‘দায়’ কেন শুধুই নারীর?

0

নীলাদ্রি বিশ্বাস:

একজন মেয়ে বা নারী যাই বলা হোক না কেন, সে কতটা পরিশ্রম করে একটা সংসার টিকিয়ে রাখে সেটা কেবল একজন নারীই ভালো জানে। শত কষ্ট মনে থাকলেও সংসারের কারো কোনো অসুবিধা হতে দেয় না, শারীরিক অসুস্থ থাকলেও সবার আগে ঘুম থেকে উঠে রান্নাবান্না করে খাবার রেডি করে রাখে, সংসারের সব খবরাখবর একজন নারীই শতভাগ রাখতে পারে।

একজন নারীর যেমন সংসারের প্রতি দায়, দায়িত্ব এবং অধিকার আছে, ঠিক তেমনই একজন পুরুষেরও দায়, দায়িত্ব, অধিকার আছে সংসারের প্রতি। পার্থক্য শুধু কেউ “দায়” পালন করে, আর কেউ “অধিকার” পালন করে, খুব কম মানুষই “দায়িত্ব” পালন করে।

দাম্পত্য জীবনের সফলতার প্রথম শর্ত হচ্ছে একে অপরকে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সাথে বরণ করে নেয়া। তাদের সম্পর্ক হবে একান্ত আন্তরিক ও একনিষ্ঠ। একের অন্তরে অপরের প্রতি কোনো প্রকার বিতৃষ্ণা থাকবে না।

মানুষ হিসেবে স্বামী-স্ত্রীর উভয়ের মধ্যে কিছু দোষ ক্রটি থাকতে পারে। অথবা স্ত্রীর মধ্যে এমন কিছু পাওয়া যেতে পারে যা স্বামীর পছন্দনীয় নয় এবং স্বামীর মধ্যেও এমন কিছু পাওয়া যেতে পারে যা স্ত্রীর পছন্দনীয় নয়। এটাও সংসারের মধ্যে পড়ে। দুইজনের মতের একটূ-আট্টু অমিল থাকতেই পারে, এজন্য দায়িত্বে অবহেলা করলে চলবে না। অমিলটাকে মিলে পরিণত করাও দায়িত্বের মধ্যেই।

সংসারের প্রতি সেই দায়িত্বটা কতটা কষ্টসাধ্য সেটা কেবল দায়িত্ববান সে পুরুষটাই জানে। কষ্টসাধ্য বললাম এই কারণেই যে, আমাদের বাঙালী পুরুষরা কখনো স্ত্রীর পাশাপাশি ঘরের কাজ করে না, খুব সকালে উঠে রান্না করতে হয় না, থালাবাসন ধুইতে হয়না, বাচ্চাকাচ্চার দেখভাল করতে হয় না। নুন, চাল, তইতরকারীর হিসেব রাখতে হয়না। শুধু খাবার টাইমে খাবার পেলেই হয়।

বাঙালী পুরুষরা বেশীরভাগ অফিস বা বিভিন্ন কাজে থেকে ফিরেই অনেক ক্লান্ত দেখান, স্বামীর ক্লান্তি দূর করতে স্ত্রী খুব যত্নবান হয়ে এগিয়ে যান স্বামীর কিছু লাগবে কিনা জিজ্ঞাসা করতে, প্রয়োজন মতো চাহিদা মেটান, ভালো লাগান স্বামীকে। কিন্তু কখনো কি কোনো স্বামী জিজ্ঞাস করেছেন, “কেমন আছে স্ত্রী, কী চায় তার মনে? তারও একটা জীবন আছে, সে জীবনে চাওয়া-পাওয়ার অনেক ব্যাপার আছে, মেটাতে চেয়েছেন কখনো? কখনো একবেলা স্ত্রীকে বসিয়ে রেখে রান্না করে খাইয়েছেন কখনও?

বিয়ের আগে কখনো এমন করে ভাবিনি বিবাহিত জীবনে এতো একলা একলা লাগবে, আর নিজেকেই অসহায় ভাবতে হবে। বিয়ের পরও আমরা বেশীরভাগ সময় বাইরে খেয়েছি, তখন ভাবতাম ‘স্ত্রীর হাতে রান্না করা খাবার হয়তো এই জীবনে জুটবে না।’ খুব ভালই যত্নে ছিলাম আমরা। তখনো বুঝিনি সংসার কী, সংসারের প্রতি দায়িত্ব কতটুকু, ভবিষ্যতের জন্য কী করতে হবে। এমন একটা সময় জীবনে আসবে একবারও ভাবিনি। আজ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। অসহায় ভাবছি এই কারণেই যে ‘নারী জাতির মতো একজন মানুষ’কে সারা জীবনের জন্য পাশে পেয়ে কতটুকু পেরেছি তার জন্য কিছু করতে! (জানিনা নিন্দুকেরা কিভাবে নিবে এই কথাটা)

ঋতু প্রেগন্যান্ট হবার পর বুঝেছি দায়িত্ব কতটুকু সংসার এবং স্ত্রীর প্রতি।
একজন ইউরোপীয় চিন্তাবিদ পুরুষদের লক্ষ্য করে বলেছেন: নারীদের গর্ভধারণ ও সন্তান প্রসবজনিত কঠিন ও দুঃসহ যন্ত্রণার কথা একবার চিন্তা করো। দেখো নারীজাতি দুনিয়ার কত শত কষ্ট, ব্যথা, বেদনা ও বিপদের ঝুুঁকি নিজেদের মাথায় নিয়ে বেঁচে থাকে। তারা যদি পুুরুষের ন্যায় ধৈর্যহীন হতো, তাহলে এতোসব কষ্ট তারা কী করে বরদাশত করতে পারতো? প্রকৃতপক্ষে বিশ্বমানবতার এ এক বিরাট সৌভাগ্য যে, মায়ের জাতি স্বভাবতই কষ্টসহিষ্ণু। তাদের অনুভূতি পুরুষদের মতো নাজুক ও কঠিন হলে, কষ্টকর কাজের দায়িত্ব পালন করা তাদের পক্ষে সম্পূর্ণ অসম্ভব ছিল।

সে থেকে আমরা (পুরুষরা) জানতে পেরেছি গর্ভধারণের আগে বা পরে নারীদের একটা ছেলে মানুষী স্বভাব থাকে, সে স্বভাব থেকে বোঝা যায়- নারীদের স্বভাবে বক্রতা এটা প্রকৃতিগত ও জন্মগত। তাই তাদের আসল প্রকৃতিকে যথাযথভাবে থাকতে দিয়েই তাদেরকে নিয়ে সুমধুর পারিবারিক জীবন গড়ে তোলা এবং তাদের সহযোগিতায় কল্যাণময় সমাজ গড়া যেতে পারে। আর তা হচ্ছে তাদের প্রতি ভালোবাসা পোষণ করা, তাদের সাথে অত্যন্ত দরদ, নম্রতা ও সদিচ্ছাপূর্ণ ব্যবহার করা এবং তাদের মন রক্ষা করতে যথাসম্ভব চেষ্টা করা।

মূলকথা হচ্ছে আমাদের পুরুষদের গর্ব করা উচিৎ নারীদের মতো একজন বন্ধু সারাজীবনের জন্য পাশে পেয়েছি বলে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লেখাটি ১,২৪৯ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.