আগে বলে নাই ক্যান?

0

শাশ্বতী বিপ্লব:

এই এক নতুন যন্ত্রণা হইসে। অবশ্য নতুন না বইলা, নতুন বোতলে পুরানা কাঁসুন্দি বলা যাইতে পারে।

কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হয়ে থানায় অভিযোগ করসে? জাতির বিবেকেরা বলবে, “আগে বলে নাই ক্যান?” কেউ সৎ বাপের বিরুদ্ধে দিনের পর দিন ধর্ষণের অভিযোগ আনসে? জাতির বিবেকেরা বলবে,”আগে বলে নাই ক্যান?” কেউ স্বামীর বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আনসে? জাতির বিবেকেরা বলবে, “আগে বলে নাই ক্যান?” পরিবারের বিরুদ্ধে, শিক্ষকের বিরুদ্ধে বা অন্য যে কারো দ্বারা শারীরিক বা মানসিক নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুলসে? জাতির বিবেকেরা বলবে, “আগে বলে নাই ক্যান?”

যেকোনো নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন মেয়ে মুখ খুললেই জাতির বিবেকেরা তেড়ে ফুঁড়ে মারতে আসে (ঘরের ভেতরে যেমন, বাইরেও তেমনি মেয়েদের কিল মারার গোঁসাইয়ের তো অভাব নাই। তিনারা অফ লাইন, অন লাইন সর্বত্র বিরাজমান)। সবার এক কথা, আগে বলে নাই ক্যান? এতোদিন সহ্য করসে ক্যান? অমুক ব্যবস্থা নেয় নাই ক্যান? তমুকের কাছে যায় নাই ক্যান? যেন চারদিকে তাকে সাহায্য করার জন্য সবাই বইসা আছে!!!

সবাই তখন একেকজন সবজান্তা শমসের। ধইরাই নেয় মেয়েটা ইচ্ছা কইরা এতোদিন মুখ বুইজা ছিলো। ওই মেয়ের কোন ঝামেলা আছে। সে নিশ্চয়ই ড্রাগ নেয় বা পয়সার লোভে ছিলো, বা এটেনশান সিকার বা উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাপন করতে চায়, ইত্যাদি ইত্যাদি। আর সবশেষে ধর্ম মানলে আর পর্দা করলে এমন হইতো না উপসংহারে পৌঁছায়।

মেয়েরা নির্যাতন লুকায়, সহজে মুখ খুলে না। বিশেষ করে পারিবারিক নির্যাতন আর যৌন হয়রানীর ক্ষেত্রে। লুকাইতে চায় পরিবারের লোকজনও। শুধু বাংলাদেশেই না, পুরা পৃথিবীতেই এই অবস্থা। “ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স” সব জায়গাতেই আছে। কম আর বেশি।

মেয়েরা যেন নির্যাতনের কথা লুকায়া না রাখে, যেন মুখ খুলে, প্রতিবাদ করে, সেইসব নিয়ে পুরা পৃথিবীতেই অনেক কাজ হয়। বাংলাদেশেও হয়। সেইসব কাজে উদ্বুদ্ধ হইয়াই হোক বা কোন বন্ধুর সাহসে হোক বা নিজেই সাহস সঞ্চয় কইরা হোক, কোন মেয়ে যখন শেষ পর্যন্ত সামাজিক অপমান আর লজ্জার চোখ রাঙানী উপেক্ষা কইরা মুখ খোলার সাহস দেখায়, তখন তাকে প্রথমেই আপনি বাতিল করে দেন “এতোদিন ক্যান বলে নাই” বিবেচনায়। 

আরে ভাই, আপনার ঘরের মেয়েদের তো কথা বলতে শিখান নাই কোনদিন। সাহসী হইতে বলেন নাই। বরং কষ্টের কথা লুকাইতে শিখাইছেন। ছোটবেলা থেকে স্বর্বংসহা হইতে শিখাইছেন, তার উপর পরিবারের সব সম্মানের বোঝা চাপায়া দিসেন। সেও সেটা বিশ্বাস করসে। আপনার মেয়েকে একা চলতে শেখান নাই, বলতে শেখান নাই, তার জন্য যাওয়ার কোন জায়গা রাখেন নাই। বাপ, ভাই, খালা, ফুফু তো দূরের কথা, এমনকি মা হইয়াও পাশে দাঁড়ান নাই।

অভিযোগ করলে মাইনা নিতে বলসেন। ধইরা বাইন্ধা আবার সেই জায়গাতেই পাঠাইসেন। সমাজ, সংসার, সন্তানের দোহাই দিসেন। আর তার পিঠ যখন দেয়ালে ঠেইকা গেসে, সে তার সাথে হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করার চেষ্টা করতেসে,  তখন বলতেসেন, আগে বলে নাই ক্যান? ক্যান যে বলে নাই সেটা বুঝতে কি খুব বেশি জ্ঞানী হওয়া লাগে!!!

যারা মুখটা খুলতে পারলো, তারা বাঁইচা গেলো। অন্ততঃ বাঁচার চেষ্টা করতেসে সে। নাইলে আত্মহত্যা করতো হয়তো। তখন আবার আমরা মায়াকান্না করতে বসতাম। আহারে, ক্যান মইরা গেলো? মুখ খুললেতো আমরা সাহায্য করতে পারতাম। আহা, উহু!!! অথচ, অভিযোগের তদন্ত হওয়ার আগেই আপনারা এই মেয়েগুলারে দোষী সাব্যস্ত কইরা বইসা আছেন। এই ওই স্ক্রীণশট দিয়া প্রমান করার চেষ্টা করতেসেন, সে যা বলসে সব মিথ্যা। মেয়েটাই আসলে খারাপ। যত্তসব!!

নিজেদের ভণ্ডামিটা কি বুঝতে পারেন? 

লেখাটি ১,৮৬০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

RFL
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.