জ্যান্ত জাগতিক জীবন শুধু জীবনের জয়গান গায়, মৃত্যুর নয়

মলি জেনান:

কেউ আত্মহত্যা করেছে শুনলেই আমার কৈশোরের কথা মনে পড়ে, হাসির কথা মনে পড়ে। হাসি আমাদের পাশের পাড়ায় থাকতো, ওর বাবাকে কাকা বলতাম, ওর বড় বোন আর আমি ওয়ান টু নাইন একই ক্লাসে পড়েছি। সেই মেয়েবেলায় হাসিই আমাকে শিখিয়েছিল মৃত্যুই শেষ কথা নয়, কোনো সমাধান নয়, কেবল লোকান্তরে চলে যাওয়া, হেরে যাওয়া জীবনটাকে মৃত্যুতে রূপান্তর করে মুক্তি দেয়ার নামে নিজেকে ঠকানো পৃথিবীর রুপ-রস-গন্ধ থেকে।

তখন আমি ক্লাস নাইনে পড়ি। হাসির বড় বোন মুক্তা (নামটি কাল্পনিক, কিন্তু হাসির নামটি সত্য, কারণ কেবল বেঁচে থাকলেই সামাজিক মান-সম্মানের ভয় থাকে) আমার সহপাঠী। মুক্তা শান্ত, চুপচাপ, লক্ষ্মীমন্ত এক মেয়ে, কেউ সাতবার জিজ্ঞাসা করলে একটা উত্তর দেয় টাইপের, আর হাসি হচ্ছে একদম উল্টা প্রকৃতির ক্ষ্যাপাটে, রাগী, কেউ একটা কথা বললে দশটা উত্তর দেয়; হাসি তখন সেভেনে পড়ে। সে  সব সময় ওর বোনের বডিগার্ডের দায়িত্বে থাকতো, স্কুলে আসা-যাওয়ার পথে কেউ তার বোনকে কিছু বললো কিনা, পিছু নিলো কিনা, এসব সবসময় খেয়াল রাখতো, আর প্রতিদিন কারও না কারও সাথে ঝগড়া হতো। মুক্তা কিছু বললেই উল্টা ওকে ধমকে থামিয়ে দিতো, বলতো তুই কী বুঝিস? আমরা তাকে বলতাম ‘ঝগড়া রানী’।

তো, একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুনি আমাদের ঝগড়া রানী বিষ খেয়েছে! কী অবিশ্বাস্য কথা! হাসি বিষ খেতে যাবে কেন, পারলে ওর ভয়ে অন্যরা বিষ খাবে! অজপাড়া গাঁ, বিভিন্ন বাড়ি থেকে মানুষ দৌড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আমরা যেতে পারছি না (বাবা বলছেন, কোথাও যাওয়া যাবে না, পড়তে বসো)। কিন্তু মন তো ঘরে বসছে না। কী হয়েছে? কেন সে বিষ খাবে? এখন কোথায়? কী অবস্থা? চলছে রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা! সারা পাড়া জুড়ে ফিসফিসানি, একটু পড়েই তার বাতাস আমাদের কান পর্যন্ত এসে পৌঁছালো।

-এক চাচী এসে বললো, “কোনো ডর নাই, রাইতই হাসপাতালত নিছে”।

-তার মানে রাতে বিষ খাইছে?

-হ, তাইলে আর কী কই? ওই যে ‘স’ এর পোলা আছে না, অর লগে নাকি লাইন চলতাছিল, বাপে চিডি দেওনের সময় দেইখ্যা ফালাইছে।

-(আমরা ভয়ানক বিস্মিত) কন কী! হাসি! ওতো সারাদিন ছেলেগর সঙ্গে ঝগড়া করে! তাও আবার “সিরো”র সঙ্গে! (সিরোও আমাদের সাথে পড়তো, মানে হাসির বড় বোনের সাথে। ওর নাম সিরো নয়, দেখতে লম্বা ড্যাঙড্যাঙে, লম্বা চুল রাখতো, আর নায়কদের মতো ভাব দেখানোর চেষ্টা করতো। তাই আমরা ওকে সিরো বলতাম মানে হিরো’র পেরোডি।)

-আস্তে কও, তোমার বাপে হুনলে দিবো মাইর।

-চাচি, তাইলে সিরো কই অহন!

ক্যাডা জানে কই? পলাইছে। আমি অহন যাই, তোমার বাপে দেখলে প্যাঁচাল পারবো।

চাচী চলে গেল। আমরা প্রতিদিনের মতো স্কুলে গেলাম, ওখানেও সবাই জেনে গেছে। স্যারেরা ক্লাস নিচ্ছেন, কিন্তু ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কানাকানি, আর আমার মন পড়ে আছে হাসি ও সিরো’র কাছে। এখন কী অবস্থা কে জানে?

