সংসার আছে যেখানে নারী আয় ঠিকই করেন, কিন্তু উপার্জনের সবটা টাকা চলে যায় তার স্বামীর হাতে। স্বামী সিদ্ধান্ত নেয় টাকা, কোথায়, কীভাবে, কতটুকু ব্যয় করা হবে। স্বামী তার উপার্জনের টাকা থেকে, কতটা খরচ করবে, কাকে ধার দেবে, কাকে উপহার দেবে, সংসারে কত টাকা দেবে এগুলোর কৈফিয়ত স্ত্রীর কাছে তার দিতে হয় না, কিন্তু স্ত্রীকে তার টাকা খরচের কৈফিয়ত স্বামীর কাছে দিতে হয়।

স্বামীকে কৈফিয়ত দিতে স্ত্রী বাধ্য। (যদিও এর উল্টা চিত্রও আছে, তবে তা হাতে গোণা)

একজন কর্মজীবী নারী, যাকে সকাল সাতটায় বের হয়ে সন্ধ্যা ছটা-সাতটায় বাড়ি ফিরতে হয়, সংসারে একজন সাহায্যকারী না থাকলে তার কী অবস্থা হয়, সে জানে। কারণ বাড়ি ফিরে সে সুন্দর সাজানো-গোছানো ঘর পাবে না, রান্না করা থাকবে না। তাকে ঘরে ঢুকতেই কেউ বলবে না এক কাপ চা খাও, নাস্তা খাও। তাকে এই ক্লান্ত শরীর নিয়েই ঘর গোছাতে হবে, রান্না করতে হবে, বাচ্চাকে দেখতে হবে। তার প্রতিটা শুক্রবার শনিবার হচ্ছে গৃহস্থালী কাজের দিন, ছুটির দিন নয়। খাবার খাওয়ার পর থালাবাটি বাসন-কোসনটাও তাকেই ধুতে হবে। কারণ এইসব কিছু করা নারীর কাজ। কোনো মহৎ হৃদয়ের স্বামী করুণা করে, মায়া করে, মহব্বত করে যদি থালাবাটি ধুয়ে দেয় তাহলেই নারীকে কৃতজ্ঞতায় ঢলে পড়তে হবেসেই রাতে বিছানায় স্বামীকে তার খুশি করতে হবে, কারণ উদারমনা স্বামী “স্ত্রী’র কাজ”গুলো করে তাকে উদ্ধার করে দিয়েছে।

স্বামীও একই সংসারে থাকছে, খাচ্ছে, জীবন যাপন করছে, তবুও সংসারের কাজ করা স্ত্রীর কাজ। স্ত্রী এগুলো করতে বাধ্য।

আর যে নারী সংসারে উপার্জন করছে না, শুধু সংসার করছে কিংবা বাচ্চাকে দেখার জন্য সে সংসারকেই বেছে নিয়েছে, তাদের অবস্থা তো আরো খারাপ। তাকে টাকা পয়সার খোঁটা থেকে যাবতীয় নানান কথাই শুনতে হবে। সেই নারী হয়তো চুলায় কিছু চাপিয়ে ছিলেন, বাচ্চাটা খেলতে গিয়ে পড়ে গেল। এই খবর স্বামীর কানে গেলে, সেই নারীকে শুনতে হবে, যে সে সংসারটাও ঠিকমতো করতে পারে না, সে একটা লুজার। এবং সে যে কত বড় লুজার তা মনে করিয়ে দিতে, শাশুড়ি, ননদ তারাও এসে জুটবে। এমনকি বাপের বাড়িতেও সে কোনো ছাড় পাবে না। তার লুজারগিরির জন্য বাপের বাড়ির বদনাম হচ্ছে, এই জন্য বাপের বাড়ির লোকেরাও ‘জোট বাঁধো গো জোট বাঁধো’ স্লোগানে আন্দোলনের ডাক দিবে।

সংসার বাঁচাতে, সংসারে শান্তি বজায় রাখতে এগুলো নিয়ে নারীরা কথা বলতে চায় না। কারণ কিছু বললেই তো আগুন ধরে যাবে। কারণ সংসার তো আবার সুখী হয় রমণীর গুণে। আর লজ্জা হইলো গিয়া নারীর ভূষণ, তাই নির্লজ্জ হয়ে স্বামী, শ্বশুর বাড়ির কথার বিরুদ্ধে কথা বলা অন্যায়।

সংসার ভাঙ্গা যাবে না, যে করেই হোক সংসার টিকিয়ে রাখতে হবে। নিজে সঙ সেজে জীবন সার করার নাম “সংসার”।  

