জীবন-আচরণ জটিল, সহজে অংক মেলে না

0

শিল্পী জলি:

এক স্বামী তার স্ত্রীকে মেরে তক্তা বানিয়ে দিত–গা ভর্তি দাগ বসে যেত। অতঃপর কয়েক সপ্তাহ পরই স্ত্রীকেই চ্যালেঞ্জ করতো জীবনে কখনও তোমার গায়ে হাত তুলিনি। স্ত্রী অবাক হয়ে তাকাতো শুধু, তবে মুখে কিছু বলতো না।

সম্প্রতি, ফারিহা নামক মেয়েটির পিতা ও পরিবার সম্পর্কে নানা জনে নানা মন্তব্য করছে–
প্রথমত ভিডিও করার সময় কোথায় তার চোখের পানি ? 

আমি হাজার দুঃখ পেলেও সহসা কাঁদি না। কখনওবা কাঁদলে আয়না ধরি মুখের সামনে, কাঁদলে কেমন দেখায় দেখতে। ব্যস নিমিষেই কান্না উধাও। ভিডিওটাও অনেকটা তেমনই। তাছাড়া, মানুষ তখনই ভিডিওটিডিও করে যখন কষ্টগুলো সহনীয় পর্যায়ে চলে যায়। তাছাড়া, মৃত্যু শোকেও মানুষ টানা চব্বিশ ঘন্টা কাঁদতে পারে না। মাঝে বিরতি দেয়–ওটাই জীবনের ধরণ।

বাবা-মা হলেই তারা যে অত্যাচার করেন না, সেটা নয়। দেশের ঘরে ঘরে বহু বাবা-মা সন্তানকে পিটিয়ে তক্তা বানিয়ে দেন, সব সন্তানকে সমানভাবে দেখেন না, ছেলেমেয়ের মাঝে পৃথক করেন, পড়ালেখায় ভালো সন্তানদের বেশী কদর করেন, আরও কত কী !

স্বামী-স্ত্রীর সাথে বনিবনা না হলে যত সহজে বিষয়টি বাইরে বলা যায় নিজের বাবা-মায়ের বিরুদ্ধে তত সহজে কিছু বলা যায় না। তারপরও কোটি কোটি স্বামী-স্ত্রী আছেন যারা লোক সমাজে হেসে চলাচল করেন, কাঁধে কাঁধ রেখে ছবি তোলেন অথচ নিজেদের মাঝে দূরত্ব হয়ত আকাশসম। তারপরও হয়তো তারা একসাথে চলেন, একজন আরেকজনকে বার বার ক্ষমা করেন, আর লোকে ভাবে আহা না যেন কত ভালো আছে তারা।

ফারিহার বিষয়ে নানা জনে নানা মত দিয়েছেন, কেউ বলেছেন মাদকাসক্ত, তো কেউ বলেছেন মানসিক চিকিৎসা দরকার। আবার কেউ বলেছেন আচ্ছামত মার দিতে হবে। তার ভাইও এসে ভিডিও করে বলে দিয়েছে, তার প্রতি কোনো অন্যায় হয়নি, সব মিথ্যে। সবাই ভাইয়ের কথাই বিশ্বাস করছে। কেননা সমাজ ঐ কথাগুলোই শুনতে অভ্যস্ত। যত অন্যায়ই হোক ছেলে-মেয়ে পিতামাতার বিরুদ্ধে বলবে, সমাজ সেটা মানতে এখনও প্রস্তুত নয়। ফারিহারও একই সমাজে বসবাস। অতি কষ্টে আবেগে তাড়িত যে কথাগুলো সে বলে ফেলেছে, সেও ফিরিয়ে নেবে সেই কথাগুলো– জন্মের ঋণ পরিশোধ করতে। কিন্তু তার ভাই এবং কাজিনের কথায় পরিস্কার যে তাকে মারধর করা হতো, সে রুম আটকে থাকতো। বাবা তাকে হাবিজাবি গালাগাল করতো, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য। বাদ থাকে শুধু যৌন নির্যাতনের বিষয়টি।

আমাদের দেশের বাবা-মা বাচ্চাদেরকে গোসল করালে ন্যাংটা করে ঘষেমেজে গোসল করিয়ে দেয়। আমার নিজের ভাই যখন ফাইভে বৃওি পরীক্ষা দিতে যাবে মা তখন তাকে আমাদের সবার সামনেই ন্যাংটা করে গোসল করিয়ে দিয়েছেন। মনে পড়ে আমরা যখন সিক্স-সেভেনে পড়তাম তখনও নদীতে গোসল করে প্যান্ট ধুয়ে হাতে নিয়ে বাসায় দৌঁড়ে এসেছি (সবার গ্রোথ সমান নয়)। শুধু তাই নয় যখন একটু একটু করে বড় হতে থাকি তখন সব সমস্যার কথা বাবাকেই বলতাম। কেননা বাবার আদর এতো বেশী প্রবল ছিল যে তখন লজ্জার প্রশ্নটিই সামনে এসে দাঁড়ায়নি।

ফারিহার বাবা মেয়েকে যখন তখন মারধর করেন, আজে বাজে গালি দেন তিনি যদি ভালো মনেও কখনও মেয়ের গায়ে হাত বুলিয়ে থাকেন, ওটাকে যৌন নির্যাতনই মনে হবার কথা। কেননা তাদের মাঝে পিতামেয়ের পারস্পরিক বন্ধন, নির্ভরতা, এবং ট্রাস্ট গড়ে ওঠার সুযোগ ঘটেনি। কেননা ঐ ভরসা যুগ যুগ ধরে ভালো ব্যবহার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তবুও বাবামা বলে কথা। যত অন্যায় এবং কষ্টই থাক বার বার মানুষ ক্ষমা করবে এটাই স্বাভাবিক। ফারিহাও যখন মাই ড্যাড, বা পপস বলে ছবি তুলে পোস্ট দেয়, সেটাও জন্মের ঋণকে স্বীকৃতি দেয়া, নিজের কষ্ট এবং না পাওয়াকে ভুলে যাওয়া।

এখনও দেশে ছেলেমেয়ের মাঝে সম্পদের ভাগাভাগি আলাদা–
ক’জন বাবা বা মা প্রশ্ন তুলেছেন এ ব্যাপারে ? 
তবুও আমরা কী তাদের কিছু বলেছি ? 
তার মানে বিষয়টি কী মিথ্যে ?
জীবনে সব বিষয় সমান নয়, সবার ঘটনাও এক নয়, আমি যা করি সেটা অন্য করলেই বিষয়টি সত্যি, জীবনও তেমন নয়। 
মানুষের জীবন এবং আচরণ জটিল– একে অংকের হিসেবে মেলানো যায় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 193
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    193
    Shares

লেখাটি 0 বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.