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে শুনলাম পুরো বৃত্তান্ত- হাসি আর সিরোর মধ্যে সম্পর্ক চলছিল, রাতে যখন হাসি দেখা করে চিঠি দিতে যায় তখন ওর বাবা দেখে ফেলে। ওকে ধরে নিয়ে বকাঝকা করে এবং গায়ে হাত তুলে, আর এক রোখা হাসিও বলে দেয়, সে সিরোকেই বিয়ে করবে; তাই তার বাবা-মা তাকে ঘরে আটকে রেখে বলে আর যেন কখনো সিরো’র সাথে না মেশে। বাবার রাগারাগি, গায়ে হাত তোলা, পছন্দের মানুষের সাথে মিশতে দেবে না বলে হুঁশিয়ার করা, সব কিছুই জেদী হাসিকে ভয়ানক অভিমানী করে তুলে। সে ধরে নেয় তার বেঁচে থাকাটা অর্থহীন আর তাই সে কৃষক বাবার ঘরে থাকা পোকামাকড় মারার বিষ নিয়ে পুরোটাই গলায় ঢেলে দেয় এবং বলতে “থাক যাও, আর অর সঙ্গে মিশমু না, যাও, আরও মারবা- মারো, দেহি কত মারবার পাও।”

ওর মা বুঝতে পারে, জেদী মেয়েটা নিশ্চয় কিছু একটা করেছে, তারপর দরজা খুলে দেয়, দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে স্টমাক পরিস্কার করার সময়ও ওর জ্ঞান ছিল। বার বার মুখের নলটা নাকি খুলে ফেলছিল, আর ডাক্তারকে বলছিল, আমারে বাঁচাইতে চান? কিন্তু আমি বাঁচতে চাই না।

হাসি, ক্লাস সেভেনে পড়া বাচ্চা মেয়েটা সত্যিই বাঁচতে চায়নি আর, ভয়ানক অভিমান আর জেদ ওকে মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দিয়েছিল; সারাদিন এবং সারা রাত পার করে প্রিয়জনের মুখ না দেখেই জীবনকে অবহেলায় ফিরিয়ে দিয়ে অভিমানী ভোরবেলায় মৃত্যুর কাছেই আশ্রয় নিয়েছিল। জানি না মৃত্যু ওকে সুখী করতে পেরেছিল কিনা?

নিশ্চয়ই জানতে চাইছেন, সিরো’র কী হলো? সবাই বলাবলি করতে লাগলো, হাসির বাবা কেইস করবে, কেইস করবে, কিন্তু কিছুই করেনি ওরা। সংসারের সবচেয়ে প্রাণবন্ত-উচ্ছল-বাকপটু মেয়েটাকে হারিয়ে ওরা যেন সব হারিয়ে বসেছিল। সিরো মাসখানেক পর অজ্ঞাতবাস থেকে ফিরে এলো, আবার স্কুল-ক্লাস করতে লাগলো, মুক্তার আর পড়া হলো না, দ্রুত তার বিয়ে হয়ে গেল। আমরা নাইন থেকে টেন-এ উঠলাম, যথারীতি এসএসসি পরীক্ষা দিলাম, সিরোও আমাদের সাথে পরীক্ষা দিল এবং একদিন অবাক বিস্ময়ে দেখলাম সিরো সাইকেলের পেছনে অন্য আরেকটা মেয়েকে নিয়ে ঘুরছে।

হাসি লোকান্তরে, এমনকি মনান্তরে চলে গেল! আর আমি জানলাম, মৃত্যু কখনোই কোন সমাধান নয়, মরে গিয়ে কিছুই প্রমাণ করা যায় না, কিচ্ছু না, না ভালোবাসা, না ঘৃণা; বরং প্রমাণ করবার জন্য বাঁচতে হয়, বেঁচে থাকতে হয়, লড়াই করতে হয়।

সেই মেয়েবেলায় এই মর্মান্তিক একটা ঘটনাই আমাকে শিখিয়েছে সন্তানকে শাসন করতে হয় ভালোবেসে, কাছে রেখে তার মনের গতি-প্রকৃতি বোঝে; কখনোই নিজেদের থেকে আলাদা করে নয়, শারীরিক নির্যাতন তো নয়ই। একটা সন্তান যখন ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে, তার বাবা-মা’কেই সমস্ত  ভালোবাসা, অভিমান ও অভিযোগের আঁধার জেনেই বড় হয়, তাই এই অনুভূতির স্খলন সে কোনো ভাবেই মেনে নিতে পারে না। তাই কখনো কখনও কখনও সে হয়ে উঠে ধ্বংসপরায়ণ।

আর এই ঘটনাই আমাকে শিখিয়েছিল চলমান এই জ্যান্ত-জাগতিক জীবন শুধু জীবনের জয়গান গায়, মৃত্যুর নয়। মৃতের জন্য শুধু অলস অবসরে দুদণ্ড হাহাকারের সময় থাকে, এর বেশি নয়। কারণ জীবন চলে তার নিজের গতিতে প্রতিনিয়ত ঝঞ্ঝা-ঝড়ে যুদ্ধ করে, এখানে হাহাকারের সময়ও বড় সীমিত।

শেয়ার করুন:
  • 207
  •  
  •  
  •  
  •  
    207
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.