আমাদের সমাজে নানান ভাবে নারীরা বৈষম্যের শিকার। অনেক নারী, নিজে যে বৈষম্যের শিকার সেটাই জানেন না। কারণ পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার ভাইরাস তার ভেতরে ঠেসে ঠুসে ভরা থাকে। “মেনে নে মা মেনে নে”, এই গ্রুপ থেকে, প্রচুর প্রেশার তাকে পেতে হয়। নিজের অধিকার নিয়ে সে যদি সোচ্চার হয়ে, সিদ্ধান্ত নেয়ই যে আলাদা হবে, তাকে যে কত কিছুর সম্মুখীন হতে হয়, সেটার কোনো হিসেব নাই। ডিভোর্সি মেয়ে শুনলেই অনেকের ফার্স্ট কমেন্ট থাকে, “হায় হায়, ওরে তো ভালো বলেই জানতাম”। মানে ডিভোর্স হয়ে যাওয়াটা একটা নিকৃষ্ট ব্যাপার। এবং সেই কাজটার জন্য মেয়েটিই দায়ী। কেননা, বিয়ে টিকিয়ে রাখা একটা বিরাট যোগ্যতা, সেটা যেভাবেই হোক।

ধর্ষণের শিকার নারীকে যেমন ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়, ডিভোর্সের ক্ষেত্রেও নারীর দোষটাই আগে দেখা হয়। আর ডিভোর্সের পর নারীর ভরণপোষণ, দেনমোহর এর টাকা, যেগুলো নারীর অধিকার, সেগুলো নিয়ে দর কষাকষি, মুলামুলি শুরু হয়ে যায়। লোভী নারী তাই দেনমোহর চায়। সংসার টিকায়া রাখতে পারিস না, আবার দেনমোহর চাস? অথচ দেনমোহর নারীর অধিকার, এবং একটি বৈধ বিয়ের শর্ত। অনেক নারীকেও দেনমোহর এর বিরুদ্ধে বলতে শুনি যে, নিজের দেহের দাম ধরেছো? নীল কাবিনে যৌনতা বিক্রি করেছো? যদিও আরবী “নিকাহ” শব্দটির মানে “সেক্সুয়াল কনট্রাক্ট”। ‘সমতা চাও আবার দেনমোহর চাও কেন, দেনমোহর চাওয়া মানেই তো দাসী হয়ে গেলা’।

দেনমোহর অবশ্যই একটি পুরুষতান্ত্রিক কনসেপ্ট। কিন্তু এটা ভুলে গেলে কী করে চলবে যে এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, এবং আইন ব্যবস্থায় দেনমোহর একজন নারীর জন্য একটি প্রতিকার। অন্যান্য ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর না করে, এই দেনমোহর বাতিল করতে চাওয়াটা তাই বাতুলতা।

নারীর অবস্থান সামাজিক আইনী প্রেক্ষাপটে নানান ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক:

পরিচয়: একজন সন্তান তার পিতার পরিচয়ে পরিচিত হোন। পিতাই একজন সন্তানের আইনী অভিভাবক। একজন নারীর ক্ষেত্রে তার পিতা, ভাই, স্বামী তার অভিভাবক। এমনিতেই প্রাপ্ত বয়স্ক একজন মানুষের কোনো অভিভাবক প্রয়োজন হয় না, কিন্তু সেটা হয় মানুষটি যদি নারী হয়। স্বামী স্ত্রীর অভিভাবক হতে পারবে, কিন্তু স্ত্রী কি স্বামীর অভিভাবক হতে পারে?  

সম্পত্তি: যদি স্বামী মারা যান তাহলে একজন স্ত্রী তার স্বামীর সম্পত্তি পাবেন (মুসলিম আইনে, হিন্দু আইনে তো প্রশ্নই আসে না) সন্তান না থাকলে ১/৪, অংশ আর সন্তান থাকলে ১/৮ অংশ।
একজন স্ত্রী মারা গেলে স্বামী, সন্তান না থাকলে পাবেন সম্পত্তির ১/২ অংশ। আর সন্তান থাকলে পাবেন, ১/৪ অংশ।

বহুবিবাহ:  আইন অনুযায়ী একজন পুরুষ তার প্রাণপ্রিয় স্ত্রী হিসেবে চার জন নারীকে একই সাথে বিয়ে করতে পারবে। স্ত্রীর অনুমতি না নিয়ে বিয়ে করলে তাকে দিতে হবে ১০ হাজার টাকা জরিমানা কিংবা, খাটতে হবে এক বছরের জেল। একজন পুরুষ চারের অধিক বিয়েও করতে পারবেন, কিন্তু সেই বিয়েগুলো হবে অনিয়মিত বিয়ে। আগের স্ত্রীদের মধ্যে কেউ মারা গেলে বা তালাক দিয়ে দিলেই, পঞ্চম বিয়েটি বৈধ হয়ে যাবে।

অভিভাবকত্ব: একজন পিতাই তার সন্তানের বৈধ অভিভাবক। মা একজন জিম্মাদার মাত্র। মা ছেলে সন্তানকে ০৭ বছর বয়স পর্যন্ত এবং মেয়ে সন্তানকে ১৬ বছর বয়স পর্যন্ত তার জিম্মায় রাখতে পারেন।

ম্যারিটাল রেইপ বা বৈবাহিক ধর্ষণ: 
No means ‘NO’ , কিন্তু আমরা এটা জেনেই অভ্যস্ত, যে স্ত্রীর না, স্বামীর না এর চাইতে ছোট।  
একজন নারী চাইলো কী চাইলো না, ইচ্ছা আছে না নাই, এগুলো জানার, শোনার, দেখার প্রয়োজন বেশিরভাগ পুরুষের নাই। অনেক পুরুষের আবার নারীর উপর চড়াও হতে বিশেষ করে ধর্ষণ করতে যেটাকে বলা হয় ইন্ট্যান্স লাভ মেকিং কিংবা ব্রুটাল সেক্স, সেটা করতে বেশি মজা পায়। নারীর যোনীপথ ছিড়ে গিয়ে স্টিচ লাগলে তাদের মেকি মেকি মায়ার আড়ালে একটা “আসল পুরুষ” হওয়ার দম্ভ থাকে। তাদের স্বপ্ন টিভির ওই বিজ্ঞাপন এর মতো, নারী তার ক্ষতের জন্য মেডেল নিয়ে দৌড়ে আসবে। (আমি ধন্য হয়েছি ওগো ধন্য, তোমারই প্রেমেরই  জন্য)

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই বৈবাহিক ধর্ষণ আইন অনুযায়ী কোনো অপরাধ না।

শ্রম বন্টন: এটা তো আগেই লিখেছি যে, সন্তান জন্মদান থেকে লালন-পালন, গৃহস্থালির কাজ, শ্বশুর শাশুড়ির খেদমত এইসকল কিছু নারীর দায়িত্ব। ঘরের এই দায়িত্ব পালন করে তবেই নারী বাইরে পা রাখতে পারবে। আর স্বামী যদি খুব ভালো হয়, তাহলে নারীকে বাইরে গিয়ে উপার্জন করতে “অনুমতি” দেয়। (সত্যিই তুমি মহান উদার বাদশা আলমগীর…… তালি হবে, তালি)

যদি কোনো পুরুষ সেইক্ষেত্রে নারীকে সাহায্য করে, তাহলে সেই পুরুষ যে অত্যন্ত মহান তা তো সবাই বলবে। (OMG!!! কী লক্ষী ছেলে, একদম হীরা!!)

একজন পুরুষ যে কোনো সময় ধরলাম শুধু রাগের মাথায় বলছে, তারপরও বলার অধিকার রাখে যে “আমার ঘর থেকে বের হয়ে যা”
একজন পুরুষ বলার অধিকার রাখে “আমার সাথে এখনি তোকে শুতে হবে, যতবার চাইবো ততবার তোকে শুতে হবে, আমি বিয়ে করেছি, আমার সাথে তোকে শুতে হবেই।” (তালিয়া, তালিয়া)
সে বলার অধিকার রাখে “তোকে আমি তালাক দিবো”
সে বলার অধিকার রাখে “আমি অন্য আরেকটি বিয়ে করবো”
সে বলার অধিকার রাখে “আমার বাচ্চা আমার কাছেই থাকবে”
স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে, কারণ সে তাকে শাসন করার অধিকার রাখে।
তার গতিবিধির উপর নজরদারি করতে পারে।

সমাজের একটি বড় এবং অপরিহার্য অংশ হচ্ছে নারী। পুরুষতান্ত্রিক চিন্তা চেতনার ভাইরাস বহন করা নারী এবং পুরুষ সেটা যে কোনো লেভেলেরই হোক, নারীকে টেনে পিছনের দিকে নিয়ে যেতে চায়। আর একটি সমাজের বড় অংশ যদি পিছিয়ে থাকে, তবে আরেকটি অংশ কখনোই অগ্রসর হবে না। নারীর জীবনের যেকোনো ক্রাইসিসে আমরা আশা করি, অন্য একজন নারী ব্যাপারটি বুঝবে। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, সেই সহমর্মিতার হাত পাওয়া যায় না, উলটো অনেক নারী ক্রাইসিসে পড়া নারীকে বুঝিয়ে দিতে চায় যে তোমার থেকে আমি বেটার। নারীকে নারীর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো পুরুষতন্ত্রেরই আরেকটি চাল।

লেখক- প্রমা ইসরাত, আইনজীবী

শেয়ার করুন:
  • 3.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.8K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.